মূল খবরে ফিরে যান
যা দেখছেন, PDF-এও সেটাই থাকবে। প্রিন্ট ডায়ালগে “Save as PDF” বেছে নিন।
Sunday, 02 August 2026
অন্যান্য
banglabrief.com/
সংস্করণ
01 August 2026
অন্যান্য

গবেষণাপত্রে চুরি: এগিয়ে নর্থ সাউথ, ড্যাফোডিল ও ইউনাইটেড

আন্তর্জাতিক শিক্ষা ও গবেষণা জগতে বাংলাদেশের জন্য এক চরম অস্বস্তিকর চিত্র ফুটে উঠেছে। ২০১৯ থেকে ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দের জুন পর্যন্ত সময়ের মধ্যে অনিয়মের দায়ে বাংলাদেশি গবেষক ও শিক্ষকদের অন্তত ৩২৫টি গবেষণাপত্র প্রত্যাহার করেছে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক জার্নাল। জালিয়াতি, তথ্য চুরি, ভুয়া পর্যালোচনা ও নানাবিধ অসাধু উপায় অবলম্বনের কারণে এসব ব্যবস্থা নেয়া হয়।

তথ্যে দেখা যায়, ৩২৫টি গবেষণার মধ্যে ৪৪টিতে ড্যাফোডিল ইউনিভার্সিটি, ৪২টিতে নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি, ৩২টিতে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, ২১টিতে ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনির্ভাসিটি (ইউআইইউ) এবং ২০টিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের নাম রয়েছে।

অন্যদিকে ১১টি করে গবেষণায় নাম আছে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ও বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের। ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ (১০), নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (১০), বিজিসি ট্রাস্ট ইউনিভার্সিটি (১০), বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব বিজনেস অ্যান্ড টেকনোলজি (৭), গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (৬) গবেষকেরাও রয়েছেন এই তালিকায়।

নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিং (ইসিই) বিভাগের একজন অধ্যাপকের নাম মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান খান। তিনি নিজেকে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় গবেষক বলেও দাবি করেন।

অবশ্য কয়েকটি সুপরিচিত জার্নাল বা সাময়িকী মনিরুজ্জামানের ২৬টি গবেষণাপত্র প্রত্যাহার করেছে। এসব গবেষণার ছয়টিতে তিনি মূল লেখক এবং বাকিগুলোতে সহলেখক ছিলেন। জার্নালগুলো বলছে, ভুয়া বিশেষজ্ঞ মূল্যায়ন যোগ করা, তথ্যের অসংগতি, চৌর্যবৃত্তিসহ নানা অনিময়ের অভিযোগে গবেষণাপত্রগুলো প্রত্যাহার করেছে তারা।

নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে ২০২১ থেকে ২০২২ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত দেড় বছরের ব্যবধানে মনিরুজ্জামান ও তাঁর সহযোগী শিক্ষার্থীরা অন্তত ৮০টি গবেষণা প্রকাশ করেছিলেন। এত অল্প সময়ে কীভাবে এত গবেষণা প্রকাশ করা যায়, তা নিয়ে নিজের অনুষদে সন্দেহের মুখে পড়েছিলেন মনিরুজ্জামান।

যদিও এ ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ কোনো তদন্ত বা পদক্ষেপ নেয়নি। গবেষণা প্রকাশের ক্ষেত্রে লেখক কোন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত, সেটা উল্লেখ করতে হয়। নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত লেখকদের গবেষণা বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণা সাময়িকী থেকে একের পর এক প্রত্যাহার হয়েছে।

ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির (ডিআইইউ) সঙ্গে সম্পৃক্ত কয়েকজন গবেষকের অন্তত ৪৪টি গবেষণাপত্র প্রত্যাহার করা হয়েছে। সবচেয়ে বেশি প্রত্যাহার হওয়া ব্যক্তিদের একজন বিশ্ববিদ্যালয়টির ফার্মেসি বিভাগের প্রভাষক মমিনুর রহমান। তার সাতটি গবেষণাপত্র প্রত্যাহার হয়েছে। এর মধ্যে পাঁচটিতে তিনি মূল লেখক এবং দুটি গবেষণায় সহলেখক ছিলেন।

