মূল খবরে ফিরে যান
যা দেখছেন, PDF-এও সেটাই থাকবে। প্রিন্ট ডায়ালগে “Save as PDF” বেছে নিন।
Tuesday, 11 August 2026
অন্যান্য
banglabrief.com/
সংস্করণ
11 August 2026
অন্যান্য

৩৬ বছর পর বই-খাতায় ফেরা, ৫৪ বছর বয়সে এসএসসি পাস আকবরের 

অষ্টম শ্রেণিতে থেমে গিয়েছিল পড়াশোনা। এরপর কেটে গেছে ৩৬ বছর। এই দীর্ঘ সময়ে বিয়ে, সংসার, সন্তানদের ভবিষ্যৎ গড়ার দায়িত্ব সবই সামলেছেন। নিজের পড়াশোনার স্বপ্নটা পড়ে ছিল অন্তরালে। তবে স্বপ্নটি কখনো হারিয়ে যায়নি।

সন্তানদের একজন এখন চিকিৎসক, অন্যজন নার্স। সন্তানদের প্রতিষ্ঠিত করার পর এবার নিজের অপূর্ণ স্বপ্ন পূরণ করেছেন বাবা। ৫৪ বছর বয়সে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে জিপিএ ৪.৩৫ পেয়েছেন নাটোরের বাগাতিপাড়ার আলী আকবর।

আলী আকবর রাজশাহীর নওহাটা সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি উচ্চবিদ্যালয়ের কারিগরি শাখার বিল্ডিং মেইনটেন্যান্স ট্রেড থেকে এবারের এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেন। তাঁর এই সাফল্যে পরিবারের সদস্যদের পাশাপাশি আত্মীয়স্বজন ও প্রতিবেশীরাও আনন্দিত।

পেশায় একটি বেসরকারি হাসপাতালের কর্মী আলী আকবরের বাড়ি নাটোরের বাগাতিপাড়া পৌর সদরে। অষ্টম শ্রেণিতেই থেমে যায় পড়াশোনা ছয় ভাই ও পাঁচ বোনের মধ্যে দ্বিতীয় আলী আকবর ছোটবেলায় গ্রামের একটি মাদ্রাসায় পড়াশোনা শুরু করেন। কিন্তু পরিবারের আর্থিক সংকটের কারণে ১৯৮৩ সালে অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার সময় তাঁর লেখাপড়া বন্ধ হয়ে যায়।

পড়াশোনা ছেড়ে বাবাকে সহযোগিতা করতে ক্ষুদ্র ব্যবসায় যুক্ত হন তিনি। ১৯৯০ সালে বিয়ে করেন। পরে সংসারে আসে এক ছেলে ও এক মেয়ে। তখন নিজের স্বপ্নের চেয়ে সন্তানদের ভবিষ্যৎই হয়ে ওঠে তাঁর সবচেয়ে বড় চিন্তা।

একসময় স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে রাজশাহীতে চলে আসেন আলী আকবর। তিনি ও তাঁর স্ত্রী একটি বেসরকারি হাসপাতালে চাকরি নেন। সীমিত আয়ের মধ্যে সংসার চালানোর পাশাপাশি সন্তানদের পড়াশোনার খরচ জোগানো সহজ ছিল না। তবুও সন্তানদের শিক্ষার ব্যাপারে কোনো আপস করেননি তিনি।

আলী আকবরের মেয়ে ২০১৫ সালে নার্সিং পড়াশোনা শেষ করেন। এরপর ছেলে ইসমাইল হোসেনকে ভর্তি করান মেডিক্যাল কলেজে। ২০১৯ সালে এমবিবিএস পাস করেন ইসমাইল। পরে ৪২তম বিসিএসে চিকিৎসক হিসেবে সরকারি চাকরিতে যোগ দেন তিনি।

সন্তানরা যখন একে একে কর্মজীবনে প্রতিষ্ঠিত হন, তখন আলী আকবরের মনে আবারও জেগে ওঠে বহু বছরের পুরোনো সেই স্বপ্ন—আবার বই-খাতা হাতে নেওয়ার স্বপ্ন।

বয়সকে হার মানিয়ে আবার স্কুলে পরিবারের সঙ্গে আলোচনা করে নতুন করে পড়াশোনা শুরুর সিদ্ধান্ত নেন আলী আকবর। স্ত্রী ও সন্তানরা তাঁকে উৎসাহ দেন। তাঁদের সহযোগিতায় স্কুলে ভর্তি হয়ে শুরু করেন পড়াশোনা। বয়সের কারণে নতুন করে পড়াশোনায় ফেরার পথটা সহজ ছিল না। চাকরির পাশাপাশি নিয়মিত পড়াশোনা চালিয়ে যেতে হয়েছে তাঁকে। নানা চ্যালেঞ্জ এলেও হাল ছাড়েননি। অবশেষে এবারের এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে অর্জন করেন জিপিএ ৪.৩৫। নিজের সাফল্য সম্পর্কে আলী আকবর বলেন, “পড়াশোনার জন্য বয়স কোনো বাধা নয়। ইচ্ছাশক্তি, মনোবল ও অধ্যবসায় থাকলে সাফল্য অর্জন করা সম্ভব। আমি নিজের জীবন দিয়ে সেটিই দেখাতে চেয়েছি।”

তিনি বলেন, বর্তমানে অনেক শিক্ষার্থী মোবাইল ফোনে অতিরিক্ত সময় কাটিয়ে পড়াশোনার ক্ষতি করছে। সন্তানদের ক্ষেত্রেও পড়াশোনাকে তিনি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছেন। ছেলে মেডিক্যাল কলেজের তৃতীয় বর্ষে ওঠার পর এবং মেয়ে নার্সিং শেষ করার পর তাঁদের হাতে মোবাইল ফোন দেওয়া হয়েছিল বলেও জানান তিনি।

বাবার সাফল্যে গর্বিত চিকিৎসক ছেলে আলী আকবরের ছেলে চিকিৎসক ইসমাইল হোসেন বলেন, তাঁর বাবা অনেক দিন ধরেই আবার পড়াশোনা করার কথা বলতেন। পরিবারের সবাই তাঁকে উৎসাহ দিয়েছেন। স্কুলে ভর্তি হওয়া থেকে শুরু করে পড়াশোনার বিভিন্ন কাজে তাঁকে সহযোগিতা করেছেন।

ইসমাইল বলেন, “বাবা এসএসসি পাস করায় আমরা ভীষণ খুশি। তাঁর এই অর্জনে আমরা গর্বিত। আমরা চাই, বাবা আরও পড়াশোনা করুন।” ৩৬ বছর পর বই-খাতায় ফিরে ৫৪ বছর বয়সে এসএসসি পাস করে আলী আকবর যেন আবারও মনে করিয়ে দিলেন—স্বপ্ন পূরণের কোনো নির্দিষ্ট বয়স নেই। ইচ্ছাশক্তি থাকলে জীবনের যেকোনো সময় নতুন করে শুরু করা যায়।