29 July 2026
শেষ যাত্রাতেও সিন্ডিকেট!

জীবনের শেষ অধ্যায়ের নাম মৃত্যু। আর সেই মৃত্যুর পর প্রিয়জনকে শেষবারের মতো বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার মুহূর্তটি প্রতিটি পরিবারের জন্য সবচেয়ে বেদনাদায়ক। কিন্তু রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে অনেক পরিবারের অভিযোগ, এই শোকের মুহূর্তেও তাদের পড়তে হয় আরেক কঠিন পরীক্ষায়। লাশবাহী অ্যাম্বুলেন্সের ভাড়া নিয়ে দর-কষাকষি, পছন্দের গাড়ি ব্যবহার করতে না পারা, মর্গকেন্দ্রিক হয়রানি এবং বিভিন্ন খাতে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয়ের অভিযোগ যেন এখানে নিত্যদিনের বাস্তবতা।
অনুসন্ধানে হাসপাতালসংশ্লিষ্ট একাধিক ব্যক্তি, ভুক্তভোগী পরিবার এবং স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে এমন চিত্র উঠে এসেছে।
কাগজে এক, বাস্তবে আরেক:
হাসপাতালকে ঘিরে লাশবাহী অ্যাম্বুলেন্স পরিচালনায় দীর্ঘদিন ধরে একটি প্রভাবশালী চক্র সক্রিয় থাকার অভিযোগ উঠেছে। রোগী ও স্বজনদের দাবি, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের নির্ধারিত ভাড়া উপেক্ষা করে অনেক ক্ষেত্রেই দ্বিগুণ-তিনগুণ পর্যন্ত অর্থ আদায় করা হচ্ছে। একই সঙ্গে বাইরে থেকে আসা অ্যাম্বুলেন্সের চলাচলেও নানাভাবে বাধা সৃষ্টি করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। হাসপাতালের নির্ধারিত ভাড়া অনুযায়ী প্রথম ১০০ কিলোমিটার পর্যন্ত প্রতি কিলোমিটারে ৩৫ টাকা এবং এরপর প্রতি কিলোমিটারে ৩০ টাকা নির্ধারিত থাকলেও অনেক স্বজনের অভিযোগ, বাস্তবে সেই তালিকার কোনো প্রতিফলন দেখা যায় না। হাসপাতাল এলাকায় পৌঁছানোর পরই শুরু হয় একাধিক চালকের ডাকাডাকি। অনেক পরিবার জানায়, শোকের মুহূর্তে বিকল্প খোঁজার সুযোগ না থাকায় শেষ পর্যন্ত দাবি করা ভাড়াতেই রাজি হতে হয়।
মৃত্যুর পরই সক্রিয় হয়ে ওঠে দালাল চক্র:
হাসপাতাল সংশ্লিষ্ট একাধিক ব্যক্তি জানান, কোনো রোগীর মৃত্যু ঘটার পর খুব অল্প সময়ের মধ্যেই ওয়ার্ড বয়য়ের মাধ্যমে অ্যাম্বুলেন্স চালক বা তাদের প্রতিনিধিরা স্বজনদের কাছে পৌঁছে যান। এরপর তারা শুরু করেন মরাদেহ সামনে রেখে বহনের দরকষাকষি। বিশেষ করে হাসপাতালের ৩২ নং ওয়ার্ডে প্রায় সাত জনের মত লাশবাহী গাড়ি সিন্ডিকেটের সদস্যরা সক্রিয় থেকে রোগীর স্বজনদের নিজ নিজ এম্বুলেন্স নেওয়ার জন্য অতিরিক্ত ভাড়া দাবি করে। এরপর স্বজনদের বাধ্য করা হয় তাদের সিন্ডিকেটের অ্যাম্বুলেন্স নিতে। এই লাশবাহী অ্যাম্বুলেন্সের ভাড়ার একটি বড় অংশ কমিশন হিসেবে চলে যায় চক্রটির পকেটে। স্বজনদের অভিযোগ, অনেক সময় পরিচিত অ্যাম্বুলেন্স ডাকতে চাইলেও নিরুৎসাহিত করা হয় কিংবা নানা অজুহাত দেখানো হয়।
১০ জনের কাছে জিম্মি লাশবাহী গাড়ি :
