12 August 2026
নদীতে মাছ ধরার জেলে থেকে ইয়াবা 'আমদানিকারক' উখিয়ার রিজভী

নাম রিজভী। একসময় কক্সবাজারের উখিয়ার সীমান্তঘেঁষা পালংখালীর আর দশজন সাধারণ মানুষের মতোই ছিল তার জীবনযাপন। কিন্তু কয়েক বছরের ব্যবধানে বদলে যায় সেই চিত্র। মিয়ানমার থেকে ইয়াবার চালান এনে রোহিঙ্গা ক্যাম্পসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় পৌঁছে দেওয়ার কাজে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠেন তিনি। ধীরে ধীরে গড়ে তোলেন নিজস্ব একটি বলয়। স্থানীয়ভাবে সেটি পরিচিতি পায় ‘রিজভী গ্রুপ’ হিসেবে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, পালংখালী সীমান্ত দিয়ে মিয়ানমার থেকে ইয়াবা আসার পর তা গ্রহণ, সংরক্ষণ ও দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পাঠানোর কাজে রিজভীর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। সীমান্তের ওপারের মাদক কারবারিদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে চালান নিয়ন্ত্রণ করেন তিনি। তার নিয়ন্ত্রণে থাকা নেটওয়ার্কের মাধ্যমে প্রতিরাতে কোটি কোটি টাকার ইয়াবা দেশের বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সীমান্ত এলাকায় ইয়াবা কারবারের বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে রিজভীর প্রভাবও বাড়তে থাকে। একসময় ছোট পরিসরে চলা কারবার ধীরে ধীরে বড় নেটওয়ার্কে রূপ নেয়। মিয়ানমার থেকে চালান আসার পর সীমান্তের বিভিন্ন পয়েন্টে তা গ্রহণের জন্য আলাদা লোকজন এবং দেশের অভ্যন্তরে পাঠানোর জন্য বাহক নিয়োগ করা হয়।
স্থানীয়দের অভিযোগ, দৃশ্যমান বড় কোনো ব্যবসা না থাকলেও মাদক কারবারে তিনি গড়ে তুলেছেন কোটি কোটি টাকার সম্পদ, ক্রয় করেছেন জমি, বাড়ি, গাড়ি, খামার ও ব্যবসার বিশাল সাম্রাজ্য।
স্থানীয় একাধিক সূত্রের দাবি, মিয়ানমার থেকে ইয়াবা এনে দেশের অভ্যন্তরে সরবরাহের অন্যতম নিয়ন্ত্রক রিজভী।
স্থানীয় বাসিন্দা ও একাধিক সূত্রের দেওয়া তথ্যমতে, পালংখালী ও আশপাশে রিজভীর ৪০ থেকে ৫০ একর জমি রয়েছে। পালংখালী বাজারে রয়েছে প্রায় দুই কোটি টাকা মূল্যের এক একর জমির প্লট। কোটবাজার, কক্সবাজার শহর, চট্টগ্রাম ও ঢাকাতেও জমি রয়েছে বলে জানা গেছে।
চকরিয়ায় রয়েছে পাঁচতলা দুটি বাড়ি। এছাড়া পূর্বপাড়া থেকে রাস্তার মাথা পর্যন্ত ৫০ থেকে ৬০ কানি এবং পশ্চিম পালংখালীতে প্রায় ২০০ কানি জমির ওপর তার নিয়ন্ত্রণ রয়েছে বলেও দাবি স্থানীয়দের। গ্যারেজে রয়েছে একাধিক এক্স-নোহা, টিআর-এক্স, তিনটি ডাম্পার ও একটি স্লিপার বাস। তার নিয়ন্ত্রণে শতাধিক সিএনজি চলাচল করে বলেও স্থানীয়রা দাবি করেছে। চারটি খামারে রয়েছে শতাধিক গরু-মহিষ। পূর্বপাড়া ও উলবনিয়ায় একাধিক চিংড়ি প্রকল্পেও বিনিয়োগ রয়েছে তার।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, রিজভীর বাবা নুরুল আলমের প্রধান সম্বল ছিল একটি মাছের প্রজেক্ট ও দাদার রেখে যাওয়া প্রায় ৫০ শতক কৃষিজমি। তিন ভাই ও তিন বোনের সংসারে আর্থিক সংকটের কারণে রিজভীর পড়াশোনা চতুর্থ শ্রেণির পর আর এগোয়নি। শৈশবে নদীতে মাছ ধরা ছিল তার জীবিকার অন্যতম মাধ্যম।
তাদের ভাষ্য, কৈশোরে ছোটখাটো ডাকাতির সঙ্গেও তার নাম জড়িয়েছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে বদলে যায় তার জীবনযাত্রা। কয়েক বছরের ব্যবধানে জমি, বাড়ি, গাড়ি, খামার ও বিভিন্ন ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করেন তিনি।
অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, রিজভী একা নন। তার সঙ্গে স্থানীয়ভাবে সক্রিয় রয়েছে একটি সংঘবদ্ধ চক্র। এই চক্রের সদস্যরা সীমান্ত থেকে ইয়াবা সংগ্রহ করে নিরাপদ স্থানে পৌঁছে দেওয়া এবং পরে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পাঠানোর দায়িত্ব পালন করে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে মাঝেমধ্যে বাহকরা আটক হলেও মূল নিয়ন্ত্রকেরা থেকে যাচ্ছেন ধরাছোঁয়ার বাইরে।
এরই মধ্যে রিজভীকে ঘিরে বড় একটি ইয়াবার চালান আটকের ঘটনাও সামনে আসে। সম্প্রতি তার নিয়ন্ত্রিত নেটওয়ার্কের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলে অভিযোগ থাকা একটি চালান থেকে ৮০ হাজার ইয়াবা উদ্ধারের ঘটনা ঘটে। ওই ঘটনায় বাহক আটক হলেও স্থানীয়দের প্রশ্ন, এত বড় চালানের নেপথ্যে থাকা মূল হোতারা কেন বারবার অধরা থেকে যাচ্ছেন?
