08 August 2026
বদলি হলেও ফিরে আসেন ঘাটাইলেই, পিআইও এনামুলকে ঘিরে নানা প্রশ্ন

টাঙ্গাইলের ঘাটাইল উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) এনামুল হকের দীর্ঘদিন একই উপজেলায় দায়িত্ব পালন এবং তাঁকে ঘিরে ওঠা বিভিন্ন অভিযোগ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬ সালের ১৫ নভেম্বর তিনি ঘাটাইল উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা হিসেবে যোগ দেন এবং এখনো সেখানে দায়িত্ব পালন করছেন। এর আগে ২০১১ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্তও তিনি ঘাটাইলে কর্মরত ছিলেন। মাঝের সময় বাদ দিলে একই উপজেলায় তাঁর মোট কর্মকাল প্রায় ১৩ বছর।
দীর্ঘ এই কর্মজীবনে এনামুল হকের বিরুদ্ধে সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পে অনিয়ম, প্রকল্প বাস্তবায়ন না করে বরাদ্দ ব্যবহারের অভিযোগ, কর্মসৃজন প্রকল্পে অনিয়ম এবং আয়ের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ বিভিন্ন সময়ে উঠেছে। এসব নিয়ে জাতীয় ও স্থানীয় গণমাধ্যমেও প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। তবে অভিযোগগুলোর সবকটি কোনো আদালত বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে প্রমাণিত হয়েছে—এমন তথ্য পাওয়া যায়নি। বিভিন্ন সময়ে কিছু অভিযোগ অস্বীকারও করেছেন এনামুল হক।
প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০১১ সালের আগস্টে কালিহাতী থেকে বদলি হয়ে ঘাটাইলে যোগ দেন এনামুল হক। ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বরে তাঁকে গোপালপুরে বদলি করা হয়। পরবর্তী সময়ে বগুড়ায় বদলির নির্দেশ হলেও তা স্থগিত হয়। ২০১৬ সালের নভেম্বরে তিনি আবার ঘাটাইলে যোগ দেন। এরপর থেকে টানা প্রায় এক দশক ধরে তিনি সেখানে দায়িত্ব পালন করছেন।
ঘাটাইল উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার সরকারি ওয়েবপোর্টালেও এনামুল হককে বর্তমান পিআইও হিসেবে দেখানো হয়েছে এবং তাঁর যোগদানের তারিখ উল্লেখ রয়েছে ১৫ নভেম্বর ২০১৬।
এনামুল হকের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলোর একটি টিআর, কাবিখা, কাবিটা ও কর্মসৃজন কর্মসূচির বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়ন ঘিরে। বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হয়েছে, কিছু প্রকল্পে বাস্তবে কাজ না করে কাগজে-কলমে কাজ দেখানো, নামসর্বস্ব প্রকল্পে বরাদ্দ দেওয়া এবং একই স্থানে একাধিক প্রকল্প দেখানোর ঘটনা ঘটেছে।
২০১৯ সালে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে ঘাটাইলের কাবিখা প্রকল্পে ২৩৯ দশমিক ৮৫৩ মেট্রিক টন খাদ্যশস্য বরাদ্দের তথ্য উল্লেখ করে বিভিন্ন প্রকল্পে কাজ না করেই সরকারি বরাদ্দ আত্মসাতের অভিযোগ তোলা হয়। সেখানে অন্তত ৪০ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগের কথা বলা হয়েছিল। তবে ওই সময় এনামুল হক অভিযোগ অস্বীকার করে দাবি করেছিলেন, প্রকল্পগুলোর কাজ হয়েছে।
২০২৫ সালে প্রকাশিত আরেকটি প্রতিবেদনে কাবিখার বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়ন নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ করা হয়। নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠান ও অস্তিত্ব নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে—এমন প্রকল্পের বিপরীতে সরকারি বরাদ্দ ব্যবহারের অভিযোগও সেখানে উঠে আসে।
কর্মসৃজন কর্মসূচি নিয়েও তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রকাশিত হয়েছে। ২০২৪ সালের একটি প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হয়, কিছু শ্রমিককে কাজে না লাগিয়েও তাঁদের নামে অর্থ উত্তোলন করা হয়েছে এবং শ্রমিকদের মোবাইল আর্থিক সেবার হিসাব প্রকল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নিয়ন্ত্রণে ছিল। ওই প্রতিবেদনে তৎকালীন উপজেলা চেয়ারম্যানসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্যও প্রকাশ করা হয়েছিল। এনামুল হকের বক্তব্যও নেওয়া হয়; তবে নির্দিষ্ট কিছু অভিযোগের বিষয়ে তিনি মন্তব্য করতে রাজি হননি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
