19 August 2026
দারাজে মিলছে মাদক সেবনের সরঞ্জাম ও অবৈধ যৌন উত্তেজক পণ্য

সহজ অনলাইন শপিংয়ের সুযোগ আর নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের আড়ালে দেশের অন্যতম বৃহৎ ই-কমার্স প্ল্যাটফর্ম ‘দারাজ’-এ চলছে ভয়ংকর সব অনিয়ম। ইতোমধ্যে মাদক ব্যবসার অভিযোগে দারাজের বিরুদ্ধে মামলা করেছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (নারকোটিক্স)। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মামলায় পড়া এই প্রতিষ্ঠানটিতে এবার প্রকাশ্যে বিক্রি হচ্ছে গাঁজা সেবনের কলকি, অনিবন্ধিত যৌন উত্তেজক ওষুধসহ নানা ধরনের ক্ষতিকর সামগ্রী।
ই-কমার্স নীতিমালার তোয়াক্কা না করে কোনো ধরনের অ্যালগরিদম ফিল্টারিং ও পণ্য যাচাই ছাড়াই এমন অবৈধ বাণিজ্য চলায় প্ল্যাটফর্মটির আইনি ও নৈতিক দায়বদ্ধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বিশেষজ্ঞরা।
অনুসন্ধানে দেখা যায়, দারাজে একেবারে উন্মুক্ত বিজ্ঞাপনের মাধ্যমেই বিক্রি হচ্ছে- যৌন উত্তেজক পণ্য, গাঁজা ও মাদক সেবনের বিভিন্ন অনুষঙ্গ। আইনি নজরদারি ও অ্যালগরিদম ফাঁকি দিতে গাঁজা সেবনের মাটির কলকিকে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে- ‘TONO HIM Lubricant Fruit Flavored Personal Lubricant sex Gel’ টোনো হিম লুব্রিকেন্ট ফ্রুট ফ্লেভারড পার্সোনাল লুব্রিকেন্ট সেক্স জেল, ‘Soil Flute Made by Pure Clay’ (মাটির তৈরি বাঁশি) নামে।
মাত্র ১৬৯ টাকায় সেক্স জেল এবং মাত্র ১৮৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে মাটির তৈরি বাঁশি। এই পণ্যের বিস্তারিত বিবরণীতে গেলে দেখা যায়, মাটির কলকির পাশাপাশি কাঠ ও শিং দিয়ে তৈরি বিশেষ পাইপ ও মাদক সেবনের নানা সরঞ্জামও সেখানে রাখা হয়েছে। শুধু তাই নয়, ‘এয়ার ফ্রেশনার’ কিংবা ‘এসেনশিয়াল অয়েল’-এর নামে উচ্চমাত্রার ক্যানাবিস নির্যাস (টিএইচসি) এবং প্রসাধন সামগ্রীর আড়ালে নিষিদ্ধ তরল মাদক বিক্রিরও শক্ত প্রমাণ পেয়েছে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা।
মাদক বা এর অনুষঙ্গ ছাড়াও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনহীন শত শত দেশি-বিদেশি যৌন উত্তেজক ওষুধ ও কেমিক্যালের রমরমা হাট বসেছে এই প্ল্যাটফর্মে। কোনো ধরনের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশন যাচাই ছাড়াই ‘ফুড সাপ্লিমেন্ট’ বা ‘হার্বাল প্রোডাক্ট’ ট্যাগ লাগিয়ে বিক্রি হচ্ছে এসব স্পর্শকাতর কেমিক্যাল, যা তরুণ প্রজন্মের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি তৈরি করছে।
দারাজের লোগোযুক্ত প্যাকেট ব্যবহার করে সিবিডি অয়েল বা অ্যারোমেটিক অয়েলের নামে তরল মাদক বিক্রির চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়ার পর সম্প্রতি বড় ধরনের অভিযান চালায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (ডিএনসি)। ক্রেতা সেজে অনলাইনে অর্ডার দিয়ে প্রায় ৬০ লাখ টাকা মূল্যের ৬২০ মিলিলিটার তরল ‘টিএইচসি’ উদ্ধার করে ডিএনসি। পরবর্তীতে এ ঘটনায় জড়িত মূল কেমিস্টকে গ্রেপ্তার করা হয়।
ডিজিটাল মাধ্যম ব্যবহার করে মাদক বিক্রির অভিযোগে দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো বাড্ডা থানায় একটি মামলা দায়ের করা হয়। যেখানে দারাজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) থেকে শুরু করে সংশ্লিষ্ট সেলারদেরও আসামি করা হয়েছে।
তদন্ত সংশ্লিষ্টদের প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, দীর্ঘ প্রায় পাঁচ বছর ধরে কোনো নজরদারি ছাড়াই এই প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে চার শতাধিক বোতলের বেশি বিপজ্জনক তরল মাদক বিক্রি করা হয়েছে।
একটি দায়িত্বশীল ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান হিসেবে থার্ড-পার্টি সেলারদের পণ্য তালিকাভুক্তির ক্ষেত্রে কঠোর মনিটরিং ও ‘কী-ওয়ার্ড ফিল্টারিং’ থাকার কথা থাকলেও দারাজের ক্ষেত্রে তা পুরোপুরি অনুপস্থিত। ছদ্মবেশী নামে এভাবে মাদক ও যৌন উত্তেজক পণ্য বিক্রির ঘটনায় তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ই-কমার্স খাতের বিশেষজ্ঞরা।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু বিক্রেতার ওপর দায় চাপিয়ে ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মগুলোর পার পাওয়ার সুযোগ নেই। সঠিক যাচাই-বাছাই ছাড়া কোটি কোটি মানুষের কাছে এসব পণ্য পৌঁছে দেয়া ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোর বড় ধরনের গাফিলতি এবং জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকিস্বরূপ।
গুরুতর এসব অভিযোগের পর বরাবরের মতোই দায় এড়ানোর বক্তব্য দিয়েছে ‘দারাজ বাংলাদেশ।’ তবে তাদের প্রতিশ্রুতির সাথে বাস্তব চিত্রের কোনো মিল নেই; কারণ সংবাদ প্রকাশের ঠিক আগ মুহূর্তেও প্ল্যাটফর্মটিতে প্রকাশ্যে মাদক সেবনের সরঞ্জাম এবং যৌন উত্তেজক পণ্য বিক্রি হতে দেখা গেছে।
দারাজ বাংলাদেশের পক্ষ থেকে জানানো হয়, পণ্যের নিরাপত্তা, প্রচলিত আইন মেনে চলা এবং গ্রাহকের আস্থাকে তারা সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে থাকে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর থেকে মৌখিক অভিযোগ পাওয়ার পরপরই সংশ্লিষ্ট পণ্যটি তাৎক্ষণিকভাবে সরিয়ে নেয়া হয়েছে এবং নীতিমালার আলোকে সংশ্লিষ্ট বিক্রেতার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। একই সাথে প্ল্যাটফর্মে এমন কোনো পণ্য আর আছে কি না, তা শনাক্ত করতে নজরদারি ও যাচাই কার্যক্রম আরও জোরদার করা হয়েছে বলেও জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
