মূল খবরে ফিরে যান
এই প্রিভিউ আর চূড়ান্ত প্রিন্ট/PDF একই লেআউট ব্যবহার করে।
Saturday, 01 August 2026
অন্যান্য
banglabrief.com/
সংস্করণ
31 July 2026
অন্যান্য

৪ বছর ধরে নির্মাণ, ২ দিনেই ধসে পড়ল ৪ কোটি টাকার সড়ক

সাভার উপজেলার আশুলিয়ায় চার কোটি টাকা ব্যয়ে দীর্ঘ চার বছর ধরে নির্মিত একটি সড়ক উদ্বোধনের আগেই ধসে পড়েছে। নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার মাত্র দুই দিনের মাথায় নদীর পাড়ঘেঁষা সড়ক ও ব্রিজের সংযোগস্থল ধসে যাওয়ায় এলাকাজুড়ে তীব্র ক্ষোভ ও চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, টেকসই গাইডওয়াল ও কংক্রিট ব্লকের পরিবর্তে নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী এবং জোড়াতালির কাজ করায় কোটি টাকার এই প্রকল্পটি এখন পুরোপুরি ধসে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।

সরেজমিনে গিয়ে জানা গেছে, ধামসোনা নলাই মুকেন্দ্র হাউস থেকে কারিগরপাড়া ব্রিজ পর্যন্ত প্রায় এক কিলোমিটার সড়ক এইচবিবি (HBB) উন্নয়ন এবং তিনটি কালভার্ট ব্রিজ নির্মাণের প্রকল্পটি জাইকা (JICA) অর্থায়নে বাস্তবায়ন করা হয়। ২০২২-২৩ অর্থবছরে প্রায় ৪ কোটি টাকা প্রাক্কলিত ব্যয়ের এই প্রকল্পের দায়িত্ব পায় সালেহ এন্টারপ্রাইজ নামে একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। ২০২২ সালের ২ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন ঢাকা-১৯ আসনের সংসদ সদস্য ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী ডা. এনামুর রহমান কাজটির উদ্বোধন করেন।

সরেজমিনে দেখা যায়, সড়ক নির্মাণে বিভিন্ন স্থান থেকে সংগ্রহ করা পুরোনো ও নিম্নমানের ইট ব্যবহার করা হয়েছে। ঢালাইয়ে সিমেন্টের ব্যবহার ছিল অত্যন্ত কম। রাস্তার দুই পাশে স্থায়ী গাইডওয়াল নির্মাণের পরিবর্তে বাঁশের চাটাই ও কাঠের বেড়া ব্যবহার করা হয়েছে। কোথাও কোথাও প্লাস্টিকের বস্তায় মাটি-বালুর মিশ্রণ ভরে ভাঙন ঠেকানোর চেষ্টা করা হলেও তা ইতোমধ্যে ছিঁড়ে গিয়ে ধসে পড়েছে।

এছাড়া ব্রিজের উভয় পাশে মাটি ধরে রাখার জন্য যেখানে স্থায়ী কংক্রিটের বেষ্টনী থাকার কথা, সেখানে শুধু মাটি দিয়ে ভরাট করা হয়েছে। ফলে মাত্র দুই দিনের মধ্যেই সংযোগস্থল ধসে পড়ে। যেসব স্থানে কংক্রিট দেওয়া হয়েছে, সেগুলোও অত্যন্ত নিম্নমানের ও আঁকাবাঁকা। অনেক অংশ ভেঙে নিচে পড়ে রয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, ইটের ব্যবহার কমাতে বিভিন্ন স্থানে ফাঁকা রেখে তা মাটি দিয়ে ভরাট করা হয়েছে। নদীর পাশের প্রতিরক্ষা ব্লকেও সিমেন্টের পরিবর্তে বালি ও মাটি ব্যবহার করায় প্রথম বৃষ্টিতেই তা ধসে যায়।

