মূল খবরে ফিরে যান
যা দেখছেন, PDF-এও সেটাই থাকবে। প্রিন্ট ডায়ালগে “Save as PDF” বেছে নিন।
Thursday, 23 July 2026
অন্যান্য
banglabrief.com/
সংস্করণ
23 July 2026
অন্যান্য

ইয়াবার টাকায় শক্তিশালী হচ্ছে সশস্ত্র গোষ্ঠী

রাত নামলেই বদলে যায় কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনাফের রোহিঙ্গা ক্যাম্পসংলগ্ন এলাকার চিত্র। সন্ধ্যার পর প্রয়োজন ছাড়া ঘর থেকে বের হতে চান না অনেক স্থানীয় বাসিন্দা। আগেভাগেই দোকানপাট গুটিয়ে ফেলেন ব্যবসায়ীরা। পাহাড়ঘেরা জনপদে গুলির শব্দ, অপহরণের খবর কিংবা আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষের গুঞ্জন এখন অনেকের কাছে নিত্যদিনের বাস্তবতা।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একের পর এক অভিযানে আগ্নেয়াস্ত্র, গোলাবারুদ, বিপুল পরিমাণ ইয়াবা উদ্ধার এবং বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর সদস্যদের গ্রেপ্তার করা হলেও ক্যাম্পকেন্দ্রিক সংঘবদ্ধ অপরাধ পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসছে না। বরং স্থানীয় বাসিন্দা, জনপ্রতিনিধি ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক সূত্রের ভাষ্য, ইয়াবা পাচার, অপহরণ, চাঁদাবাজি, মানবপাচার এবং আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর তৎপরতা নতুন মাত্রা পেয়েছে। এর প্রভাব এখন ক্যাম্পের গণ্ডি ছাড়িয়ে আশপাশের স্থানীয় জনপদেও ছড়িয়ে পড়ছে।

একাধিক আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তা, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও সংশ্লিষ্ট সূত্রের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মিয়ানমার সীমান্তঘেঁষা বিভিন্ন রুট ব্যবহার করে ইয়াবা পাচারের সঙ্গে জড়িত চক্রগুলো ক্যাম্পভিত্তিক অপরাধী গোষ্ঠীর সহযোগিতা নিচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। সীমান্ত পেরিয়ে আসা ইয়াবা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সরবরাহের ক্ষেত্রে ক্যাম্পকে নিরাপদ ট্রানজিট হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। এই মাদক কারবারের নিয়ন্ত্রণ, চাঁদাবাজি ও প্রভাব বিস্তারকে কেন্দ্র করেই বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ঘটনা ঘটছে।

পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ৯০টি হত্যাকাণ্ড ঘটে। ২০২৪ সালে হত্যাকাণ্ডের সংখ্যা ছিল অন্তত ৬৫টি। আর ২০২৫ সালের প্রথম নয় মাসেই ৬৬ জন নিহত হন। এর মধ্যে উখিয়ার ক্যাম্পগুলোতে ৫৮টি এবং টেকনাফের ক্যাম্পে ৮টি হত্যাকাণ্ড ঘটে।

অপহরণের ঘটনাও ক্রমাগত বাড়ছে। সংশ্লিষ্টদের তথ্য বলছে, ২০২৩ সালে ৩৮৪টি এবং ২০২৪ সালে ৪৪৬টি অপহরণের ঘটনা রেকর্ড হয়েছে। অপহরণের শিকারদের মধ্যে শুধু রোহিঙ্গা নন, স্থানীয় কৃষক, জেলে, ব্যবসায়ী, শ্রমিক ও সাধারণ মানুষও রয়েছেন।

স্থানীয়দের অভিযোগ, সাম্প্রতিক সময়ে অপহরণ একটি লাভজনক অপরাধে পরিণত হয়েছে। ভুক্তভোগীদের অপহরণের পর দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় নিয়ে আটকে রাখা হয়। এরপর পরিবারের সদস্যদের কাছে মোবাইল ফোনে মোটা অঙ্কের মুক্তিপণ দাবি করা হয়। দাবি অনুযায়ী টাকা না পেলে শারীরিক নির্যাতন চালানোর অভিযোগ রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে মুক্তিপণ আদায়ের পরও হত্যার ঘটনাও ঘটেছে বলে স্থানীয়রা দাবি করেন। নিরাপত্তার আশঙ্কায় অনেক পরিবার থানায় অভিযোগ করতেও সাহস পায় না।

