29 July 2026
কওমি মাদরাসার মর্যাদা ও ভাবমূর্তি রক্ষায় শায়খ আহমাদুল্লাহর ৬ প্রস্তাব

শায়খ আহমাদুল্লাহর সম্পূর্ণ ফেসবুক পোস্টের ওপর ভিত্তি করে বস্তুনিষ্ঠ ও প্রফেশনাল একটি প্রতিবেদন নিচে তৈরি করে দেওয়া হলো:
কওমি মাদরাসার মর্যাদা ও ভাবমূর্তি রক্ষায় শায়খ আহমাদুল্লাহর ৬ প্রস্তাব
সাম্প্রতিক সময়ে কওমি মাদরাসা কেন্দ্রিক নানা অনাকাঙ্ক্ষিত ও নেতিবাচক সংবাদের পরিপ্রেক্ষিতে দেশের বিশিষ্ট ওলামায়ে কেরাম ও দায়িত্বশীল মুরব্বিদের প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানিয়েছেন জনপ্রিয় ইসলামিক স্কলার ও আস-সুন্নাহ ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান শায়খ আহমাদুল্লাহ।
কওমি মাদরাসার সাবেক শিক্ষার্থী, শিক্ষক এবং শুভাকাঙ্ক্ষী হিসেবে এই দ্বীনি শিক্ষা ব্যবস্থার ভাবমূর্তি, ঐতিহ্য ও মর্যাদা রক্ষায় তিনি ৬ দফা প্রস্তাবনা পেশ করেছেন।
কওমি মাদরাসার ঐতিহাসিক অবদান ও বাস্তব সংকট
শায়খ আহমাদুল্লাহ তাঁর বক্তব্যে কওমি মাদরাসার ইতিবাচক দিকগুলো তুলে ধরে বলেন:
সামাজিক নিরাপত্তা বলয়: রাষ্ট্রীয় কোনো অনুদান ছাড়াই জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অনুদানে ‘লিল্লাহ বোর্ডিং’ ও এতিমখানার মাধ্যমে লাখ লাখ এতিম ও দুস্থ শিশুর দায়িত্ব পালন করছে কওমি মাদরাসা, যা রাষ্ট্রকে বিশাল সামাজিক ও অর্থনৈতিক বোঝা থেকে মুক্ত রাখছে।
নৈতিক শিক্ষার কেন্দ্র: দক্ষিণ এশিয়ার ধর্মীয় ও সামাজিক মনন গঠনে এবং আদর্শ নাগরিক তৈরিতে এটি অনন্য ভূমিকা রাখছে।
তবে ইতিবাচক অবদানের পাশাপাশি বিদ্যমান বাস্তব সংকটগুলো স্বীকার করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, শিশুদের প্রতি শারীরিক ও যৌন নির্যাতনের মতো অনাকাঙ্ক্ষিত অপরাধ কোনোভাবেই সহ্য করার মতো নয়। মিডিয়ার অতিরঞ্জন বা ষড়যন্ত্রের অজুহাতে কতিপয় নামধারী শিক্ষকের অপকর্মকে ধামাচাপা না দিয়ে কঠোর আত্মসংশোধনের মাধ্যমে এর সমাধান করতে হবে।
ভাবমূর্তি রক্ষায় শায়খ আহমাদুল্লাহর ৬ প্রস্তাব
দ্বীনের এই সুরক্ষাকবচগুলোকে বাঁচাতে আল-হাইআতুল উলয়া ও বেফাকসহ শীর্ষ ওলামায়ে কেরামের সমীপে তিনি নিম্নলিখিত প্রস্তাবগুলো পেশ করেন:
১. কেন্দ্রীয় তদন্ত কমিটি ও 'ব্ল্যাকলিস্ট' গঠন
- আল-হাইআতুল উলয়ার সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে শীর্ষ আলেম, আইনি ও মনস্তাত্ত্বিক বিশেষজ্ঞদের নিয়ে একটি স্বাধীন তদন্ত কমিটি গঠন করতে হবে।
- অভিযোগ ওঠা মাত্রই সরেজমিনে নিরপেক্ষ তদন্ত করে অপরাধীকে রাষ্ট্রীয় আইনের হাতে সোপর্দ করার সুপারিশ এবং একটি কেন্দ্রীয় 'ব্ল্যাকলিস্ট' (কালো তালিকা) তৈরি করতে হবে, যাতে সে আর কোনো মাদরাসায় চাকরি না পায়।
- অন্যদিকে অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণিত হলে সংবাদ সম্মেলন করে নির্দোষ ব্যক্তির মর্যাদা রক্ষা করতে হবে।
২. গোপনীয় হটলাইন ও 'অভিযোগ গ্রহণ সেল'