২০২৫ সালে প্রকাশিত একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে আরও দাবি করা হয়, এর আগে বিভিন্ন অভিযোগের পর প্রশাসনিক পর্যায়ে তদন্ত হয়েছিল এবং অনিয়মের কারণে সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে সরকারি কোষাগারে ১ কোটি ২৮ লাখ ৬৯ হাজার ৪০০ টাকা ফেরত নেওয়া হয়। তবে অর্থ ফেরতের সঙ্গে কার কী দায় নির্ধারণ হয়েছিল এবং এনামুল হকের ব্যক্তিগত দায় কতটুকু ছিল, তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট তদন্ত প্রতিবেদন ও সরকারি নথি যাচাই করা প্রয়োজন।
এনামুল হকের সম্পদ নিয়েও বিভিন্ন সময়ে প্রশ্ন উঠেছে। ২০২৫ সালের একটি প্রতিবেদনে ঘাটাইলের প্রধান সড়কে খাদ্যগুদামের বিপরীতে দোকানঘরসহ জমি কেনার বিষয়টি তুলে ধরে তাঁর আয়ের সঙ্গে সম্পদের সামঞ্জস্য নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়।
তবে ওই সম্পত্তির বিষয়ে এনামুল হকেরও ব্যাখ্যা রয়েছে। প্রকাশিত প্রতিবেদনে তিনি দাবি করেন, সম্পত্তিটির অর্থের সঙ্গে অন্য একটি লেনদেনের সম্পর্ক রয়েছে এবং দোকানের ভাড়া থেকেও তিনি অর্থ পাচ্ছেন। ফলে যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুসন্ধান ছাড়া সম্পত্তিটিকে অবৈধ বা জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ হিসেবে চিহ্নিত করার সুযোগ নেই।
ঘাটাইলের বিভিন্ন এলাকায় পাহাড়ি লাল মাটি কাটা ও বিক্রির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের সঙ্গে এনামুল হকের যোগাযোগ বা প্রভাব থাকার অভিযোগও স্থানীয় পর্যায়ে রয়েছে। স্থানীয় কয়েকটি সূত্রের দাবি, মাটি কাটার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের একটি অংশের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতা রয়েছে। তবে এ অভিযোগের পক্ষে সুনির্দিষ্ট সরকারি তদন্ত প্রতিবেদন বা আদালতের সিদ্ধান্ত পাওয়া যায়নি।
একইভাবে উপজেলার অন্যান্য সরকারি দপ্তরের কার্যক্রমে তাঁর প্রভাব থাকার অভিযোগও স্থানীয় পর্যায়ে রয়েছে। কৃষি অফিস, খাদ্যগুদাম ও সাব-রেজিস্ট্রি অফিসকে ঘিরে কথিত অনিয়মের সঙ্গে তাঁর নাম জড়িয়ে বিভিন্ন অভিযোগ করা হলেও স্বাধীনভাবে যাচাই ছাড়া এসব অভিযোগকে প্রতিষ্ঠিত সত্য হিসেবে বিবেচনা করা যায় না।
এত অভিযোগের পাশাপাশি একটি প্রশ্ন সামনে আসছে—একই উপজেলায় একজন কর্মকর্তার এত দীর্ঘ সময় দায়িত্ব পালনের কারণ কী?
২০১১ থেকে ২০১৪ সাল এবং পরে ২০১৬ সাল থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত ঘাটাইলে তাঁর দায়িত্ব পালনের তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। দীর্ঘদিন একই কর্মস্থলে দায়িত্ব পালনের কারণে স্থানীয় পর্যায়ে ঠিকাদার, জনপ্রতিনিধি ও প্রকল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে স্বার্থের সম্পর্ক তৈরির ঝুঁকি আছে কি না, সেই প্রশ্নও তুলছেন স্থানীয়দের কেউ কেউ।
তবে কোনো কর্মকর্তাকে বদলি করা বা একই কর্মস্থলে বহাল রাখা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত। ফলে এনামুল হকের দীর্ঘ কর্মকাল কোনো বিধি লঙ্ঘন করেছে কি না, সেটি সংশ্লিষ্ট বিধিমালা ও কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত পর্যালোচনা করেই নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
এনামুল হকের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত এবং প্রকল্পভিত্তিক বরাদ্দ, মাস্টাররোল, বিল-ভাউচার, বাস্তবায়নের নথি, পরিদর্শন প্রতিবেদন ও সংশ্লিষ্ট আর্থিক লেনদেন যাচাইয়ের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়দের একটি অংশ।
সম্পাদকের নোট: প্রতিবেদনে উল্লিখিত অভিযোগগুলোর বিষয়ে এনামুল হকের হালনাগাদ ও বিস্তারিত বক্তব্য পাওয়া গেলে তা যথাযথ গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশ করা হবে।
