মূল খবরে ফিরে যান
যা দেখছেন, PDF-এও সেটাই থাকবে। প্রিন্ট ডায়ালগে “Save as PDF” বেছে নিন।
Wednesday, 12 August 2026
অন্যান্য
banglabrief.com/
সংস্করণ
11 August 2026
অন্যান্য

শুধুমাত্র দুই বিষয়েই আটকে গেল ৭ লাখ পরীক্ষার্থী

গত ১৯ বছরের মধ্যে সবচেয়ে খারাপ ফল হয়েছে এবার এসএসসিতে। প্রতি ৩ জনের মধ্যে ১ জন শিক্ষার্থীই ফেল করেছে। জিপিএ-৫ কমেছে ২২ হাজারের বেশি। আর দেশের ৩১২টি স্কুল-মাদ্রাসার একজন শিক্ষার্থীও পাস করতে পারেনি। প্রশ্ন হলো— হুট করে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় এমন কী ঘটল? এটা কি শুধুই শিক্ষার্থীদের ব্যর্থতা, নাকি পেছনে লুকিয়ে আছে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার কোনো গভীর ক্ষত? চলুন বিশ্লেষণ করা যাক।

এক নজরে এসএসসির ফল

শুরুতেই এক নজরে এবারের ফলাফলের মূল চিত্রটা দেখে নেওয়া যাক। এবার মোট ১৮ লাখ ২৯ হাজার ৪৮৫ জন পরীক্ষার্থী এসএসসিতে অংশ নেয়। পাসের হার ৬২ দশমিক ২৫ শতাংশ, যা গত বছরের তুলনায় ৬ দশমিক ২০ শতাংশ কম। এবার রেকর্ডসংখ্যক পরীক্ষার্থী উত্তীর্ণ হতে পারেনি। এ সংখ্যা প্রায় ৭ লাখ। আর জিপিএ-৫ পেয়েছে ১ লাখ ১৬ হাজার ৬৭৬ জন, যা গত বছরের চেয়ে ২২ হাজার ৩৫৬ জন কম।

পরিসংখ্যান পরিষ্কার বলছে, ২০০৭ সালের পর এটিই এসএসসির সর্বনিম্ন পাসের হার। কিন্তু এই বিশাল পতনের পেছনে মূল কারণগুলো আসলে কী?

ফল বিপর্যয়ের মূল কারণ

এবারের ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সবচেয়ে বেশি বিপর্যয় ঘটেছে দুটি বিষয়ে— ইংরেজি ও গণিত। আর সবচেয়ে বড় ধাক্কা খেয়েছে মানবিক বিভাগের শিক্ষার্থীরা। বিজ্ঞান বিভাগে যেখানে পাসের হার ৮০ দশমিক ৬৪ শতাংশ, সেখানে মানবিক বিভাগে পাসের হার মাত্র ৪৮ দশমিক ৭৪ শতাংশ। অর্থাৎ মানবিকের অর্ধেকেরও বেশি শিক্ষার্থী ফেল করেছে।

ময়মনসিংহ বোর্ডে ইংরেজিতে পাস করেছে মাত্র ৬৬ দশমিক ৬৪ শতাংশ, আর সিলেট ও বরিশালে ৬৯ শতাংশ। কারিগরি ও মাদ্রাসা বোর্ডেও গণিতের অবস্থা আশঙ্কাজনক। শিক্ষাবিদদের মতে, বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকার স্কুলগুলোতে ইংরেজি ও গণিতের যোগ্য শিক্ষকের চরম সংকট রয়েছে। আর সেই ঘাটতিই এবার ফলাফলে হাতেনাতে ধরা পড়েছে।

সবচেয়ে দুর্ভাগ্যবান ব্যাচ?

এবার যারা পরীক্ষা দিয়েছে, তাদের ব্যাচটাকে বলা যায় সবচেয়ে দুর্ভাগ্যবান ব্যাচ। প্রধানত দুটি কারণে:

১. করোনার ধাক্কা: তাদের স্কুলজীবনের এক বড় সময় কেটেছে করোনার লকডাউনে, যা তাদের শিখন ঘাটতির মূল গোড়াপত্তন করে।

২. কারিকুলাম নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা: ২০২৪ সালে নবম শ্রেণিতে ওঠার পর তাদের নতুন শিক্ষাক্রমের বই দেওয়া হয়। কিন্তু সরকার পরিবর্তনের পর আবার হুট করে পুরোনো ২০১২ সালের কারিকুলামে ফিরিয়ে নেওয়া হয়।

চিন্তা করে দেখুন, একবার নতুন নিয়ম, আবার পুরোনো নিয়ম। এই বারবার পরিবর্তন ও সমন্বয়হীনতায় শিক্ষার্থীরা চরম বিভ্রান্তিতে পড়ে এবং মৌলিক বিষয়গুলোতে তাদের ঘাটতি আরও বেড়ে যায়।

মূল্যায়নে কড়াকড়ি

এত কিছুর পর অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন, আগে তো এত ফেল করত না, এবার কেন? বোর্ড কর্মকর্তা ও শিক্ষকরা বলছেন, এবার কোনো 'ওভারমার্কিং' করা হয়নি। খাতা দেখায় কঠোরতা এবং নিয়ম মেনে স্বচ্ছতা আনা হয়েছে। আগে একজন শিক্ষক ৪০০-৫০০ খাতা পেতেন, এবার দেওয়া হয়েছে মাত্র ৩০০টি করে। এ ছাড়া খাতা দেখার জন্য আগের চেয়ে বেশি সময় পেয়েছেন শিক্ষকরা। সেই সঙ্গে কেন্দ্রে সিসিটিভি স্থাপন ও কড়াকড়ির কারণে নকলের সুযোগ ছিল না বললেই চলে।

শহরে আলো, গ্রামে অন্ধকার

শিক্ষাবিদ রাশেদা কে. চৌধূরী একটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় আঙুল তুলেছেন— শহর আর গ্রামের শিক্ষার মান ও সুযোগের বৈষম্য। শহরের নামীদামী স্কুলগুলোর ফল খারাপ হয়নি, আসল বিপর্যয় ঘটেছে গ্রামগঞ্জে। এবার যে ৩১২টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে একজন শিক্ষার্থীও পাস করতে পারেনি, তার মধ্যে ২২৬টিই মাদ্রাসা। গ্রামে এখনো অনেক জায়গায় বাংলার শিক্ষক দিয়ে ইংরেজি বা গণিত পড়ানো হয়। এই দীর্ঘদিনের অবহেলাই আজকে ৭ লাখ শিক্ষার্থীকে ফেল করার পথে ঠেলে দিয়েছে।

তাহলে সমাধান কী? শিক্ষাবিদরা বলছেন, পাস কম হওয়াটা মূল সমস্যা নয়; আসল সমস্যা শিক্ষার ঘাটতি। এখন সরকারকে:

১. দুর্বল শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ সামার বা রেমিডিয়াল ক্লাসের ব্যবস্থা করতে হবে।

২. গ্রামীণ অঞ্চলে দ্রুত ইংরেজি ও গণিতের দক্ষ শিক্ষক নিয়োগ দিতে হবে।

৩. শূন্য পাস করা ৩১২টি প্রতিষ্ঠান নিয়ে নিবিড় গবেষণা করে ব্যবস্থা নিতে হবে।

পাস বাড়িয়ে দিয়ে কৃত্রিম ভালো ফল দেখানোর চেয়ে শিক্ষার্থীদের সত্যিকারের যোগ্য করে তোলাই এখন প্রধান চ্যালেঞ্জ।