স্থানীয় একাধিক সূত্রের দাবি, সীমান্তে ইয়াবার চালান প্রবেশের পর তা দ্রুত সরিয়ে নিতে রিজভীর রয়েছে নিজস্ব লোকবল। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা বাড়লে চালান সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা, নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া কিংবা বাহক পরিবর্তনের মতো কৌশলও ব্যবহার করা হয়।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, মাদক কারবার থেকে অর্জিত অর্থে রিজভীর জীবনযাপনেও এসেছে বড় পরিবর্তন। একসময় সাধারণ জীবনযাপন করলেও বর্তমানে তার হাতে বিপুল অর্থ ও সম্পদের মালিকানা এসেছে। তার সম্পদের উৎস নিয়েও এলাকায় রয়েছে নানা প্রশ্ন। স্থানীয়দের অভিযোগ, ইয়াবা ব্যবসা থেকেই এসব সম্পদের বড় অংশ এসেছে।
সীমান্তের মাদক কারবারিদের নিয়ে অনুসন্ধান করতে গিয়ে আরও জানা যায়, রিজভী ও তার সহযোগীরা শুধু পালংখালীকেন্দ্রিক নন। ইয়াবার চালান সীমান্ত থেকে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পৌঁছাতে পরিবহন নেটওয়ার্কের সঙ্গে তাদের যোগাযোগ রয়েছে। স্থানীয় পর্যায়ে বাহক ও পরিবহন শ্রমিকদের একটি অংশকে ব্যবহার করে দীর্ঘদিন ধরে এই কারবার পরিচালিত হয়।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, পালংখালী সীমান্তের ভৌগোলিক অবস্থান মাদক কারবারিদের জন্য বড় সুবিধা। সীমান্তের ওপারে মিয়ানমার, এপারে বিস্তৃত জনবসতি ও বিভিন্ন সড়ক যোগাযোগ থাকায় ইয়াবার চালান দ্রুত দেশের অভ্যন্তরে সরিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়। এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে রিজভীর মতো কারবারিরা শক্তিশালী নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছেন।
অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, রিজভীর সঙ্গে স্থানীয়ভাবে প্রভাবশালী কয়েকজন ব্যক্তির যোগাযোগ রয়েছে। এ যোগাযোগকে কাজে লাগিয়েই দীর্ঘদিন ধরে তিনি মাদক কারবার পরিচালনা করে আসছেন বলে স্থানীয়রা দাবি করেছেন।
এক স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, রিজভীকে আমরা একসময় খুব সাধারণ অবস্থায় দেখেছি। তখন তাঁর তেমন কোনো সম্পদ ছিল না। কিন্তু কয়েক বছরের ব্যবধানে তাঁর চলাফেরা, জীবনযাপন ও সম্পদের পরিমাণে বড় পরিবর্তন এসেছে।
এক স্কুল শিক্ষক বলেন, আগে রিজভীর হাতে বড় কোনো ব্যবসা বা সম্পদ ছিল বলে আমাদের জানা ছিল না। এখন তার গরুর খামারসহ বিভিন্ন সম্পদ রয়েছে। কীভাবে এত দ্রুত এই পরিবর্তন হলো, সেটিই এলাকার মানুষের প্রশ্ন।
স্থানীয় এক সমাজ কর্মী বলেন, রিজভীকে ঘিরে এলাকায় মাদক কারবারের নানা আলোচনা বহুদিনের। তবে এসব বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর তদন্তেই বেরিয়ে আসতে পারে।
আরেক স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, একসময় রিজভীর আর্থিক অবস্থা ছিল খুবই সাধারণ। এখন তার সম্পদের যে বিস্তার দেখা যাচ্ছে, তার উৎস কী, সেটি খতিয়ে দেখা দরকার। বিশেষ করে মাদক কারবারের সঙ্গে তাঁর সম্পৃক্ততার যেসব অভিযোগ এলাকায় রয়েছে, সেগুলোও তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।
স্থানীয়দের দাবি, রিজভীর সম্পদ বৃদ্ধির সময়কাল, ব্যবসায়িক কার্যক্রম এবং অর্থের উৎস খতিয়ে দেখলে তার উত্থানের প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট হতে পারে।
পালংখালী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান গফুর উদ্দিন বলেন, বর্তমানে রেজভীর গরুর খামারসহ একাধিক সম্পদ রয়েছে বলে শুনেছি। তবে একসময় রেজভীর নিয়ন্ত্রণে ইয়াবা ব্যবসা থাকলেও সরকার পরিবর্তনের পর থেকে ওই কারবার দলীয় কয়েকজনের নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে বলে জেনেছি। বর্তমানে তারাই পুরো মাদক কারবার নিয়ন্ত্রণ করে বিপুল অর্থ-সম্পদের মালিক হয়েছেন বলেও দাবি করেন তিনি।
এ বিষয়ে রেজভীর বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।
