20 July 2026
দত্তক সন্তান কি ইসলামি আইনে সম্পত্তির উত্তরাধিকারী?

ইসলাম মানবিকতা, দয়া ও সহমর্মিতার ধর্ম। এতিম, অসহায় ও সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের যত্ন নেওয়া, তাদের আশ্রয় দেওয়া এবং ভালোবাসার সঙ্গে লালন-পালনের প্রতি ইসলাম বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। তবে একই সঙ্গে ইসলাম বংশপরিচয়, উত্তরাধিকার ও পারিবারিক সম্পর্কের বিধানকে সুস্পষ্টভাবে সংরক্ষণ করেছে।
এ কারণে কোনো শিশুকে দত্তক বা পালিত সন্তান হিসেবে লালন-পালন করা, তার দায়িত্ব নেওয়া এবং তার প্রতি মমতা প্রদর্শন করা নিঃসন্দেহে একটি মহৎ কাজ। কিন্তু তাকে জৈবিক সন্তানের সমান আইনগত পরিচয় দেওয়া বা শরিয়ত নির্ধারিত উত্তরাধিকারী হিসেবে গণ্য করা ভিন্ন একটি বিষয়।
দত্তক সন্তান সম্পর্কিত ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি, কুরআন ও সুন্নাহর নির্দেশনা এবং এ বিষয়ে শরিয়তের বিধান সম্পর্কে জানা প্রত্যেক মুসলিমের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
প্রশ্ন— ইসলামি আইনে দত্তক সন্তান কি দত্তকগ্রহণকারী বাবা-মায়ের মৃত্যুর পর তাদের সম্পদের উত্তরাধিকারী হবে?
উত্তর— ইসলামি শরিয়তের বিধান অনুযায়ী দত্তক বা পালিত সন্তান প্রকৃত সন্তানের মতো উত্তরাধিকারী হয় না। তাই দত্তকগ্রহণকারী বাবা-মা যদি জীবদ্দশায় তাকে কোনো সম্পদ দান করে না যান অথবা মৃত্যুর আগে তার জন্য বৈধ সীমার মধ্যে ওসিয়ত না করেন, তাহলে তাদের মৃত্যুর পর পালিত সন্তান উত্তরাধিকার সূত্রে সম্পদের অংশ পাবে না।
কুরআনের নির্দেশনা
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন—
مَا جَعَلَ أَدْعِيَاءَكُمْ أَبْنَاءَكُمْ ۚ ذَٰلِكُمْ قَوْلُكُمْ بِأَفْوَاهِكُمْ ۖ وَاللَّهُ يَقُولُ الْحَقَّ وَهُوَ يَهْدِي السَّبِيلَ
‘তিনি তোমাদের পালকপুত্রদের তোমাদের প্রকৃত পুত্র বানাননি। এগুলো কেবল তোমাদের মুখের কথা। আর আল্লাহ সত্য কথাই বলেন এবং তিনিই সঠিক পথ প্রদর্শন করেন।’ (সুরা আল-আহযাব: আয়াত ৪)
আরও ইরশাদ হয়েছে—
ادْعُوهُمْ لِآبَائِهِمْ هُوَ أَقْسَطُ عِندَ اللَّهِ
‘তোমরা তাদেরকে তাদের (প্রকৃত) পিতার নামেই ডাকো। এটাই আল্লাহর কাছে অধিক ন্যায়সঙ্গত।’ (সুরা আল-আহযাব: আয়াত ৫)
হাদিসের নির্দেশনা
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
مَنِ ادَّعَى إِلَى غَيْرِ أَبِيهِ وَهُوَ يَعْلَمُ أَنَّهُ غَيْرُ أَبِيهِ، فَالْجَنَّةُ عَلَيْهِ حَرَامٌ
‘যে ব্যক্তি জেনে-শুনে নিজের পিতা ছাড়া অন্য কাউকে নিজের পিতা বলে দাবি করে, তার জন্য জান্নাত হারাম।’ (বুখারি ৬৭৬৬, মুসলিম ৬৩)
তাফসির ও ফিকহবিদদের ব্যাখ্যা
উল্লিখিত আয়াতের ব্যাখ্যায় আল্লামা শাওকানি (রহ.) বলেন, পালকপুত্রকে পুত্র বলা কেবল মুখের কথা। বাস্তবে এর কোনো শরঈ কার্যকারিতা নেই। কোনো নারী কোনো শিশুকে লালন-পালন করলে তিনি তার প্রকৃত মা হয়ে যান না এবং শিশুটিও তার প্রকৃত সন্তান হিসেবে গণ্য হয় না। ফলে প্রকৃত মা-সন্তানের জন্য নির্ধারিত শরঈ বিধান এ ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে না। (ফাতহুল কাদির ৪/৩০১)
অন্যদিকে আল্লামা যফর আহমাদ উসমানি (রহ.) বলেন, দত্তক নেওয়া সন্তান শরিয়তের বিধানে প্রকৃত সন্তানের সমমর্যাদাসম্পন্ন নয়। তাই সে উত্তরাধিকার লাভের অধিকারী হবে না। (আহকামুল কুরআন ৩/২৯১)
পালিত সন্তানকে কি কোনো সম্পদ দেওয়া যাবে?
হ্যাঁ। ইসলাম পালিত সন্তানকে সম্পদ দেওয়ার পথ সম্পূর্ণ বন্ধ করেনি। বাবা-মা জীবিত অবস্থায় তাকে বৈধভাবে হিবা (দান) করতে পারেন।
মৃত্যুর আগে ওসিয়ত করতে পারেন। তবে শরিয়তের বিধান অনুযায়ী ওসিয়ত মোট সম্পদের এক-তৃতীয়াংশের (১/৩) বেশি হতে পারবে না, যদি উত্তরাধিকারীরা তাতে সম্মতি না দেন।
এ বিষয়ে রাসুলুল্লাহ (সা.) হজরত সাদ ইবন আবি ওয়াক্কাস (রা.)-কে বলেন—
الثُّلُثُ، وَالثُّلُثُ كَثِيرٌ
‘এক-তৃতীয়াংশ (ওসিয়ত করতে পারো), আর এক-তৃতীয়াংশও অনেক।’ (বুখারি ২৭৪২, মুসলিম ১৬২৮)
