02 August 2026
‘বিবেকের তাড়নায় অফিস থেকে শেখ হাসিনার ছবি সরিয়েছিলাম’

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা, গ্রেফতার, নির্যাতন ও হত্যার ঘটনার প্রতিবাদে নিজের কার্যালয় থেকে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতিকৃতি সরিয়ে ফেলেছিলেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক শামীমা সুলতানা। তার ভাষ্য, এটি ছিল সম্পূর্ণ নৈতিক দায়িত্ববোধ ও ব্যক্তিগত বিবেকের তাড়না থেকে নেওয়া একটি প্রতীকী প্রতিবাদের সিদ্ধান্ত।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বার্ষিকী উপলক্ষে বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থাকে (বাসস) দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি এ কথা জানান।
অধ্যাপক শামীমা সুলতানা বলেন, ২০২৪ সালের ১ আগস্ট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার অফিসকক্ষে তোলা একটি ছবি ছড়িয়ে পড়ে, যেখানে তার চেয়ারের পেছনের দেয়ালে শেখ হাসিনার প্রতিকৃতি অনুপস্থিত ছিল। বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হলেও তিনি জানান, শিক্ষার্থীদের ওপর সহিংসতা, গুলি, গ্রেফতার ও প্রাণহানির ঘটনায় গভীরভাবে মর্মাহত হয়ে তিনি ছবিটি সরিয়ে ফেলেছিলেন।
তার ভাষায়, "এটি ছিল আমার নৈতিকবোধ থেকে ব্যক্তিগত প্রতিবাদের একটি বহিঃপ্রকাশ। আমার মনে হয়েছিল, এই ছবিটি আর আমার অফিসের দেয়ালে ঝুলে থাকার নৈতিক অধিকার রাখে না।"
তিনি বলেন, এই পদক্ষেপের পেছনে কোনো রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ছিল না। বরং ছাত্রজীবন থেকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার যে মূল্যবোধ তিনি ধারণ করে এসেছেন, তারই ধারাবাহিকতায় তিনি আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত হন।
শামীমা সুলতানা জানান, এর আগেও তিনি ২০১৮ সালের কোটা সংস্কার আন্দোলন, নিরাপদ সড়ক আন্দোলন এবং জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানিয়েছিলেন।
তিনি বলেন, ২০২৪ সালের ১৫ জুলাই রাতে উপাচার্যের বাসভবনের সামনে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার ঘটনাই তাকে সক্রিয়ভাবে প্রতিবাদে নামতে উদ্বুদ্ধ করে। এরপর তিনি অন্যান্য শিক্ষকদের সঙ্গে প্রতীকী কর্মসূচিতে অংশ নেন এবং আন্দোলন শেষ না হওয়া পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের পাশে রাজপথে অবস্থান করেন।
সংকটময় সময়ে শিক্ষার্থীদের সহযোগিতায় নিজের কার্যালয় ও বিভাগের সভাপতির কক্ষ উন্মুক্ত রাখার কথাও জানান তিনি। পাশাপাশি দেশ-বিদেশে যোগাযোগ বজায় রাখতে আন্দোলনকারীদের জন্য অফিসের ওয়াই-ফাই ব্যবহারের সুযোগ করে দিয়েছিলেন বলেও উল্লেখ করেন।
অধ্যাপক সুলতানা বলেন, রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদের নিহত হওয়ার ঘটনা এবং পরবর্তী সময়ে বেসামরিক মানুষের মৃত্যুর খবর তার দৃষ্টিভঙ্গিতে বড় পরিবর্তন আনে। তার মতে, যে সরকার নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয় এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা নাগরিকদের বিরুদ্ধেই ব্যবহার করে, সেই সরকার নৈতিক বৈধতা হারায়। সেই উপলব্ধি থেকেই তিনি প্রতিকৃতি সরানোর সিদ্ধান্ত নেন।
সিদ্ধান্তটি নেওয়ার সময় ভয় কাজ করেনি কি না— এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, তরুণদের জীবন বিসর্জনের দৃশ্য দেখার পর ব্যক্তিগত নিরাপত্তার চেয়ে দায়িত্ববোধই তার কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল।
তিনি আরও জানান, ছবিটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর দেশজুড়ে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। এ ঘটনায় তাকে গালিগালাজ, হুমকি, ব্যক্তিগত আক্রমণ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরে হেয় করার নানা চেষ্টা করা হয়েছিল।
অধ্যাপক শামীমা সুলতানার দাবি, ঘটনার দিনই তার বিরুদ্ধে লিফলেট বিতরণ করা হয়। পরে বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট তার বিরুদ্ধে কারণ দর্শানোর (শোকজ) নোটিশ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেও তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো নোটিশ পাননি। পরবর্তীতে ৫ আগস্টের পর বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনে পরিবর্তন এলে নতুন উপাচার্য সেই সিদ্ধান্ত বাতিল করেন।
পুরো ঘটনার মূল্যায়নে অধ্যাপক শামীমা সুলতানা বলেন, নিজের সিদ্ধান্তের জন্য তিনি কখনো অনুতপ্ত নন। তার ভাষায়, "আমি এটিকে ব্যক্তিগত কোনো অর্জন মনে করি না। এটি ছিল অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতীকী প্রতিবাদ। একজন শিক্ষক হিসেবে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোই আমার দায়িত্ব ছিল।"
