মূল খবরে ফিরে যান
যা দেখছেন, PDF-এও সেটাই থাকবে। প্রিন্ট ডায়ালগে “Save as PDF” বেছে নিন।
Sunday, 26 July 2026
অন্যান্য
banglabrief.com/
সংস্করণ
25 July 2026
অন্যান্য

বিশ্বের একমাত্র দেশ, যেখানে নেই কোনো ট্রাফিক সিগন্যাল! তবুও কীভাবে চলে যানবাহন?

আধুনিক শহরের ব্যস্ত সড়কে ট্রাফিক সিগন্যাল ছাড়া যান চলাচলের কথা কল্পনাই করা যায় না। লাল, হলুদ ও সবুজ আলোর নির্দেশ মেনেই প্রতিদিন লাখো যানবাহন চলাচল করে। কিন্তু অবাক করার মতো বিষয় হলো, বিশ্বের একটি স্বাধীন দেশে রাজধানী শহরেই নেই কোনো ট্রাফিক সিগন্যাল। তারপরও সেখানে নিয়ম মেনে, নিরাপদভাবেই চলছে যানবাহন।

দেশটির নাম ভুটান। হিমালয়ের কোলে অবস্থিত এই ছোট্ট দেশটি শুধু প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্যই নয়, বরং ব্যতিক্রমী জীবনধারা ও প্রশাসনিক ব্যবস্থার জন্যও বিশ্বজুড়ে পরিচিত। রাজধানী থিম্পুর প্রধান মোড়গুলোতে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ করেন প্রশিক্ষিত পুলিশ সদস্যরা। তাঁদের হাতের বিশেষ সংকেতেই গাড়ি থামে, এগোয় কিংবা দিক পরিবর্তন করে।

ট্রাফিক সিগন্যাল বসানো হয়েছিল, কিন্তু টেকেনি

অনেকেই জানেন না, থিম্পুতে একবার ট্রাফিক সিগন্যাল বসানো হয়েছিল। ১৯৯০-এর দশকের শেষ দিকে রাজধানীর একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে পরীক্ষামূলকভাবে সিগন্যাল স্থাপন করা হয়। কিন্তু স্থানীয় বাসিন্দারা সেটি ভালোভাবে গ্রহণ করেননি।

তাদের মতে, যান্ত্রিক সিগন্যালের তুলনায় ট্রাফিক পুলিশের উপস্থিতি বেশি কার্যকর এবং মানবিক। মানুষের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের মাধ্যমে যান চলাচল নিয়ন্ত্রণ করাই তাদের কাছে বেশি স্বাভাবিক মনে হয়েছে। পরে সেই সিগন্যাল সরিয়ে আবার আগের ব্যবস্থাই চালু করা হয়।

পুলিশের হাতের ইশারাই শেষ কথা

থিম্পুর ব্যস্ত মোড়গুলোতে সাধারণত কাঠের নকশা করা ছোট ছাউনির নিচে দাঁড়িয়ে দায়িত্ব পালন করেন ট্রাফিক পুলিশ। সাদা দস্তানা পরে নির্দিষ্ট ভঙ্গিতে হাত নাড়িয়ে চালকদের নির্দেশ দেন তারা।

কখন গাড়ি থামবে, কোন দিক আগে যাবে কিংবা কখন পথচারী রাস্তা পার হবে—সবকিছুই নির্ধারণ করেন দায়িত্বে থাকা পুলিশ সদস্য। স্থানীয় চালকেরাও এই নির্দেশ কঠোরভাবে মেনে চলেন।

কম জনসংখ্যা, বেশি শৃঙ্খলা

ভুটানের জনসংখ্যা প্রায় ৮ লাখের কিছু বেশি। রাজধানী থিম্পুতেও যানবাহনের সংখ্যা বিশ্বের বড় শহরগুলোর তুলনায় অনেক কম। ফলে দীর্ঘ যানজট খুব একটা দেখা যায় না।

তবে শুধু কম গাড়ি থাকাই নয়, দেশটির মানুষের মধ্যে ট্রাফিক আইন মেনে চলার প্রবণতাও উল্লেখযোগ্য। অপ্রয়োজনে হর্ন বাজানো নিরুৎসাহিত করা হয় এবং পথচারীদের অগ্রাধিকার দেওয়ার সংস্কৃতি দীর্ঘদিন ধরে গড়ে উঠেছে।

‘গ্রস ন্যাশনাল হ্যাপিনেস’-এর দর্শনেরও প্রভাব

ভুটান বিশ্বের একমাত্র দেশ, যেখানে উন্নয়নের অন্যতম সূচক হিসেবে ব্যবহার করা হয় গ্রস ন্যাশনাল হ্যাপিনেস (Gross National Happiness বা GNH)। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি নাগরিকের মানসিক শান্তি, পরিবেশ সংরক্ষণ, সংস্কৃতি এবং সুশাসনকে সমান গুরুত্ব দেওয়া হয়।

অনেক বিশ্লেষকের মতে, এই দর্শনের প্রভাব ট্রাফিক ব্যবস্থাপনাতেও দেখা যায়। দ্রুতগতির প্রতিযোগিতার বদলে ধৈর্য, পারস্পরিক সম্মান এবং শৃঙ্খলাকেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়।

পর্যটকদের জন্যও এক অভিনব অভিজ্ঞতা

থিম্পুতে ঘুরতে যাওয়া বিদেশি পর্যটকদের কাছে ট্রাফিক পুলিশের এই অভিনব ব্যবস্থা অন্যতম আকর্ষণ। অনেকেই রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণের দৃশ্য ভিডিও করেন বা ছবি তোলেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও এসব ভিডিও নিয়মিত ভাইরাল হয়।

বিশেষ করে নকশা করা ঐতিহ্যবাহী ট্রাফিক বুথ এবং পুলিশের নিখুঁত হাতের সংকেত ভুটানের একটি আলাদা পরিচয় হয়ে উঠেছে।

ভবিষ্যতে কি ট্রাফিক সিগন্যাল আসবে?

ভুটানে ধীরে ধীরে গাড়ির সংখ্যা বাড়ছে। পর্যটক ও নগরায়ণও আগের তুলনায় বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে ভবিষ্যতে কোনো কোনো এলাকায় আধুনিক ট্রাফিক ব্যবস্থার প্রয়োজন হতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন।

তবে এখন পর্যন্ত রাজধানী থিম্পুতে ট্রাফিক সিগন্যাল বসানোর কোনো বড় পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হয়নি। সরকারও আপাতত বিদ্যমান মানবনির্ভর ব্যবস্থাকেই কার্যকর মনে করছে।

প্রযুক্তির বাইরেও সফলতার গল্প

ভুটানের ট্রাফিক ব্যবস্থা দেখিয়ে দেয়, উন্নত প্রযুক্তি সব সময় একমাত্র সমাধান নয়। নাগরিকদের আইন মানার প্রবণতা, দায়িত্বশীল আচরণ এবং দক্ষ ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা থাকলে অনেক ক্ষেত্রেই সহজ পদ্ধতিতেও সফলভাবে যান চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।

বিশ্ব যখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, স্মার্ট সিগন্যাল ও স্বয়ংক্রিয় ট্রাফিক ব্যবস্থার দিকে এগোচ্ছে, তখন ভুটান এখনও মানবিক স্পর্শকে গুরুত্ব দিয়ে একটি ব্যতিক্রমী উদাহরণ হয়ে আছে।