স্থানীয় বাসিন্দা জহিরুল ইসলাম বলেন, ব্রিজের গোড়ায় বড় বড় কংক্রিট ব্লক দিয়ে ভাঙনরোধী কাজ করার কথা ছিল। কিন্তু সেখানে বাঁশ আর চিকন কাঠ দিয়ে দায়সারা কাজ করা হয়েছে। মাত্র দুই দিনেই সব নদীতে ধসে গেছে। ভারী যানবাহন চললে পুরো রাস্তা ভেঙে পড়তে পারত। আমরা বারবার অনিয়মের প্রতিবাদ করেছি, কিন্তু কেউ গুরুত্ব দেয়নি।

কসাইপাড়া এলাকার বাসিন্দা মিষ্টু বলেন, চার বছর ধরে আমরা এই রাস্তার জন্য দুর্ভোগ পোহাচ্ছি। ভেবেছিলাম ভালো একটি রাস্তা পাব। কিন্তু পুরোনো ভাঙা ইট, নামমাত্র সিমেন্ট আর মাটি দিয়ে জোড়াতালি দেওয়া হয়েছে। সরকারি কোটি কোটি টাকা লুটপাট করে আমাদের জীবন ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দেওয়া হয়েছে। আমরা দায়ীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এবং টেকসইভাবে নতুন করে রাস্তা নির্মাণের দাবি জানাই।

অভিযোগের বিষয়ে সালেহ এন্টারপ্রাইজের প্রতিনিধি সিরাজুল ইসলাম সুমন বলেন, আমি ক্যানসারে আক্রান্ত ছিলাম। ২০২২-২৩ সাল থেকে কাজটি শুরু করি। বিভিন্ন অসহযোগিতার কারণে কাজটি নির্ধারিত সময়ে শেষ করা সম্ভব হয়নি। এ ঘটনার পেছনে অনেক বড় কারণ রয়েছে। বিষয়টি নিয়ে আমি সামনাসামনি বিস্তারিত কথা বলতে চাই।

এ বিষয়ে উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) ফাইজুল ইসলাম বলেন, ২০২২-২৩ অর্থবছরে জাইকার অর্থায়নে প্রায় ৪ কোটি টাকা ব্যয়ে এই রাস্তা ও তিনটি ব্রিজের কাজ শুরু হয়। পরে সময় বাড়িয়ে কাজ চলমান রাখা হয়। নিয়ম অনুযায়ী ব্রিজের গোড়ায় ও ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে স্থায়ী প্রটেকশন ব্লক নির্মাণ করার কথা থাকলেও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কাজের মান নিয়ে আমরাও অসন্তুষ্ট। প্রকল্প পরিদর্শনে এসে সংশ্লিষ্ট ডিজিও তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।

তিনি আরও বলেন, সম্প্রতি ভারী বৃষ্টির মধ্যেও আমরা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছি এবং ঠিকাদারকে সব ত্রুটি দ্রুত সংশোধনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সরকারি মানদণ্ড অনুযায়ী টেকসই গাইডওয়াল ও প্রটেকশন ব্লকের কাজ সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত কোনো চূড়ান্ত বিল পরিশোধ করা হবে না। প্রয়োজন হলে আইনগত ব্যবস্থাও নেওয়া হবে।

এ বিষয়ে সাভার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন,কোটি টাকার ব্যয়ে একটি সড়ক নির্মাণ করা হয়েছে। কিন্তু কেন নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার করা হয়েছে, সেটি গুরুত্বসহকারে তদন্ত করে দেখা হবে। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে সরকারি বিধি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। কোনো ধরনের অনিয়ম বা গাফিলতি বরদাশত করা হবে না।

উদ্বোধনের আগেই কোটি টাকার এই প্রকল্পের অংশ ধসে পড়ার ঘটনায় পুরো এলাকায় ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, অনিয়মের সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত আইনের আওতায় এনে প্রকল্পটি পুনর্নির্মাণের মাধ্যমে জনদুর্ভোগের স্থায়ী সমাধান নিশ্চিত করতে হবে।