11 August 2026
অনুমোদন ছাড়াই "কাউ বয় ফুডস"সে চলছে শিশু খাদ্য উৎপাদন-সাংবাদিক প্রবেশে বাঁধা

ঢাকার সাভারের আশুলিয়ার কাঠগড়া উত্তরপাড়া এলাকায় ‘কাউ বয় ফুডস কোম্পানি লিমিটেড’ নামে একটি প্রতিষ্ঠানে প্রয়োজনীয় অনুমোদন ও কাগজপত্র ছাড়াই শিশু খাদ্য উৎপাদন এবং অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে কার্যক্রম পরিচালনার অভিযোগ উঠেছে।
একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটিতে শিশু শ্রমিক দিয়ে কাজ করানোরও অভিযোগ পাওয়া গেছে। এসব অভিযোগের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ ও কারখানার পরিবেশ সরেজমিনে দেখতে গেলে সাংবাদিকদের প্রবেশে বাধা দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
সাংবাদিকদের কারখানায় প্রবেশে বাধা দেওয়ার সময় প্রতিষ্ঠানের কান্ট্রি রিপ্রেজেন্টেটিভ আরিফুল ইসলাম সোহাগ জানান, আশুলিয়া প্রেসক্লাবের সদস্য সচিব ও কথিত সাংবাদিক সোহেল রানার সঙ্গে যোগাযোগ করার পর কারখানায় প্রবেশের সুযোগ দেওয়া হবে।
সাংবাদিকদের সঙ্গে কথোপকথনের সময় আরিফুল ইসলাম সোহাগ বলেন, এর আগে সোহেল রানা ওই প্রতিষ্ঠানে এসেছিলেন। তার সঙ্গে যোগাযোগ করার পরই কারখানায় প্রবেশের সুযোগ পাওয়া যাবে।
এ ঘটনায় প্রশ্ন উঠেছে, একটি বেসরকারি খাদ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানে সাংবাদিকদের তথ্য সংগ্রহ ও সরেজমিনে পরিদর্শনের বিষয়টি কেন অন্য একজন পরিচয়ধারী কথিত সাংবাদিকের অনুমতির ওপর নির্ভর করবে। একই সঙ্গে সোহেল রানা নিজেকে আশুলিয়া প্রেসক্লাবের সদস্য সচিব হিসেবে পরিচয় দিলেও পরে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, তিনি আশুলিয়া প্রেসক্লাবের সদস্য নন বলে সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে জানা গেছে।
স্থানীয় কয়েকজনের অভিযোগ, সোহেল রানা প্রতিষ্ঠানটির কর্তৃপক্ষকে বলে গেছেন তার সঙ্গে যোগাযোগ ছাড়া অন্য কোনো সাংবাদিক যেন কারখানায় না আসেন। তবে এ অভিযোগের বিষয়ে সোহেল রানার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
এদিকে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে শিশু খাদ্য উৎপাদনের বৈধতা, প্রয়োজনীয় অনুমোদন ও কাগজপত্র, উৎপাদন পরিবেশ এবং শ্রমিকদের বয়সসংক্রান্ত বিষয়ে অভিযোগ উঠলেও এসব অভিযোগের বিষয়ে প্রতিষ্ঠানটির মালিকপক্ষের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে এ ঘটনায় শুধু কান্ট্রি রিপ্রেজেন্টেটিভ আরিফুল ইসলাম সোহাগের বক্তব্য পাওয়া গেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ‘CowBoy Foods Co., Ltd.’-এ কান্ট্রি রিপ্রেজেন্টেটিভ হিসেবে আরিফুল ইসলাম সোহাগ দায়িত্ব পালন করছেন। তবে প্রতিষ্ঠানটির শিশু খাদ্য উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় সরকারি অনুমোদন, লাইসেন্স ও সংশ্লিষ্ট সনদ রয়েছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘বস ভালো বলতে পারবেন। তিনি অফিসে আসলে আপনাদের জানানো হবে।’
পরে এ বিষয়ে জানতে আরিফুল ইসলাম সোহাগের সঙ্গে একাধিকবার ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।
সরেজমিনে ধারণ করা ভিডিওচিত্রে প্রতিষ্ঠানটির নাম-সংবলিত সাইনবোর্ড ও কারখানার প্রবেশপথ দেখা যায়। একই ভিডিওতে সাংবাদিকের সঙ্গে আরিফুল ইসলাম সোহাগের কথোপকথনও রয়েছে, যেখানে তিনি সোহেল রানার সঙ্গে যোগাযোগের বিষয়টি উল্লেখ করেন।
অন্যদিকে স্থানীয় কয়েকজন দাবি করেন, সোহেল রানা কিছুদিন আগেও আশুলিয়ার জামগড়া ও নরসিংপুর এলাকায় প্রাইভেটকার চালানোর প্রশিক্ষক হিসেবে কাজ করতেন। বর্তমানে তিনি আশুলিয়ার নরসিংহপুর এলাকায় থেকে সাংবাদিক পরিচয়ে বিভিন্ন স্থানে নানা অপকর্ম চালিয়ে যাচ্ছেন বলেও অভিযোগ করেন তারা।
শিশু খাদ্য উৎপাদনের মতো সংবেদনশীল বিষয়ে প্রতিষ্ঠানের বৈধ অনুমোদন, উৎপাদন পরিবেশ, খাদ্য নিরাপত্তা এবং শ্রমিকদের বয়সসংক্রান্ত বিষয়গুলো যথাযথভাবে যাচাই করা জরুরি বলে মনে করছেন স্থানীয়রা। অভিযোগগুলোর সত্যতা তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।
এ বিষয়ে আশুলিয়া ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসনিক কর্মকর্তা শ্যাম সুন্দর মণ্ডল বলেন, ‘কাউ বয় লিমিটেড কোম্পানি’ নামে কোনো ট্রেড লাইসেন্স ইস্যু করা হয়নি।
পরে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের কর্মকর্তা সাহাজুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ইউনিয়ন পরিষদের ট্রেড লাইসেন্স ছাড়া কোনো ফায়ার লাইসেন্সের ছাড়পত্র দেওয়া হয় না।
এরপর পরিবেশ অধিদপ্তরের ঢাকা জেলার সহকারী পরিচালক মো. নাজমুল হোসেনের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘সম্ভবত কাউ বয় নামে কোনো পরিবেশ ছাড়পত্র দেওয়া হয়নি।’
এ বিষয়ে সাভার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন, “এ খবর আমরা পেয়েছি। তদন্ত সাপেক্ষে সত্যতা পেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
স্থানীয়দের দাবি, শিশু খাদ্য উৎপাদনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হওয়ায় প্রতিষ্ঠানটির বৈধতা, পরিবেশ ছাড়পত্র, ট্রেড লাইসেন্স, অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা, খাদ্য উৎপাদনের অনুমোদন এবং শ্রমিকদের বয়সসহ সংশ্লিষ্ট সব নথিপত্র প্রশাসনের পক্ষ থেকে দ্রুত যাচাই করা প্রয়োজন। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইনে ব্যবস্থা নেওয়ারও দাবি জানান তারা।
