মূল খবরে ফিরে যান
এই প্রিভিউ আর চূড়ান্ত প্রিন্ট/PDF একই লেআউট ব্যবহার করে।
Tuesday, 28 July 2026
অন্যান্য
banglabrief.com/
সংস্করণ
28 July 2026
অন্যান্য

গাইবান্ধা নিয়ে রংপুর-বগুড়ার টানাটানি, রংপুরের শিকড় ছাড়তে নারাজ গাইবান্ধা

উত্তরের পাঁচ জেলা নিয়ে সম্ভাব্য ‘বগুড়া বিভাগ’ গঠনের আলোচনা সামনে আসতেই নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে গাইবান্ধা। প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাসের প্রস্তাব ঘিরে যখন বগুড়া বিভাগের পক্ষে সমর্থনের খবর ছড়াচ্ছে, তখন গাইবান্ধাজুড়ে উঠছে ভিন্ন সুর। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে বিভিন্ন মহলে একটাই দাবি—ভাষা, সংস্কৃতি, ইতিহাস ও আত্মপরিচয়ের বন্ধনে গাইবান্ধা যুগ যুগ ধরে রংপুরের অংশ। তাই প্রশাসনিক সুবিধার নামে এই জেলার ঐতিহাসিক পরিচয় বদলে দেওয়া উচিত নয়।

সম্প্রতি বগুড়ার একটি সেমিনারে বগুড়া, গাইবান্ধা, নওগাঁ, জয়পুরহাট ও সিরাজগঞ্জ—এই পাঁচ জেলা নিয়ে পৃথক ‘বগুড়া বিভাগ’ গঠনের পক্ষে কয়েকজন মন্ত্রী ও সংসদ সদস্য সমর্থন জানান। এরপরই বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। তবে সরকারিভাবে এখনো নতুন বিভাগ গঠনের কোনো আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত বা প্রক্রিয়া শুরু হয়নি।

জানা গেছে, গত ২৫ জুলাই বগুড়ার একটি পাঁচতারকা হোটেলে আয়োজিত সেমিনারে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমসহ বিভিন্ন জেলার সংসদ সদস্যরা বগুড়াকে বিভাগ ঘোষণার পক্ষে মত দেন। তাদের যুক্তি, উত্তরাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক কেন্দ্র হিসেবে বগুড়াকে বিভাগ করা হলে প্রশাসনিক সেবা জনগণের আরও কাছে পৌঁছাবে এবং বিকেন্দ্রীকরণ জোরদার হবে।

একই দিন রাতে বগুড়া জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত উন্নয়নবিষয়ক মতবিনিময় সভায়ও বগুড়া বিভাগ বাস্তবায়নের দাবি পুনর্ব্যক্ত করা হয়। সেখানে বলা হয়, চার জেলা নিয়ে যদি সিলেট ও বরিশাল বিভাগ থাকতে পারে, তাহলে পাঁচ জেলা নিয়ে বগুড়া বিভাগ গঠনে কোনো বাধা থাকার কথা নয়।

কিন্তু এই প্রস্তাবের পর থেকেই গাইবান্ধায় শুরু হয়েছে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অসংখ্য মানুষ লিখছেন, গাইবান্ধার ভাষা, সংস্কৃতি, লোকঐতিহ্য, ভাওয়াইয়া, কৃষিনির্ভর জীবনধারা ও সামাজিক ইতিহাস রংপুর বিভাগের অন্যান্য জেলার সঙ্গে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে একই ধারায় বিকশিত হয়েছে। প্রশাসনিক সীমানা পরিবর্তন করা গেলেও এই সাংস্কৃতিক বন্ধন পরিবর্তন করা সম্ভব নয়।

স্থানীয় সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ও সচেতন নাগরিকদের মতে, গাইবান্ধার মানুষের ভাষা রংপুর অঞ্চলের আঞ্চলিক ভাষারই অংশ। এখানকার লোকসংগীত ভাওয়াইয়া, নদীকেন্দ্রিক জীবন, কৃষিভিত্তিক অর্থনীতি, উৎসব-অনুষ্ঠান এবং সামাজিক রীতিনীতি রংপুর, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, নীলফামারী ও দিনাজপুরের সঙ্গে একই সাংস্কৃতিক ধারায় গড়ে উঠেছে। ফলে প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাসের আগে এ জেলার মানুষের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

