02 August 2026
আদর্শ জাতি গঠনে প্রাইভেট মাদ্রাসার ভূমিকা: ১৮ দফা দাবি উত্থাপন

"আদর্শ জাতি গঠনে প্রাইভেট মাদ্রাসার ভূমিকা, চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা" শীর্ষক জাতীয় সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়েছে। বাংলাদেশ প্রাইভেট মাদ্রাসা ওয়েলফেয়ার সোসাইটির আয়োজনে এই সেমিনারে আদর্শ জাতি গঠনে প্রাইভেট মাদ্রাসার ভূমিকা, চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয় এবং ১৮ দফা দাবির সুপারিশ করা হয়। গত শনিবার (১ আগস্ট) জাতীয় প্রেসক্লাবের জহুর হোসেন চৌধুরী হলে আয়োজিত এই সেমিনারে সংগঠনের পক্ষ থেকে সরকারের কাছে এসব সুপারিশ ও দাবি তুলে ধরা হয়।
সেমিনারে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক মুফতি মুহাম্মদ মুহিব্বুল্লাহিল বাকী আন-নদভী। অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্যে ১৮ দফা দাবি তুলে ধরেন সংগঠনের সিনিয়র সহ-সভাপতি মাওলানা জাফর আহমদ মজুমদার। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সংগঠনের উপদেষ্টা মাওলানা খালেদ সাইফুল্লাহ বকসী। এছাড়া আলোচনায় অংশ নেন হাফেজ কারী মাওলানা মো: আবুল হোসাইন, কারী শাইখ জহিরুল ইসলামসহ অন্যান্য শীর্ষ নেতৃত্ব।
বক্তারা বলেন, "বাংলাদেশি প্রাইভেট মাদ্রাসাগুলো যুগ যুগ ধরে নৈতিক চরিত্রগঠন, ধর্মীয় শিক্ষা বিস্তার ও মানবিক মূল্যবোধ তৈরিতে প্রশংসনীয় ভূমিকা পালন করছে। আন্তর্জাতিক হিফজুল কুরআন প্রতিযোগিতা ও গবেষণায় মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের সফলতা দেশের গৌরব।" সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন বিচ্ছিন্ন ঘটনা কিংবা এআই (AI) প্রযুক্তির মাধ্যমে তৈরি বিকৃত ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দিয়ে সমগ্র মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করার অপচেষ্টার বিরুদ্ধে বক্তারা তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তাঁরা বলেন, আইনের শাসন ও জবাবদিহিতার ঊর্ধ্বে কেউ নয়; কোনো প্রতিষ্ঠানে অপরাধের অভিযোগ উঠলে নিরপেক্ষ তদন্ত ও বিচার হওয়া উচিত। কিন্তু যাচাই-বাছাই ছাড়া কোনো একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনার দায় পুরো মাদ্রাসা ব্যবস্থার ওপর চাপানো ন্যায়সঙ্গত নয়।
সরকারের প্রতি বাংলাদেশ প্রাইভেট মাদ্রাসা ওয়েলফেয়ার সোসাইটির ১৮ দফা দাবীসমূহ:
১. প্রাইভেট মাদ্রাসা সমূহকে যাচাই-বাছাই পূর্বক "বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের" অধীনে নিবন্ধন প্রদান করতে হবে।
২. প্রাইভেট মাদ্রাসা সমূহকে দ্রুততম সময়ের মধ্যে EIIN নাম্বার প্রদান করতে হবে এবং EIIN নাম্বার প্রদানে অপ্রয়োজনীয় জটিলতা দূর করতে হবে।
৩. শর্ত সাপেক্ষে ভাড়া বাড়িতে প্রাইভেট মাদ্রাসা পাঠদানের অনুমোদন ও একাডেমিক স্বীকৃতি প্রদান করতে হবে।
৪. শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো স্ব স্ব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নামে শিক্ষার্থীদের সনদ প্রদানের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
৫. প্রাইভেট মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের সরকারী ও বেসরকারী উপবৃত্তির ব্যবস্থা করতে হবে।
৬. আলিয়া, ক্বওমী, নূরানী, হিফযসহ অন্যান্য প্রাইভেট মাদ্রাসার জন্য একটি স্বচ্ছ ও অভিন্ন নীতিমালা প্রণয়ন ও প্রকাশ করতে হবে।
