মূল খবরে ফিরে যান
এই প্রিভিউ আর চূড়ান্ত প্রিন্ট/PDF একই লেআউট ব্যবহার করে।
Wednesday, 12 August 2026
অন্যান্য
banglabrief.com/
সংস্করণ
12 August 2026
অন্যান্য

যার নামে মৃত্যুদণ্ড, তিনি নাকি আসামিই নন!

কক্সবাজারে ১ লাখ ৯০ হাজার ইয়াবা উদ্ধারের মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত এক আসামিকে ঘিরে চাঞ্চল্যকর এক ‘আয়নাবাজি’র ঘটনা সামনে এসেছে। মামলার নথিতে যে ব্যক্তিকে ‘সোনা মিয়া’ নামে আসামি করা হয়েছিল এবং পরে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানো হয়েছে, তিনি ওই মামলার প্রকৃত আসামি নন বলে পুলিশের তদন্তে উঠে এসেছে।

পুলিশের প্রতিবেদন বলছে, ২০২০ সালে ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তি নিজেকে সোনা মিয়া পরিচয় দিলেও তাঁর প্রকৃত নাম রমজান। তিনি অন্য একজন সোনা মিয়ার জন্মনিবন্ধন ব্যবহার করে পুলিশের কাছে নিজের পরিচয় দিয়েছিলেন। সেই পরিচয়েই মামলা, জামিন এবং পরবর্তী বিচারিক কার্যক্রম এগিয়েছে। এর মধ্যে প্রকৃত সোনা মিয়া নিজের অজান্তেই ওই মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি হয়ে যান।

ঘটনাটি আরও জটিল হয়েছে ২০২৬ সালের ২৩ জুন। ওই দিন র‌্যাব-১৫-এর একটি অভিযানে ওয়ারেন্টের ভিত্তিতে সোনা মিয়াকে গ্রেপ্তার করে কক্সবাজার জেলা কারাগারে পাঠানো হয়। কারাগারে যাওয়ার দুই-তিন দিনের মাথায় তিনি জেল সুপারের কাছে আবেদন করে জানান, তিনি ওই মামলার আসামি নন।

এরপর বিষয়টি আদালতের নজরে আসে। আদালতের নির্দেশে কক্সবাজার সদর থানা পুলিশ তদন্ত করে গত ২ জুলাই প্রতিবেদন দাখিল করে। সেই প্রতিবেদনে ২০২০ সালে গ্রেপ্তার হওয়া ‘সোনা মিয়া’ এবং ২০২৬ সালে গ্রেপ্তার হওয়া সোনা মিয়া যে একই ব্যক্তি নন, তা উল্লেখ করা হয়েছ। বুধবার (১২ আগস্ট) এ বিষয়ে আদালতে আদেশ দেওয়ার কথা রয়েছে।

ঘটনার শুরু ২০২০ সালের ২ মার্চ। ওই দিন কক্সবাজার জেলা গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) একটি দল অভিযান চালিয়ে ১ লাখ ৯০ হাজার ইয়াবাসহ পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করে। তাদের মধ্যে মামলার এজাহারে ২ নম্বর আসামি করা হয় ‘সোনা মিয়া’কে। এজাহারে তার বাবার নাম নজির আহমদ, বর্তমান ঠিকানা কক্সবাজার পৌরসভার ১ নম্বর ওয়ার্ডের কুতুবদিয়াপাড়া এবং স্থায়ী ঠিকানা রামু উপজেলার গর্জনিয়া উল্লেখ করা হয়।

পুলিশের নথিতে বলা হয়, গ্রেপ্তারের সময় ওই ব্যক্তির কাছ থেকে পাওয়া একটি জন্মনিবন্ধনের ফটোকপির সূত্র ধরে তাঁর নাম সোনা মিয়া হিসেবে উল্লেখ করা হয়। কিন্তু পরে তদন্তে সেই পরিচয় নিয়েই প্রশ্ন ওঠে।

মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা তৎকালীন ডিবি পুলিশের পরিদর্শক মানস বড়ুয়া ২০২০ সালের সেপ্টেম্বরে আদালতে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দাখিল করেন।

চার্জশিটে বলা হয়, ২ নম্বর আসামি সোনা মিয়ার নাম-ঠিকানা যাচাই করতে কক্সবাজার সদর ও রামু থানা পুলিশকে দিয়ে অনুসন্ধান করা হয়। অনুসন্ধানে তার দেওয়া নাম-ঠিকানা সঠিক পাওয়া যায়নি।