বিশ্লেষকদের মতে, ২০১০ সালের ২৫ জানুয়ারি রংপুর বিভাগ প্রতিষ্ঠা উত্তরাঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের আত্মপরিচয়ের স্বীকৃতি ছিল। সেই বিভাগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জেলা গাইবান্ধাকে বিচ্ছিন্ন করার প্রশ্নটি কেবল প্রশাসনিক নয়, এটি ঐতিহাসিক, ভাষাগত ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের সঙ্গেও জড়িত।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকেই লিখছেন, উন্নয়নের প্রয়োজন হলে প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ করা যেতে পারে, কিন্তু গাইবান্ধার ইতিহাস ও সাংস্কৃতিক পরিচয় যেন ক্ষুণ্ন না হয়। তাদের ভাষায়, “রংপুর আমাদের শিকড়, আমাদের ভাষা, আমাদের সংস্কৃতি। গাইবান্ধা রংপুরেরই অংশ ছিল, আছে এবং থাকবে।”

গাইবান্ধার স্থানীয় সাংবাদিক সুদীপ্ত শামীম বলেন,"গাইবান্ধার মানুষের ভাষা, সংস্কৃতি, লোকঐতিহ্য, ভাওয়াইয়া, কৃষিজীবন—সবকিছুই যুগ যুগ ধরে রংপুর বিভাগের সঙ্গে একাত্ম। প্রশাসনিক সুবিধার বিষয়টি অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু সাংস্কৃতিক পরিচয়ও সমান গুরুত্বপূর্ণ। গাইবান্ধাকে রংপুর বিভাগ থেকে আলাদা করার মতো যেকোনো উদ্যোগের আগে এখানকার মানুষের মতামতকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া উচিত।"

সুন্দরগঞ্জের ভাওয়াইয়া গানের গীতিকার ও সুরকার রেজাউল ইসলাম বলেন, "ভাওয়াইয়া শুধু একটি গান নয়, এটি উত্তরবঙ্গের মানুষের আত্মপরিচয়। গাইবান্ধার মানুষ ভাষা, সংস্কৃতি, লোকসংগীত ও ঐতিহ্যের দিক থেকে রংপুরেরই অবিচ্ছেদ্য অংশ। প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় এই ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক বন্ধনকে উপেক্ষা করা ঠিক হবে না। মানুষের আবেগ ও ঐতিহ্যের মূল্যায়ন করেই যেকোনো সিদ্ধান্ত হওয়া উচিত।"

এদিকে রংপুর বিভাগের প্রতি আবেগের বিষয়টি নতুন নয়। উত্তরবঙ্গের ভাষা, ভাওয়াইয়া সংগীত, কৃষিনির্ভর জীবন, তিস্তা-ব্রহ্মপুত্র অববাহিকার ইতিহাস এবং দীর্ঘদিনের সামাজিক বন্ধন গাইবান্ধাকে রংপুর অঞ্চলের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে বলে মনে করেন স্থানীয়রা।

তবে সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, বগুড়া বিভাগ গঠনের বিষয়টি এখনো প্রস্তাব ও আলোচনা পর্যায়ে রয়েছে। এ বিষয়ে সরকারিভাবে কোনো প্রজ্ঞাপন বা চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। ফলে প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাসের প্রশ্নে জনমত, ভৌগোলিক বাস্তবতা, প্রশাসনিক প্রয়োজন, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও উন্নয়ন পরিকল্পনা—সব বিষয় বিবেচনায় নিয়েই ভবিষ্যতে সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে।

এরই মধ্যে গাইবান্ধার মানুষের বড় অংশের স্পষ্ট অবস্থান—উন্নয়ন চাই, বিকেন্দ্রীকরণও চাই; কিন্তু নিজের ভাষা, ইতিহাস, সংস্কৃতি ও শিকড়ের বিনিময়ে নয়। গাইবান্ধা রংপুর বিভাগের সঙ্গেই থাকুক—এটাই তাদের প্রত্যাশা।