23 August 2026
ইসরায়েল পরমাণু অস্ত্র ধ্বংস করলেই অঞ্চলে শান্তি আসবে

যতদিন পশ্চিম এশিয়ায় দখলদার ইসরায়েলের পরমাণু অস্ত্রের বিষয়টি আন্তর্জাতিক নীরবতার আড়ালে লুকিয়ে থাকবে, ততদিন এই অঞ্চলে পরমাণু নিরস্ত্রীকরণ নিয়ে যেকোনো আলোচনা অর্থহীন ও ভণ্ডামিপূর্ণ বলেই বিবেচিত হবে।
পার্সটুডের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইসরায়েল কখনো আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের পারমাণবিক অস্ত্র থাকার বিষয়টি স্বীকার বা অস্বীকার করেনি। তবে বিভিন্ন নির্ভরযোগ্য আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে যে, তাদের কাছে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক পারমাণবিক অস্ত্র রয়েছে। স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের ২০২৫ সালের প্রতিবেদনের ভিত্তিতে বলা হয়েছে, ইসরায়েলের কাছে প্রায় ৯০টি পারমাণবিক অস্ত্র রয়েছে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, এসব অস্ত্রের সম্মিলিত বিস্ফোরণক্ষমতা হিরোশিমায় নিক্ষিপ্ত বোমার প্রায় ১৬৫ গুণ, যা আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য একটি গুরুতর হুমকি।
এছাড়া ইসরায়েল শুধু বিভাজ্য পারমাণবিক উপাদান উৎপাদনই অব্যাহত রাখেনি, বরং বছরে প্রায় ১০টি নতুন পারমাণবিক ওয়ারহেড তৈরির সক্ষমতাও রাখে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এমন একটি অঞ্চলে, যেখানে সামান্য অস্থিতিশীলতাও মানবিক বিপর্যয়ে রূপ নিতে পারে, সেখানে গণবিধ্বংসী অস্ত্রের এই বিপুল মজুদ মূলত সামরিক আধিপত্য বজায় রাখা এবং প্রতিবেশীদের ভীত করার কৌশল হিসেবেই বিবেচিত হতে পারে।
ইসরায়েলের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি হলো পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তি বা এনপিটি'র ক্ষেত্রে দেশটির অবস্থান। ইসরায়েল এ চুক্তিতে স্বাক্ষর করেনি এবং নিজেদের পারমাণবিক স্থাপনাগুলো আন্তর্জাতিক তদারকির আওতায় আনতেও অস্বীকৃতি জানিয়ে আসছে।
অন্যদিকে, ইরান ১৯৭০ সাল থেকে এনপিটির সদস্য এবং নিজেদের পারমাণবিক স্থাপনাগুলো আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার সুরক্ষা ব্যবস্থার আওতায় রেখেছে। অথচ দেশটিকে কঠোর রাজনৈতিক চাপ ও অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার মুখোমুখি হতে হয়েছে। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের ৪৮৭ নম্বর প্রস্তাবে ইসরায়েলকে তার সব পারমাণবিক স্থাপনা আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার তত্ত্বাবধানে আনার আহ্বান জানানো হয়েছিল। কিন্তু ইসরায়েল দীর্ঘদিন ধরে এই প্রস্তাব উপেক্ষা করে আসছে বলে প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হয়েছে।
অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় ধরে অনুসৃত তথাকথিত ‘পারমাণবিক অস্পষ্টতার’ নীতির মাধ্যমে ইসরায়েল কার্যত পশ্চিম এশিয়ায় নিজের পারমাণবিক একচেটিয়া অবস্থান ধরে রাখতে চাইছে। এই নীতি শুধু নিরাপত্তা-সংক্রান্ত স্বচ্ছতাকেই ক্ষতিগ্রস্ত করে না, বরং অঞ্চলজুড়ে অস্ত্র প্রতিযোগিতাকেও উসকে দিতে পারে।
প্রতিবেদনে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রতিরক্ষা দপ্তরের উপদেষ্টা থিওডোর পোস্টলের বক্তব্যও উল্লেখ করা হয়েছে। তিনি বলেছেন, পশ্চিম এশিয়ায় প্রধান পারমাণবিক হুমকি ইরান নয়, বরং ইসরায়েল থেকে উদ্ভূত। যতদিন ইসরায়েল এনপিটিতে যোগদান এবং আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার পূর্ণাঙ্গ পরিদর্শন গ্রহণে অস্বীকৃতি জানাবে, ততদিন পশ্চিম এশিয়াকে পারমাণবিক অস্ত্রমুক্ত অঞ্চল হিসেবে গড়ে তোলার প্রচেষ্টা বড় বাধার মুখে পড়বে।