তদন্ত কর্মকর্তা অভিযোগপত্রে আরও উল্লেখ করেন, আসামির নাম-ঠিকানা সঠিক না হওয়ায় তাকে জেলহাজতে রেখে পরবর্তী বিচার কার্যক্রম সম্পন্ন করার অনুরোধ করা হয়েছে। অর্থাৎ মামলার তদন্ত পর্যায়েই আসামির পরিচয় নিয়ে পুলিশের কাছে সন্দেহ তৈরি হয়েছিল। কিন্তু সেই সন্দেহের জট খুলে প্রকৃত পরিচয় বের করা হয়নি।

এরপরও মামলার বিচারিক কার্যক্রম চলতে থাকে। ২০২২ সালের ১৩ জুন কক্সবাজার জেলা জজ আদালত থেকে জামিন পান ‘সোনা মিয়া’। জামিনে বের হওয়ার পর তিনি আত্মগোপনে চলে যান। এরপর দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে আদালত মামলায় ‘সোনা মিয়াসহ’ পাঁচ আসামির বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের রায় ঘোষণা করেন। রায়ের পর পলাতক আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান শুরু হয়। এরই ধারাবাহিকতায় ২৩ জুন র‌্যাব-১৫-এর এক সিনিয়র ওয়ারেন্ট অফিসারের ওয়ারেন্টের ভিত্তিতে সোনা মিয়াকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে তাকে কক্সবাজার জেলা কারাগারে পাঠানো হয়। কিন্তু কারাগারে যাওয়ার পরই বদলে যায় পুরো মামলার চিত্র।

কারাগারে যাওয়ার দুই-তিন দিনের মাথায় সোনা মিয়া জেল সুপারের কাছে লিখিত আবেদন করেন। সেখানে তিনি দাবি করেন, ১ লাখ ৯০ হাজার ইয়াবা উদ্ধারের মামলার সঙ্গে তাঁর কোনো সম্পর্ক নেই।

জেল সুপার বিষয়টি কক্সবাজারের জেলা ও দায়রা জজ আদালতকে অবহিত করেন। আদালত বিষয়টি যাচাই করে প্রতিবেদন দেওয়ার জন্য কক্সবাজার সদর থানা পুলিশকে নির্দেশ দেন। পুলিশের তদন্ত শেষে ২ জুলাই আদালতে প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়।

সেই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২০ সালে ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তি এবং ২০২৬ সালের ২৩ জুন গ্রেপ্তার হওয়া সোনা মিয়া একই ব্যক্তি নন। ২০২০ সালে গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তির প্রকৃত নাম রমজান।

পুলিশের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, রমজান ও সোনা মিয়া একই সময়ে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে বসবাস করতেন। পরে তাঁরা ক্যাম্প থেকে বেরিয়ে কক্সবাজার শহরের কুতুবদিয়াপাড়ায় দীর্ঘদিন একই ঘরে বসবাস করেন। কোনো একসময় সোনা মিয়ার জন্মনিবন্ধনের কাগজ রমজানের কাছে থেকে যায়। পরে ২০২০ সালের অভিযানে গ্রেপ্তারের সময় রমজান নিজেকে সোনা মিয়া পরিচয় দেন এবং তার কাছে থাকা জন্মনিবন্ধনের ফটোকপি দেখান। সেই পরিচয়ই চলে যায় মামলার এজাহার ও পরবর্তী নথিতে। ফলে রমজানের বিরুদ্ধে মামলা হলেও কাগজে-কলমে আসামি হয়ে যান প্রকৃত সোনা মিয়া।

ঘটনাটি আরও স্পষ্ট হয়েছে কারাগারে সংরক্ষিত দুই সময়ের নথি ও ছবিতে। কারাগার সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালে গ্রেপ্তারের পর সংরক্ষিত ছবি এবং ২০২৬ সালের ২৩ জুন সোনা মিয়াকে গ্রেপ্তারের পর তোলা ছবির মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। শুধু ছবি নয়, দুই ব্যক্তির শারীরিক ও পারিবারিক পরিচয়েও রয়েছে একাধিক অমিল।

২০২০ সালে গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তির নথিতে বাবার নাম মৃত নজির আহমদ, মায়ের নাম সোনারা বেগম এবং স্ত্রীর নাম আয়েশা উল্লেখ করা হয়। তার দুই ছেলে ও দুই মেয়ে থাকার কথা বলা হয়েছে। ছেলের নাম মোহাম্মদ আলী। উচ্চতা ৫ ফুট ৩ ইঞ্চি, ওজন ৫০ কেজি। গায়ের রং শ্যামলা। শনাক্তকরণ চিহ্ন হিসেবে বাম গালে ক্ষত, ডান গালে ক্ষত এবং ডান বাহুতে ক্ষত থাকার কথা উল্লেখ রয়েছে।

