মূল খবরে ফিরে যান
যা দেখছেন, PDF-এও সেটাই থাকবে। প্রিন্ট ডায়ালগে “Save as PDF” বেছে নিন।
Thursday, 13 August 2026
অন্যান্য
banglabrief.com/
সংস্করণ
13 August 2026
অন্যান্য

ক্ষুধার কাছে হারমানা ৮০ বছরের মনোয়ারা

জীবনের গোধূলিবেলায় এসে মনোয়ারা বেগমের শরীরটাই যেন হয়ে উঠেছে এক অসহায় ঠিকানা। বয়সের ভারে নুয়ে পড়া ৮০ বছরের এই বৃদ্ধার চোখে ছানি, কানে কম শোনা,শরীরের নানা জায়গায় ঘা নিয়ে প্রতিদিনই তাঁকে লড়তে হচ্ছে অসুস্থতার সঙ্গে।কিন্তু রোগের যন্ত্রণার চেয়েও তাঁর জীবনে বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে অভাব। পেটের ক্ষুধা মেটাতে কখনো মানুষের দ্বারে হাত পাততে হয়, আবার কখনো সেই হাতও খালি ফিরে আসে। তখন না খেয়েই কেটে যায় একটি দিন, একটি রাত।

সংসার থেমে গেছে বহু বছর আগে, কিন্তু থামেনি তাঁর জীবনসংগ্রাম। পটুয়াখালীর বাউফলের দাসপাড়া ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের দালাল বাড়িতে স্বামীর রেখে যাওয়া ভিটাটুকুই ৮০ বছরের মনোয়ারা বেগমের শেষ ঠিকানা। প্রায় তিন দশক আগে স্বামী মারা যাওয়ার পর থেকে সেই ভিটাতেই একাই পড়ে আছেন তিনি। আপন বলতে কেউ পাশে না থাকায় নিজের কষ্ট নিজেই সামলে দীর্ঘ ৩০ বছর ধরে নীরবে দিন পার করছেন মনোয়ারা। ছোট্ট সেই ভিটাটি আজ তাঁর কাছে শুধু বসতঘর নয় এটাই তাঁর স্মৃতি, আশ্রয় আর বেঁচে থাকার শেষ অবলম্বন।

মনোয়ারা বেগমের তিন মেয়ে—ফেরদৌসী (৪০), রিপা (৩৫) ও মালা (৩০)। তিনজনই বিবাহিত, নিজেদের সংসার নিয়ে ব্যস্ত। মায়ের প্রতি টান থাকলেও বাস্তবতার টানে নিয়মিত পাশে থাকা হয়ে ওঠে না তাদের। ফলে জীবনের শেষ প্রান্তে এসে অসুস্থ এই বৃদ্ধার দিন কাটছে অনেকটা নিঃসঙ্গভাবেই।

বাউফল হাসপাতাল সড়ক এলাকায় ক্ষুধার্ত অবস্থায় দেখা যায় মনোয়ারা বেগমকে। ভাত খাওয়ার জন্য মানুষের কাছে হাত পেতে টাকা চাইছিলেন তিনি। কথা বলার সময় তার কণ্ঠে ছিল অসহায়ত্ব আর ক্লান্তির ছাপ।ভালোভাবে চোখে দেখতে পান না তিনি। চোখে ছানি পড়েছে। কানেও কম শোনেন। বয়স ও অসুস্থতার কারণে নিজের দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় কাজও ঠিকমতো করতে পারেন না।

মনোয়ারা বেগম জানান, দীর্ঘদিন ধরে শরীরের বিভিন্ন স্থানে ঘা নিয়ে কষ্ট পাচ্ছেন তিনি। মুখ, গলা, জরায়ু ও পেটেও রয়েছে নানা শারীরিক জটিলতা। অসুস্থতা বাড়লেও অর্থের অভাবে নিয়মিত চিকিৎসকের কাছে যাওয়া বা প্রয়োজনীয় ওষুধ কেনা সম্ভব হয় না তাঁর।চিকিৎসকের পরামর্শে অপারেশনের প্রয়োজন থাকলেও টাকার অভাবে সেটিও করাতে পারছেন না। রোগের যন্ত্রণা একদিকে, অন্যদিকে চিকিৎসার খরচ জোগাড়ের অসহায়ত্ব,দুইয়ের মাঝে পড়ে যেন নিঃশব্দে কষ্ট সহ্য করেই দিন পার করছেন এই বৃদ্ধা।

মনোয়ারা বেগমের কথাগুলো মনে হয়, জীবনের দীর্ঘ লড়াইয়ে শেষ পর্যন্ত অভাবের কাছেই যেন হার মেনেছেন তিনি। কোনো দিন মানুষের দেওয়া খাবারেই মেটে ক্ষুধা, আবার কোনো দিন চুলায় আগুন না জ্বলে কেটে যায় দুবেলা। জীবনের এই প্রান্তে এসে তাঁর চাওয়াগুলোও খুব ছোট নিরাপদে মাথা গোঁজার একটু জায়গা, নিয়মিত চিকিৎসা আর আপনজনের সামান্য সঙ্গ। অথচ সেই সামান্যটুকুও যেন তাঁর নাগালের বাইরে। অসুস্থ শরীর আর শূন্যতার ভার কাঁধে নিয়ে একাই পাড়ি দিচ্ছেন জীবনের শেষ পথটুকু।

স্থানীয় রুমেন সিকদার বলেছেন, মনোয়ারা বেগমের মতো অসহায় প্রবীণদের সরকারি সামাজিক নিরাপত্তার আওতায় এনে নিয়মিত ভাতা ও চিকিৎসার ব্যবস্থা করা জরুরি। তার চোখের ছানি, শারীরিক বিভিন্ন সমস্যা ও অন্যান্য রোগের চিকিৎসার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় অপারেশনের ব্যবস্থা করা গেলে জীবনের শেষ সময়ে কিছুটা স্বস্তি পেতে পারেন তিনি।

স্থানীয়দের দাবি, এত অসহায় অবস্থায় থাকার পরও মনোয়ারা বেগম এখনও বয়স্ক ভাতা কিংবা বিধবা ভাতা পান না। একজন অসুস্থ ও অসহায় বৃদ্ধা কীভাবে সরকারি সহায়তার বাইরে রয়েছেন, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তারা। তাঁর করুণ জীবনযাপন যেন আমাদের সমাজের মানবিকতার কাছে এক নীরব প্রশ্ন—এই বয়সে অসহায় একজন বৃদ্ধার পাশে দাঁড়াবে কে.?