29 July 2026
সুন্দরবনে বাড়ল বাঘের সংখ্যা, নতুন আশা সংরক্ষণ কার্যক্রমে

প্রকৃতির বিস্ময় সুন্দরবন শুধু বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বনই নয়, এটি বাংলাদেশের প্রাকৃতিক সুরক্ষা প্রাচীর এবং রয়েল বেঙ্গল টাইগারের একমাত্র আবাসস্থল। একসময় জলবায়ু পরিবর্তন, ঘূর্ণিঝড়, লবণাক্ততা বৃদ্ধি, বনজ সম্পদের ওপর অতিরিক্ত চাপ, অবৈধ শিকার ও মানব সৃষ্ট নানা কারণে আশঙ্কাজনক হারে কমছিল জাতীয় পশু রয়েল বেঙ্গল টাইগারের সংখ্যা।
তবে দীর্ঘদিনের পরিকল্পিত সংরক্ষণ কার্যক্রম, কঠোর নজরদারি এবং সরকারি-বেসরকারি সমন্বিত উদ্যোগে পরিস্থিতির পরিবর্তন হতে শুরু করেছে। সর্বশেষ জরিপে দেখা গেছে, গত সাত বছরে সুন্দরবনে ১১টি বাঘ বেড়েছে, যা বাঘ সংরক্ষণে নতুন আশার বার্তা হয়ে এসেছে।
বিশ্ব বাঘ দিবসে প্রকাশিত এ তথ্য প্রকৃতিপ্রেমী, গবেষক, বনজীবী এবং পরিবেশবিদদের মধ্যে আশাবাদ তৈরি করেছে। তবে তারা বলছেন, এই অর্জন ধরে রাখতে হলে এখনই আরও কার্যকর ও দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ নিতে হবে।
'সুন্দরবন রক্ষায় আমরা'–এর সমন্বয়কারী মোঃ নুর আলম শেখ জানান, ২০২৫ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ, রোগব্যাধি, শিকার এবং মানব সৃষ্ট নানা কারণে সুন্দরবনে ৯১টি বাঘের মৃত্যু হয়েছে। এতে বাঘের সংখ্যা উদ্বেগজনকভাবে কমে গেলেও বন বিভাগের বিশেষ সংরক্ষণ পরিকল্পনা এবং নজরদারি জোরদারের ফলে সাম্প্রতিক সময়ে ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে।
বাঘের সংখ্যা হ্রাস পাওয়ার পর বন বিভাগ নতুন কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করে। বাঘের নিরাপত্তা, আবাসস্থল সংরক্ষণ, প্রজনন নিশ্চিতকরণ এবং খাদ্যের উৎস রক্ষায় নেওয়া হয় বিভিন্ন উদ্যোগ। সম্প্রতি পরিচালিত দুটি পৃথক জরিপে সেই উদ্যোগের ইতিবাচক ফলাফল উঠে এসেছে।
তবে গবেষকদের মতে, শুধু সংখ্যা বৃদ্ধি পেলেই আত্মতুষ্টির সুযোগ নেই। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান ডিসিপ্লিনের অধ্যাপক ড. আবদুল্লাহ হারুন চৌধুরী বলেন, বাঘের আবাসস্থলে মানুষের অবাধ চলাচল তাদের স্বাভাবিক জীবনযাপন ও প্রজননের জন্য বড় হুমকি। তাই বনের পরিবেশ যতটা সম্ভব নিরবচ্ছিন্ন রাখতে হবে।
একই বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও গবেষক সামিউল হক বলেন, বাঘের নিরাপদ আবাসস্থল নিশ্চিত করা, হরিণসহ পর্যাপ্ত খাদ্যের ব্যবস্থা করা, অবৈধ শিকার ও পাচার সম্পূর্ণ বন্ধ করা, বাঘ-মানুষের দ্বন্দ্ব কমানো এবং আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে নিয়মিত পর্যবেক্ষণ অব্যাহত রাখাই হবে বাঘ সংরক্ষণের মূল চাবিকাঠি।
পূর্ব সুন্দরবনের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মোঃ রেজাউল করিম চৌধুরী জানান, বাঘের প্রধান খাদ্য হরিণ। তাই হরিণ শিকার ও পাচার রোধে বন বিভাগ কঠোর অবস্থানে রয়েছে। ইতোমধ্যে শিকারি ও পাচারকারীদের তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে এবং তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার কার্যক্রম চলছে। তিনি বলেন, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে ধারাবাহিক উদ্যোগের ফলেই সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা বাড়ছে এবং তাদের নিরাপত্তা আগের তুলনায় অনেক বেশি নিশ্চিত হয়েছে।
পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ড. শেখ ফরিদুল ইসলাম বলেন, বাঘ-মানুষের দ্বন্দ্ব কমাতে এবং লোকালয়ে বাঘের প্রবেশ ঠেকাতে বনসংলগ্ন ৭৪ কিলোমিটার এলাকায় পরিবেশবান্ধব বিশেষ সুতলির বেড়া নির্মাণ করা হচ্ছে। এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে বাঘ ও মানুষের নিরাপত্তা আরও নিশ্চিত হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সুন্দরবন রক্ষা মানেই শুধু একটি বন রক্ষা নয়; এটি দেশের জীববৈচিত্র্য, উপকূলীয় পরিবেশ এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলার অন্যতম প্রধান ঢালকে রক্ষা করা। আর সুন্দরবনের প্রাণ রয়েল বেঙ্গল টাইগার নিরাপদ থাকলেই এই অনন্য বনভূমির পরিবেশগত ভারসাম্য অটুট থাকবে।
সবার একটাই প্রত্যাশা—সুন্দরবন বাঁচুক, বাঘ বাঁচুক; প্রকৃতি ও মানুষ একসঙ্গে টিকে থাকুক।