বিশ্বের অন্যতম বড় গবেষণা প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান স্প্রিঞ্জার ও এলসেভিয়ার তাদের তদন্তে উল্লেখ করেছে, গবেষণাগুলোয় নানা অনিয়ম খুঁজে পাওয়ায় সম্পাদকীয় বোর্ড গবেষণাগুলোর বৈজ্ঞানিক ফলাফলের ওপর আস্থা হারিয়েছে।

এদিকে বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি গবেষকদের বিভিন্ন আর্থিক সুবিধা দিয়ে থাকে। গবেষণার মানের ভিত্তিতে একজন গবেষক ২০ হাজার থেকে সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত প্রণোদনা পান। এ ছাড়া বিশেষ অবদানের জন্য অতিরিক্ত সুবিধা এবং প্রতিবছর অনুষদ ও বিভাগভিত্তিক ‘বেস্ট রিসার্চার অ্যাওয়ার্ড’ দেওয়া হয়।

যাঁদের গবেষণা প্রত্যাহার হয়েছে, তাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হলে প্রদত্ত অর্থ ফেরত নেওয়া হবে বলে উল্লেখ করেন ড্যাফোডিল ইউনিভার্সিটির গবেষণা বিভাগের পরিচালক মাহফুজা পারভীন।

গবেষণায় এমন নৈতিক অবক্ষয় ও অনিয়ম দেশের অ্যাকাডেমিক খাতের মৌলিক মানদণ্ড ও আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতাকে মারাত্মক ঝুঁকির মুখে ফেলেছে বলে মনে করছেন গবেষকেরা।

তারা বলেন, বিশ্বজুড়ে বৈজ্ঞানিক ও একাডেমিক অঙ্গনে যেকোনো দেশের গবেষকদের জন্যই গবেষণাপত্র নামীদামি কোনো জার্নাল বা সাময়িকীতে প্রকাশ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি ধাপ। এর মাধ্যমে গবেষক তার কাজের আনুষ্ঠানিক মেধাস্বত্ব ও একাডেমিক স্বীকৃতি লাভ করেন। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত জার্নালে গবেষণা প্রকাশিত হলে তা কেবল গবেষকের সম্মান ও মর্যাদাই বাড়ায় না, বরং শিক্ষকতা ও গবেষণার ক্ষেত্রে পদোন্নতিতেও বড় ভূমিকা রাখে।

তবে গবেষকদের মতে, কোনো দেশ থেকে বারবার গবেষণাপত্র প্রত্যাহার হতে থাকলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সে দেশের সার্বিক গবেষণা ও গবেষকদের গ্রহণযোগ্যতা মারাত্মক প্রশ্নের মুখে পড়ে। এর ফলে আন্তর্জাতিক ও সুপরিচিত জার্নালগুলোতে নতুন গবেষণা প্রকাশ করাও কঠিন হয়ে দাঁড়ায়।

গবেষকেরা বলছেন, বাংলাদেশে গবেষকেরা সাধারণত দেশীয় বিভিন্ন জার্নালে গবেষণা প্রকাশ করে নিজেদের পদোন্নতি ও প্রাতিষ্ঠানিক অন্যান্য সুবিধা নেন। বৈশ্বিকভাবে স্বীকৃত জার্নালে গবেষণাপত্র প্রকাশের সংখ্যা কম। তাতেও অনিয়ম, চুরি ইত্যাদি ধরা পড়ছে। কিন্তু গবেষণা প্রত্যাহার হলে জবাবদিহির ব্যবস্থা নেই।

বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক মামুন আহমেদ জানান, কোনো শিক্ষক বা গবেষকের বিরুদ্ধে জালিয়াতির অভিযোগ উঠলে তা তদন্ত ও শাস্তির প্রথম দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের। তবে বিশ্ববিদ্যালয় যদি ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হয় বা অভিযোগ এড়িয়ে যায়, সেক্ষেত্রে ইউজিসি নিজেই তদন্ত পরিচালনা করে শাস্তিমূলক পদক্ষেপ নেবে।