03 August 2026
প্রাণহানির পর ঘুম ভাঙল প্রশাসনের

একজন পর্যটকের মৃত্যুর পরই যেন নড়েচড়ে বসল প্রশাসন। দীর্ঘদিন ধরে অনুমোদন ছাড়াই প্যারাসেইলিং পরিচালনার অভিযোগ থাকা প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে এতদিন কার্যকর ব্যবস্থা না নিলেও, পর্যটক অক্ষর সৌভিক রায়ের মৃত্যুর পর একদিনের ব্যবধানে দায়ের হয়েছে মামলা, উচ্ছেদ করা হয়েছে প্রতিষ্ঠানের স্থাপনা এবং বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে সমুদ্র সৈকতের সব ধরনের প্যারাসেইলিং কার্যক্রম।
এদিকে নিহতের স্বজনদের মতে, এই পদক্ষেপ যদি আগে নেওয়া হতো, তাহলে কি সৌভিকের প্রাণ বাঁচানো যেত।
ঘটনার পর নিহতের ছোট বোন মেধা মৃত্রিকা রায় বাদী হয়ে রবিবার বিকেলে কক্সবাজার সদর মডেল থানায় 'ফ্লাই এয়ার সি স্পোর্টস প্যারাসেইলিং' প্রতিষ্ঠানের মালিক ফরিদ আহমদসহ অজ্ঞাত আরও চারজনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন।
কক্সবাজার সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শেখ মোহাম্মদ আলী জানান, স্বজনদের আবেদনের পর সৌভিকের মরদেহ ময়নাতদন্ত ছাড়াই তাদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। ঘটনার তদন্ত শেষে দায়ীদের বিরুদ্ধে আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করা হবে।
নিহতের পরিবারের অভিযোগ, যে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে, সেটি দীর্ঘদিন ধরেই কোনো বৈধ অনুমোদন ছাড়াই প্যারাসেইলিং পরিচালনা করে আসছিল। অথচ প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো বিষয়টি জানার পরও কার্যকর ব্যবস্থা নেয়নি। রবিবার সন্ধ্যায় কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতালের মর্গ থেকে মরদেহ নিয়ে খুলনার উদ্দেশে রওনা হওয়ার আগে নিহতের স্বজনরা ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
নিহতের ছোট বোন মেধা মৃত্রিকা রায়ের স্বামী আলী মোর্শেদ সিফাত বলেন, প্রতিষ্ঠানটির কোনো বৈধ অনুমোদন ছিল না। প্রশাসন এটি জানত। নিরাপত্তা ব্যবস্থার ঘাটতির বিষয়েও তারা অবগত ছিল। তারপরও প্রতিষ্ঠানটি পর্যটকদের নিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ কার্যক্রম চালিয়ে গেছে। এই অবহেলা ও নজরদারির অভাবই সৌভিকের মৃত্যুর জন্য দায়ী।
তার ভাষ্য, এটি শুধু একটি দুর্ঘটনা নয়, কক্সবাজারের পর্যটন ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা ও জবাবদিহির অভাবের নির্মম উদাহরণ।
সৌভিকের মৃত্যুর পর রোববার সন্ধ্যায় জেলা প্রশাসনের পর্যটন সেলের দায়িত্বপ্রাপ্ত নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে দরিয়ানগরে অভিযান চালানো হয়। অভিযানে 'ফ্লাই এয়ার সি স্পোর্টস প্যারাসেইলিং' প্রতিষ্ঠানের স্থাপনা উচ্ছেদ করা হয় এবং তাদের ব্যবহৃত সরঞ্জাম জব্দ করা হয়।
জেলা প্রশাসনের পর্যটন সেলের ম্যাজিস্ট্রেট মো. মাহমুদুর রহমান সায়েম বলেন, পর্যটকের মৃত্যুর ঘটনার পর অনুমোদনহীন প্রতিষ্ঠানটির সব কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত সব ধরনের প্যারাসেইলিং কার্যক্রমও বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।
এরআগে গত শনিবার দুপুরে কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতের দরিয়ানগর এলাকায় প্যারাসেইলিং করার সময় আকাশে থাকা অবস্থায় ছিটকে সাগরে পড়ে যান খুলনার বাসিন্দা পর্যটক অক্ষর সৌভিক রায়। পরে তাকে উদ্ধার করে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
ঘটনার পর থেকেই প্যারাসেইলিংয়ের নিরাপত্তা ব্যবস্থা, প্রশিক্ষিত জনবল, যন্ত্রপাতির মান এবং প্রশাসনিক তদারকি নিয়ে ব্যাপক প্রশ্ন উঠতে শুরু করে।
পরিবেশ কর্মী ও সংশ্লিষ্টদরা বলছেন, যদি প্রতিষ্ঠানটি সত্যিই অনুমোদনহীন হয়ে থাকে, তবে এতদিন কীভাবে প্রকাশ্যে ব্যবসা পরিচালনা করছিল? সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর নজরদারি কোথায় ছিল? দুর্ঘটনার আগে কেন ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি?
তাদের মতে, সৌভিকের মৃত্যু এখন শুধু একটি মামলার বিষয় নয়, বরং কক্সবাজারের পর্যটন নিরাপত্তা, প্রশাসনিক তদারকি এবং জবাবদিহির পুরো ব্যবস্থাকেই নতুন করে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। এখন দেখার বিষয়, তদন্তে প্রকৃত দায়ীদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা হয় কি না, নাকি আর দশটি ঘটনার মতো এই ঘটনাও সময়ের সঙ্গে হারিয়ে যায়।
পরিবেশকর্মী করিম উল্লাহ বলেন, কেবল প্যারাসেলিং কার্যক্রম বন্ধ করে প্রশাসন দায় এড়াতে পারে না। দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের পর্যটন সেলের দায়িত্বরত এনডিসি ও পর্যটন ম্যাজিস্ট্রেটের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তিনি। তার ভাষ্য, একজন পর্যটকের মৃত্যুর ঘটনায় জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের পর্যটন সেল কোনোভাবেই দায় এড়াতে পারে না।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) কক্সবাজার শাখার সাধারণ সম্পাদক এইচ এম নজরুল ইসলাম বলেন, এই ঘটনার দায় জেলা প্রশাসনকেই নিতে হবে। তার অভিযোগ, প্রতিবছর জেলা প্রশাসন প্যারাসেলিং কার্যক্রম থেকে কোটি কোটি টাকা রাজস্ব আদায় করলেও নিরাপত্তা ও তদারকিতে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হয়েছে।