- ভিক্টিমদের অভিযোগ জানানোর জন্য একটি নির্দিষ্ট হটলাইনসহ অভিযোগ গ্রহণ সেল গঠন করতে হবে।
- অভিযোগকারীর তথ্য সম্পূর্ণ গোপন রেখে ভিক্টিমের পরিবারকে মনস্তাত্ত্বিক সহায়তা দেওয়া এবং আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করতে হবে।
৩. প্রাতিষ্ঠানিক ও অবকাঠামোগত সংস্কার
- সিসিটিভি মনিটরিং: ক্লাসরুম, বারান্দা এবং বিশেষ করে নূরানী, হিফয ও আবাসিক বিভাগগুলোকে সম্পূর্ণ সিসিটিভির আওতায় আনা।
- নির্দিষ্ট বয়স পর্যন্ত অনাবাসিক রাখা: অতি অল্প বয়সে মা-বাবার স্নেহবঞ্চিত শিশুদের আবাসিক রাখা নিরুৎসাহিত করা। (এতিমদের ক্ষেত্রে বিশেষ ব্যবস্থা থাকবে)।
- আবাসনে পরিবর্তন: ঢালাও বিছানার পরিবর্তে দুই বিছানার মাঝে অন্তত এক হাত ফাঁকা রাখা বা পৃথক খাটের ব্যবস্থা করা।
- ব্যক্তিগত সেবা নিষেধ: শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের থেকে কোনো ধরনের শারীরিক সেবা নিতে পারবেন না—এ ব্যাপারে কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা।
৪. শিক্ষক ও স্টাফদের কর্মপরিবেশ উন্নয়ন
- আচরণবিধি ও প্রশিক্ষণ: শিক্ষকদের জন্য কঠোর ‘আচার-আচরণ নীতিমালা’ প্রণয়ন এবং শিশু মনস্তত্ত্ব ও শিশু সুরক্ষা আইন নিয়ে নিয়মিত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা।
- নিয়োগে বয়স ও বৈবাহিক অবস্থা: হিফয ও প্রাথমিক স্তরে অভিজ্ঞতা ও ব্যক্তিত্বসম্পন্ন বিবাহিত শিক্ষকদের অগ্রাধিকার দেওয়া।
- পারিবারিক সান্নিধ্য: শিক্ষকদের জন্য ‘ফ্যামিলি কোয়ার্টার’ ও নিয়মিত যৌক্তিক ছুটির ব্যবস্থা করা, যাতে তাঁদের জৈবিক ও মনস্তাত্ত্বিক জীবন স্বাভাবিক থাকে।
৫. নারী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য পৃথক নীতি
- মহিলা মাদরাসার অভ্যন্তরীণ প্রশাসনিক ও একাডেমিক কাঠামো সম্পূর্ণ নারী কর্মকর্তা ও শিক্ষিকাদের দ্বারা পরিচালিত হতে হবে।
- পুরুষ শিক্ষক বা স্টাফ নিয়োগ সম্পূর্ণরূপে বর্জন করা (কেবল ফটকে প্রবীণ পুরুষ প্রহরী রাখা যেতে পারে)।
- বালিকা মাদরাসা যথাসম্ভব অনাবাসিক করার চেষ্টা করা।
৬. অনিয়ন্ত্রিত প্রতিষ্ঠানকে নিয়মনীতির আওতায় আনা
- যত্রতত্র অপরিকল্পিত ও মানহীন প্রাইভেট মাদরাসা গড়ে ওঠা বন্ধে কেন্দ্রীয় বোর্ডের মাধ্যমে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা, মাননিয়ন্ত্রণ ও নিবন্ধনের শর্ত আরোপ করা।
শায়খ আহমাদুল্লাহ আশা প্রকাশ করেন, আল-হাইআতুল উলয়া এবং বেফাকসহ জাতীয় বোর্ডগুলো সচেতনতা বৃদ্ধি, নিবন্ধন শর্ত কঠোরকরণ এবং শক্তিশালী মনিটরিংয়ের মাধ্যমে এই নির্দেশনাসমূহ বাস্তবায়ন করবে। তিনি বলেন, "পবিত্র এই অঙ্গন থেকে মানুষের ভরসা হারিয়ে গেলে মুসলিমদের আত্মিক আশ্রয়ের শেষ জায়গাটুকুও বিলীন হয়ে যাবে। তাই আত্মপক্ষ সমর্থনের ঊর্ধ্বে উঠে কঠোর আত্মসংশোধনের মাধ্যমে আমাদের ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে।"