৭. স্থানীয় শিক্ষা অফিসারের মাধ্যমে বিভিন্ন সহযোগিতা ও সহজে বই প্রাপ্তির ব্যবস্থা করতে হবে।
৮. নৈতিকতা, শিশু মনোবিজ্ঞান, আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থাপনা, আইনি সচেতনতা ও পেশাগত দক্ষতা বিষয়ে যথাযথ কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে প্রাইভেট মাদ্রাসার শিক্ষকদের "শিক্ষক প্রশিক্ষণ" প্রদান করতে হবে।
৯. প্রাইভেট মাদ্রাসার প্রতিনিধিদের বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডে মূল্যায়ন করতে হবে।
১০. শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে তথ্য প্রযুক্তি, কম্পিউটার ও শিক্ষা উপকরণের সহযোগিতা প্রদান করতে হবে।
১১. প্রাইভেট মাদ্রাসা সমূহকে বিভিন্ন সংস্থা ও রাজনৈতিক হয়রানির শিকার হতে হয়, তা দূরিকরণে কার্যকর ব্যবস্থা করতে হবে।
১২. আলিয়া, নূরানী, হিফ্য ও অন্যান্য প্রাইভেট মাদ্রাসা সমূহের জন্য সমন্বিত উন্নয়ন নীতিমালা প্রদান করতে হবে।
১৩. কোন ব্যক্তির অপরাধের সুষ্ঠু ও ন্যায়সংগত তদন্ত ব্যতিত, দায় পুরো প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষার্থীদের উপর চাপিয়ে দিয়ে, প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষার্থীদের ক্ষতিগ্রস্ত করা যাবে না।
১৪. ব্যক্তির অপরাধের সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে, আইনগত প্রক্রিয়া অবলম্বন করে নিরপেক্ষ ও ন্যায় বিচার নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত, প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কোন ধরণের প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা যাবে না।
১৫. মিথ্যে অভিযোগ, অপপ্রচার বা হয়রানির শিকার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্যে আইনগত সহায়তার কার্যকর ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
১৭. শিক্ষার মানোন্নয়ন, কারিকুলাম যুগোপযোগী করণ, প্রযুক্তির ব্যবহার এবং দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির জন্যে গবেষণা ও উন্নয়ন মূলক কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে।
১৮. সরকারী ও বেসরকারী সকল অংশীজনের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রাইভেট মাদ্রাসাগুলোকে জাতীয় শিক্ষা উন্নয়নের অংশীদার হিসেবে মূল্যায়ন করতে হবে।
সংগঠনের পক্ষ থেকে গণমাধ্যমের প্রতি বেশ কয়েকটি আহ্বান জানানো হয়েছে, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল:
১. যেকোনো সংবাদ প্রকাশের আগে তথ্য ও প্রমাণ যথাযথভাবে যাচাই করুন।
২. অভিযোগের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বক্তব্য প্রকাশের সুযোগ দিন।
৩. বিচ্ছিন্ন ঘটনাকে পুরো মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থার প্রতিচ্ছবি হিসেবে উপস্থাপন করবেন না।
৪. তদন্ত শেষ হওয়ার আগে কাউকে অপরাধী হিসেবে উপস্থাপন করা থেকে বিরত থাকুন।
৫. নির্দোষ প্রমাণিত হলে সেই সংবাদও সমান গুরুত্ব দিয়ে প্রকাশ করুন।
৬. গুজব, অপপ্রচার ও বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রচার থেকে বিরত থাকুন।
৭. বস্তুনিষ্ঠ, দায়িত্বশীল ও মানবিক সাংবাদিকতার মাধ্যমে সামাজিক সম্প্রীতি বজায় রাখতে ভূমিকা রাখুন।
আমরা বিশ্বাস করি, একটি দায়িত্বশীল গণমাধ্যম যেমন অন্যায় উন্মোচন করে, তেমনি সত্য, ন্যায় ও সামাজিক ভারসাম্যও রক্ষা করে।