অন্যদিকে, ২৩ জুন গ্রেপ্তার হওয়া সোনা মিয়ার নথিতে বাবার নাম মৃত নজির আহমদ হলেও মায়ের নাম মাহমুদা খাতুন এবং স্ত্রীর নাম জান্নাতুল ফেরদৌস। তার এক ছেলে ও তিন মেয়ে। ছেলের নাম ওমর ফারুক এবং মেয়ের নাম নাহিদা। উচ্চতা ৫ ফুট ১ ইঞ্চি, ওজন ৪২ কেজি। গায়ের রং শ্যামলা। শনাক্তকরণ চিহ্ন হিসেবে তার ডান বাহুতে তিল, পেটের বামে তিল এবং পিঠের মাঝখানে তিল থাকার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ একই বাবার নাম থাকলেও মা, স্ত্রী, সন্তান, শারীরিক উচ্চতা, ওজন ও শনাক্তকরণ চিহ্নে রয়েছে বড় ধরনের পার্থক্য। প্রশ্ন উঠছে তদন্ত ও জামিন নিয়ে এই ঘটনায় সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে তদন্ত এবং জামিন প্রক্রিয়া নিয়ে।

কারণ পুলিশের দেওয়া অভিযোগপত্রেই বলা হয়েছিল, ‘সোনা মিয়া’র নাম-ঠিকানা যাচাই করে সঠিক পাওয়া যায়নি।

আইনজীবীদের মতে, এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে মামলার তদন্তের শুরু থেকে পুরো প্রক্রিয়াটি পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।

কক্সবাজার জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি মো. আব্দুল মান্নান বলেন, মামলাটি দায়ের থেকে শুরু করে অভিযোগপত্র দাখিল পর্যন্ত তদন্তকারী কর্মকর্তার চরম গাফিলতি ছিল। তার ভাষ্য, কারও জন্মনিবন্ধন ব্যবহার করে অন্য কেউ নিজের পরিচয় দিলে সেটি যাচাই করে প্রকৃত ব্যক্তিকে শনাক্ত করার দায়িত্ব তদন্ত কর্মকর্তার। কিন্তু এ ক্ষেত্রে প্রকৃত আসামির পরিচয় যাচাই করা হয়নি। এমনকি ওই ব্যক্তি যে রমজান, সেটিও তদন্তে বের করা হয়নি।

আব্দুল মান্নান বলেন, এর ফলে প্রকৃত অপরাধী জামিনে বের হয়ে আত্মগোপনে চলে যাওয়ার সুযোগ পেয়েছেন। অন্যদিকে, যার কোনো সম্পৃক্ততা নেই, সেই সোনা মিয়াকে পরে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানো হয়েছে এবং তার নামে মৃত্যুদণ্ডের রায় হয়েছে।

সোনা মিয়ার স্ত্রী জান্নাতুল ফেরদৌসের সঙ্গে কথা বলেও একই ধরনের তথ্য পাওয়া গেছে।

তিনি বলেন, তাদের বাড়ি মহেশখালীতে। স্বামীকে নিয়ে আগে কক্সবাজার শহরের কুতুবদিয়াপাড়ায় থাকতেন। পরে চকরিয়ার ডুলহাজারায় চলে যান।

জান্নাতুল ফেরদৌসের দাবি, তার স্বামীর বিরুদ্ধে আগে কোনো মামলা ছিল না এবং তিনি কখনো কারাগারেও যাননি। হঠাৎ র‌্যাব তাকে ধরে নিয়ে যাওয়ার পর তারা জানতে পারেন, ১ লাখ ৯০ হাজার ইয়াবা উদ্ধারের একটি মামলায় তাঁর স্বামীর নাম রয়েছে।

তার দাবি, তার স্বামী রোহিঙ্গা নন। তিনি রামুর বাসিন্দা। কুতুবদিয়াপাড়ায় থাকার সময় রমজান নামের এক রোহিঙ্গার সঙ্গে তার বন্ধুত্ব ছিল। সেই রমজানই ১ লাখ ৯০ হাজার ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার হয়েছিলেন।

জান্নাতুল ফেরদৌস বলেন, তারা এতদিন জানতেন রমজান ওই মামলায় কারাগারে আছেন। এখন জানতে পারছেন, সেই মামলায় তার স্বামীর নাম ব্যবহার করা হয়েছে। তিনি এ ঘটনায় ন্যায়বিচার চান।

আদালতের নির্দেশে প্রতিবেদন দাখিলের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন কক্সবাজার সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শেখ মোহাম্মদ আলী।