ক্যাম্পসংলগ্ন এলাকার বাসিন্দাদের অভিযোগ, সন্ধ্যার পর থেকেই চুরি, ছিনতাই, ডাকাতি ও সশস্ত্র তৎপরতা বেড়ে যায়। অপরাধ সংঘটনের পর অনেক অভিযুক্ত দ্রুত ক্যাম্পের ভেতরে আশ্রয় নেওয়ায় তাদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তার করা কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য অভিযান পরিচালনাও চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়।

স্থানীয়দের ভাষ্য, নিরাপত্তাহীনতার কারণে ব্যবসায়ীরা আগেভাগে দোকান বন্ধ করে দেন। কৃষক ও শ্রমজীবী মানুষ অনেক সময় রাতে জমিতে বা কর্মস্থলে যেতে ভয় পান।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিভিন্ন অভিযানে প্রায়ই দেশীয় ও বিদেশি আগ্নেয়াস্ত্র, গুলি, ম্যাগাজিন, ধারালো অস্ত্র এবং বিপুল পরিমাণ ইয়াবা উদ্ধার হচ্ছে। তবুও সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব হচ্ছে না।

সংশ্লিষ্টদের মতে, অপরাধী গোষ্ঠীগুলোর হাতে অবৈধ অস্ত্র পৌঁছে যাওয়ায় সংঘর্ষগুলো আরও প্রাণঘাতী হয়ে উঠছে। মাদকের অর্থের জোরে এসব গোষ্ঠী নতুন সদস্য সংগ্রহ করছে এবং নিজেদের প্রভাব বিস্তার অব্যাহত রাখছে।

অধিকার বাস্তবায়ন কমিটির সভাপতি ইঞ্জিনিয়ার রবিউল হোছাইন বলেন, রোহিঙ্গা ক্যাম্পকেন্দ্রিক সন্ত্রাস এখন আর শুধু ক্যাম্পের সমস্যা নয়। এর প্রভাব পুরো কক্সবাজারের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে পড়ছে। অস্ত্র, মাদক ও মানবপাচারের নেটওয়ার্ক ভাঙতে না পারলে পরিস্থিতি আরও জটিল হবে।

পালংখালী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান গফুর উদ্দিন চৌধুরী বলেন, ক্যাম্পসংলগ্ন এলাকায় চুরি, ছিনতাই ও ডাকাতির ঘটনা বেড়েছে। স্থানীয় মানুষ নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। নিয়মিত অভিযানের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা পরিকল্পনা ও কার্যকর নজরদারি প্রয়োজন।

কক্সবাজারের পুলিশ সুপার এ.এন.এম. সাজেদুর রহমান গণমাধ্যমে বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ, এপিবিএন, র‍্যাবসহ অন্যান্য সংস্থা সমন্বিতভাবে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছে। অস্ত্র, মাদক, অপহরণ ও সন্ত্রাস দমনে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। অপরাধী যে-ই হোক, তাকে আইনের আওতায় আনা হবে।

বিশ্লেষকদের মতে, রোহিঙ্গা ক্যাম্পকেন্দ্রিক অপরাধের পেছনে সবচেয়ে বড় চালিকাশক্তি হলো ইয়াবা পাচার, অবৈধ অস্ত্র, চাঁদাবাজি ও মানবপাচার থেকে আসা বিপুল অর্থ। এই অর্থকে কেন্দ্র করেই বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর মধ্যে আধিপত্যের লড়াই চলছে। অভিযানে অস্ত্র ও মাদক উদ্ধার হলেও অপরাধচক্রের অর্থায়নের উৎস, সীমান্ত দিয়ে মাদকের সরবরাহ ব্যবস্থা এবং সশস্ত্র গোষ্ঠীর নেটওয়ার্ক পুরোপুরি ভাঙা না গেলে পরিস্থিতির স্থায়ী উন্নতি কঠিন হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।