17 July 2026
নতুন উপাচার্য আমাদের খোঁজ-খবর নেননি: সাজিদের বাবা

ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইবি) শিক্ষার্থী সাজিদ আব্দুল্লাহ হত্যাকান্ডের এক বছর পেরিয়েছে। তবে এখনও হত্যার রহস্য উদ্ঘাটন ও বিচার নিশ্চিত করতে পারেনি প্রশাসন। শিক্ষার্থীদের ধারাবাহিক আন্দোলন, মানববন্ধন ও প্রতিবাদ কর্মসূচির পরও মামলার তদন্তে গতি ফেরেনি। এমনকি তদন্তকারী কর্মকর্তা পরিবর্তনের পরও এগোয়নি তদন্ত। এদিকে নতুন উপাচার্য দায়িত্ব নেওয়ার পরও পরিবারের খোঁজ-খবর নেননি বলে অভিযোগ করেছেন সাজিদের বাবা আহসান হাবিবুল্লাহ।
তিনি জানান, “আমার ছেলের হত্যাকাণ্ডের এক বছর পূর্ণ হয়েছে। কিন্তু আজ পর্যন্ত এই হত্যার বিচার বা তদন্তে কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখতে পাইনি। আমরা নিয়মিত সিআইডির সঙ্গে যোগাযোগ রাখছি, কিন্তু তদন্তের কোনো আপডেট পাচ্ছি না। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সঙ্গেও আমাদের কোনো যোগাযোগ নেই। নতুন উপাচার্যও কখনো আমাদের খোঁজ-খবর নেননি। এমনকি তাঁর একটি নম্বরে অনেকদিন যোগাযোগের চেষ্টা করেও আমরা তাঁকে পাইনি। আমরা মনে করি সিআইডি, পুলিশ প্রশাসন এবং বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন—সবারই গাফিলতি রয়েছে।”
জানা যায়, গত বছরের ১৭ জুলাই বিকেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের শাহ আজিজুর রহমান হল সংলগ্ন পুকুর থেকে সাজিদের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। পরে গত ৩ আগস্ট ভিসেরা রিপোর্টে সাজিদকে শ্বাসরোধে হত্যার বিষয় উঠে আসলে পরদিন তার বাবা অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে ক্যাম্পাসস্থ ইবি থানায় হত্যা মামলা দায়ের করে। পরিবারের আবেদনের পর মামলাটি সিআইডিতে হস্তান্তর করা হয়। তবে প্রায় দশ মাস তদন্ত করেও মামলার উল্লেখযোগ্য কোনো অগ্রগতি দেখাতে পারেনি সিআইডি। এদিকে মামলার তদন্তে দীর্ঘসূত্রতা নিয়ে শুরু থেকেই শিক্ষার্থীদের মাঝে অসন্তোষ তৈরি হয়। বিভিন্ন ছাত্রসংগঠন ও সাধারণ শিক্ষার্থীরা দফায় দফায় মানববন্ধন, বিক্ষোভ ও প্রতিবাদ কর্মসূচি করলেও তদন্তে আশাব্যঞ্জক ফল আসেনি। এমনকি তদন্তে অগ্রগতি না থাকায় গত মে মাসে সাজিদের বাবার আবেদনের প্রেক্ষিতে তদন্ত র্কমর্কতা পরর্বিতন করার পরও তদন্তে গতি ফেরেনি।
এদিকে সাজিদ হত্যাকান্ডের নিয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে রয়েছে নানান অমিমাংসিত প্রশ্ন। সেগুলো হলো— বিভিন্ন এলাকার সিসিটিভি ফুটেজের গরমিল, হত্যাকান্ডের রাতে সাজিদের রুম সিলগালার পরও এক কর্মকর্তার রুমে প্রবেশ, হলে নতুন করে সিসিটিভি ক্যামেরা লাগালে প্রভোস্টের বিনা অনুমতিতে এক কর্মকর্তার মোবাইলে এক্সেস নিয়ে ফুটেজ ডিলিট, হত্যাকান্ডের রাতে মেইন গেট দিয়ে ভ্যানে শোয়ানো এক ব্যক্তি সহ চারজনের প্রবেশ, সাজিদের মৃত্যুর পরও কয়েকবার তার মোবাইলে কল রিসিভ হওয়া, সিআইডি ১ বছর ধরে সাজিদের মোবাইল ফোনের লক খুলতে না পারা এবং সাজিদের কাছের বন্ধু ইনসানের ফোন ক্লোনের ঘটনা। এসব প্রশ্নের কোনো সদুত্তর দিতে না পারায় বিষয়টিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক দুর্বলতা এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত সিআইডি কর্মকর্তাদের উদাসিনতা হিসেবেই দেখছেন শিক্ষার্থীরা।
শিক্ষার্থী ও পরিবারের সদস্যদের অভিযোগ, সাজিদ হত্যার বিচার নিশ্চিত করতে সিআইডি ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে কার্যকর তৎপরতা দেখা যায়নি। দীর্ঘ এক বছরে সাজিদের হত্যাকারীদের শনাক্ত করতে না পারা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও সিআইডির চরম গাফিলতি ছাড়া আর কিছু না। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও সিআইডির এমন খামখেয়ালিপনা গ্রহণযোগ্য নয়। বিচারহীনতার এই সংস্কৃতির শিক্ষার্থীদের মাঝে নিরাপত্তাহীনতার অনুভূতি তৈরি করছে।
এদিকে তদন্তের অগ্রগতির বিষয়ে মামলার দায়িত্বপ্রাপ্ত সিআইডি ইন্সপেক্টর মহব্বত হোসেন বলেন, দায়িত্ব পাওয়ার পর থেকে মামলার নথিপত্র পর্যালোচনা, কিছু সাক্ষীদের জিজ্ঞাসাবাদ এবং একাধিকবার ঘটনাস্থল পরিদর্শন করা হয়েছে। তদন্ত চলমান রয়েছে। তবে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়ার মতো পর্যায়ে এখনও আমরা পৌঁছাতে পারিনি। আমাদের আরও সময় প্রয়োজন। গাফিলতির অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, আমরা শতভাগ আন্তরিকতার সাথে চেষ্টা চালাচ্ছি। একটা রেজাল্ট অবশ্যই আসবে। তবে একটু দেরি হবে। এটাকে আমাদের গাফিলতি বলা হলে সেটা জোরপূর্বক বলা হবে।
এ বিষয়ে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. একেএম মতিনুর রহমানের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে ফোনে পাওয়া যায়নি। তবে তিনি গণমাধ্যমকে বলেন, সাজিদের পরিবারের সাথে যোগাযোগ করে তো ফল আসবে না। আমাদের দরকার তদন্তের অগ্রগতি ও বিচার নিশ্চিত করা। আগের প্রশাসন কি করেছে সেটি তো আর আমি বলতে পারবো না। তবে আমি দায়িত্ব গ্রহণের পরই সিআইডির সাথে যোগাযোগ করেছি এবং সেটি অনবরত চলছে। আর আমার নিজে হয়তো সাজিদের পরিবারের সঙ্গে যোগযোগ সম্ভব হয়নি। তবে তাদের সাথে যোগযোগের জন্য প্রক্টরকে বলেছি। প্রয়োজনে তাদেরকে ক্যাম্পাসে আহ্বানও করেছি। তারা যখনই আসবে তাদের সাথে কথা বলব।