রামেক হাসপাতালে ১০ জনের একটি চক্র এই অ্যাম্বুলেন্স নিয়ন্ত্রণ করছে। চক্রটি প্রভাবশালী। তারা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের নির্ধারিত ভাড়ার তোয়াক্কা করে না। এই চক্রের মূল হোতা হিসেবে কয়েজনের নাম এসেছে। তারা হলেন, সুমন, ডালিম, বাদশা, সাদ্দাম, বিপ্লব ও নিপুন,জনি,সনি, নিশান, জামাল । এর মধ্যে সুমনের রয়েছে ১১টি এবং বিপ্লব ও নিপুনের রয়েছে ৪টি করে অ্যাম্বুলেন্স।তবে সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন সিন্ডিকেটের মূল হোতা বলে পরিচিত সুমন ও ডালিম। তাদের দাবি, তারা কোনো সিন্ডিকেট পরিচালনা করেন না।
বাইরের অ্যাম্বুলেন্সে বাধার অভিযোগ:
ভুক্তভোগীদের কয়েকজনের অভিযোগ, তারা কম ভাড়ার পরিচিত অ্যাম্বুলেন্স আনতে চাইলে নানা বাধার মুখে পড়েন। কেউ কেউ দাবি করেছেন, বাইরের গাড়ি হাসপাতালে প্রবেশ করতে নিরুৎসাহিত করা হয়। কেউ বাহিরের গাড়ি হাসপাতালে প্রবেশ করতে চাইলে সিন্ডিকেট দ্বারা মারধরের শিকার হন। নাটোরে বড়াইগ্রাম উপজেলার এক আব্দুর রহমান নামে এক ব্যক্তি বলেন, “আমরা আগে যে গাড়িতে রোগী নিয়ে এসেছিলাম, মৃত্যুর পর সেই গাড়িতেই মরদেহ নিতে চেয়েছিলাম। কিন্তু বলা হলো অন্য গাড়ি নিতে হবে। তখন পরিবারের অবস্থা এমন ছিল যে কথা বলার মত পরিবেশ ছিলো না, পরে তাদের দ্বিগুণ ভাড়া দিয়ে গাড়ি নিয়ে নাটোর উদ্দেশ্যে যাত্রা করতে হয়। চাঁপাইনবাবগঞ্জের রহিম নেওয়াজ বলেন, প্রথমে যে ভাড়া বলা হয়েছিল, সেটা শুনে আমরা হতবাক। অনেক অনুরোধের পর কিছুটা কমানো হয়। আমারা বলি হাসপাতালের নির্ধারিত ভাড়া কেন তারা মানেন না, জিজ্ঞাসা করলে তারা বলেন, ওইটা বোর্ডেই সীমাবদ্ধ , ওই হিসাব করলে চলবে না।
সরকারি ব্যবস্থার অভাব :
রামেকে সরকারি লাশবাহী অ্যাম্বুলেন্স না থাকায় পুরো সেবাটি বেসরকারি ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল। নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের মতে, সরকারি বিকল্প না থাকায় প্রতিযোগিতা কমে যায় এবং ভাড়া নিয়ন্ত্রণও কঠিন হয়ে পড়ে। এক্ষেত্রে তারা হাসপাতাল এলাকায় দৃশ্যমান স্থানে ভাড়ার তালিকা প্রদর্শন।প্রতিটি ট্রিপের জন্য রসিদ বাধ্যতামূলক করা।অভিযোগ গ্রহণে হেল্পডেস্ক চালু করা। বাইরের নিবন্ধিত অ্যাম্বুলেন্সের অবাধ প্রবেশ নিশ্চিত করা। সরকারি লাশবাহী অ্যাম্বুলেন্স চালুর উদ্যোগ নেওয়ার পরামর্শ দেন।
হাসপাতালের আগের উদ্যোগ :
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, অতীতে হাসপাতাল প্রশাসন বিষয়টি নিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও প্রশাসনের বিভিন্ন দপ্তরে লিখিতভাবে অবহিত করেছিল। তবে ভুক্তভোগীদের দাবি, মাঠপর্যায়ে এখনো দৃশ্যমান পরিবর্তন দেখা যায়নি।
এ বিষয়ে রাজশাহী মেট্রোপলিটন পুলিশের মুখপাত্র গাজিউর রহমান বলেন, হাসপাতালের অ্যাম্বুলেন্স সিন্ডিকেটের বিষয়টি সমাধানের জন্য ইতিমধ্যেই কাজ চলছে। হাসপাতালে কোন সিন্ডিকেট রাখা হবে না।