আঞ্চলিক পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণের পথে আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো বিভিন্ন দেশের পারমাণবিক কর্মসূচির প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের দ্বৈত নীতি। ওয়াশিংটন ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, রাজনৈতিক চাপ, সামরিক হুমকি ও হামলার নীতি অনুসরণ করেছে। অথচ ইসরায়েলের পারমাণবিক কর্মসূচির ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র শুধু চাপ প্রয়োগ থেকেই বিরত থাকেনি, বরং দেশটির পারমাণবিক অস্পষ্টতার নীতিকেও সমর্থন করে আসছে।
এই দ্বৈত নীতি পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্বাসযোগ্যতাকে মারাত্মকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেও বহু কংগ্রেস সদস্য ইসরায়েলের পারমাণবিক অস্ত্রভাণ্ডার নিয়ে স্বচ্ছতার দাবি তুলেছেন এবং সরকারের বিরুদ্ধে দ্বৈত মানদণ্ড অনুসরণের অভিযোগ করেছেন।
যদি যুক্তরাষ্ট্র সত্যিই দাবি করে যে, ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করা উচিত নয়, তাহলে একই নীতি ইসরায়েলের ক্ষেত্রেও সমানভাবে প্রযোজ্য হওয়া উচিত।
আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়, বিভিন্ন আরব দেশ এবং জাতিসংঘ বহুবার ইসরায়েলের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোকে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার পূর্ণাঙ্গ তত্ত্বাবধানে আনার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়েছে। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের একটি প্রস্তাবে ১৫২টি দেশের সমর্থনে ইসরায়েলকে পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণ এবং আইএইএ পরিদর্শকদের প্রবেশাধিকার দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়।
ইরান, মিসর এবং কুয়েত ও কাতারসহ কয়েকটি আরব দেশ ইসরায়েলকে একটি অ-পারমাণবিক রাষ্ট্র হিসেবে এনপিটিতে যোগদান এবং পূর্ণাঙ্গ সুরক্ষা ব্যবস্থা গ্রহণে বাধ্য করার দাবি জানিয়েছে। আঞ্চলিক আস্থা পুনর্গঠন এবং উত্তেজনা কমানোর জন্য এটিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সব মিলিয়ে, পশ্চিম এশিয়ায় যদি সত্যিকার অর্থে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে হয়, তাহলে ইসরায়েলের পারমাণবিক অস্ত্রের বাস্তবতাকে উপেক্ষা করার কোনো সুযোগ নেই। তাদের পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণ এবং পারমাণবিক স্থাপনাগুলোকে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার তত্ত্বাবধানে আনা শুধু একটি রাজনৈতিক দাবি নয়; এটি আইনগত, নিরাপত্তাগত ও নৈতিক প্রয়োজনীয়তাও বটে।
যতদিন পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধের ক্ষেত্রে দ্বৈত মানদণ্ড বহাল থাকবে এবং ইসরায়েল পারমাণবিক অস্পষ্টতার আড়ালে নিজেদের অস্ত্রভাণ্ডার বাড়াতে থাকবে, ততদিন পশ্চিম এশিয়া অস্থিতিশীলতা ও অনিরাপত্তার বৃত্তেই আবদ্ধ থাকবে।
আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উচিত নীরব না থেকে ইসরায়েলের প্রতি আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলার আহ্বান জানানো এবং পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণের পথে বাস্তব ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি তোলা। কেবল তখনই পশ্চিম এশিয়ায় পারমাণবিক অস্ত্রমুক্ত, শান্তিপূর্ণ ও স্থিতিশীল ভবিষ্যতের আশা করা সম্ভব।
