মূল খবরে ফিরে যান
যা দেখছেন, PDF-এও সেটাই থাকবে। প্রিন্ট ডায়ালগে “Save as PDF” বেছে নিন।
Saturday, 29 August 2026
অন্যান্য
banglabrief.com/
সংস্করণ
28 August 2026
অন্যান্য

স্বপ্নের সৌদি থেকে ফিরলেন কফিনবন্দি রবিউল

বাবা-মায়ের জন্য একটি সুন্দর বাড়ি করবেন এটাই ছিল রবিউল ইসলাম হৃদয়ের সবচেয়ে বড় স্বপ্ন। সংসারের অভাব ঘোচাতে পাঁচ লাখ টাকা ঋণ করে প্রায় পাঁচ বছর আগে পাড়ি জমিয়েছিলেন সৌদি আরবে। সাড়ে তিন বছর কাজহীনতা আর অনিশ্চয়তার পর যখন শুরু করেছিলেন আয়-রোজগার, তখনই ভয়াবহ আগুন কেড়ে নিল তার প্রাণ। সৌদি আরবের একটি সোফা কারখানায় আগুনে নিহত নাটোরের নলডাঙ্গার রবিউলের মরদেহ দীর্ঘ অপেক্ষার পর পৌঁছেছে বাড়িতে।

স্বপ্ন ছিল একদিন বাবা-মায়ের জন্য মাথা গোঁজার মতো একটি সুন্দর বাড়ি করবেন। সংসারের অভাব দূর করে ফিরিয়ে আনবেন স্বচ্ছলতা। সেই স্বপ্ন নিয়েই প্রায় পাঁচ বছর আগে পাঁচ লাখ টাকা ঋণ করে সৌদি আরবে পাড়ি জমান নাটোরের নলডাঙ্গার মহিষডাঙ্গা গ্রামের রবিউল ইসলাম হৃদয়।

কিন্তু প্রবাসজীবনের শুরুটাই ছিল কঠিন। বৈধ কাগজপত্র না থাকায় সাড়ে তিন বছর তেমন কোনো কাজই পাননি রবিউল। অনিশ্চয়তা, দুশ্চিন্তা আর মানবেতর জীবনেই কেটেছে দিনের পর দিন।

অবশেষে কাগজপত্রের জটিলতা কাটিয়ে গত দেড় বছর আগে কাজ শুরু করেন তিনি। আয়-রোজগার শুরু হওয়ায় নতুন করে স্বপ্ন দেখতে শুরু করে পরিবার। ধীরে ধীরে পরিশোধ করছিলেন বিদেশ যাওয়ার জন্য নেওয়া ঋণও।

নিহতের মা আঞ্জুয়ারা বেগম বলেন, ছেলে অনেক কষ্ট করেছে। কাজ পাওয়ার পর ঋণের টাকা মাসে মাসে পরিশোধ করছিল। ওর স্বপ্ন ছিল আমাদের জন্য একটা বাড়ি করবে। মৃত্যুর আগেও আমার সঙ্গে কথা হয়েছে। বলল মা, এখন ঘুমাবো, পরে কথা বলব।’ সেই ঘুম যে শেষ ঘুম হবে, ভাবতেও পারিনি।

শুধু নিজের কথা ভাবেননি রবিউল। পরিবারের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে ছয় মাস আগে ছোট ভাইকেও নিয়ে যান সৌদি আরবে। দুই ভাই মিলে সংসারের অভাব ঘুচাবেন এমন স্বপ্নই ছিল তাদের।কিন্তু সেই স্বপ্নের পথ থেমে যায় গত ৯ আগস্ট।

সৌদি আরবের একটি সোফা কারখানায় ভয়াবহ আগুনে পুড়ে মারা যান রবিউল ইসলাম হৃদয়। দীর্ঘ অপেক্ষার পর দেশে ফেরে তার মরদেহ। তবে জীবিত রবিউল নয় ফিরেছেন কাফনে মোড়ানো নিথর দেহ হয়ে।

ছেলের মরদেহ বাড়িতে পৌঁছানোর পর থেকেই কান্নায় ভেঙে পড়েছেন মা আঞ্জুয়ারা বেগম। বারবার জ্ঞান হারাচ্ছেন। স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে মহিষডাঙ্গা গ্রামের পরিবেশ।

রবিউল ছিলেন কৃষক আসলাম হোসেনের বড় ছেলে। ছেলেকে ঘিরেই ছিল পরিবারের অনেক স্বপ্ন। কিন্তু সেই ছেলে চলে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পরিবারটির সামনে এখন নতুন সংকট ঋণের বোঝা।

স্বজনরা জানান, রবিউল থাকলে ধীরে ধীরে সব ঋণ পরিশোধ করতে পারত। বাবা কৃষক মানুষ। এখন এই ঋণ কীভাবে শোধ হবে, সেটাই আমাদের চিন্তা।

পরিবারের বসতবাড়ির অবস্থাও জরাজীর্ণ। রবিউলের স্বপ্ন ছিল সেই বাড়ি বদলে দেবেন। কিন্তু স্বপ্ন পূরণের আগেই থেমে গেছে তার জীবন। এখন একদিকে সন্তান হারানোর শোক, অন্যদিকে ঋণের বোঝা দুইয়ের ভারে দিশেহারা পরিবারটি।

রবিউল ইসলাম হৃদয়ের স্বপ্ন ছিল বাবা-মায়ের জন্য একটি সুন্দর বাড়ি নির্মাণ করা। পরিবারের সেই স্বপ্ন আর পূরণ হবে না। বরং রবিউলের মৃত্যুর পর এখন তার পরিবারকে ভাবতে হচ্ছে, কীভাবে পরিশোধ করবে তার রেখে যাওয়া ঋণ। তাই সরকারি সহায়তার প্রত্যাশা স্বজনদের।

তবে পরিবারটির পাশে দাঁড়ানোর আশ্বাস দিয়েছে উপজেলা প্রশাসন। নলডাঙ্গা উপজেলা নির্বাহী অফিসার আল ইমরান খান বলেন, নিহত রবিউলের পরিবারকে প্রাথমিকভাবে নগদ ২০ হাজার টাকা আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়েছে। ভবিষ্যতে পরিবারটি যেন আরও সহযোগিতা পায়, সে বিষয়েও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

শুক্রবার সকাল ১০টায় নিজ গ্রাম মহিষডাঙ্গায় জানাজা শেষে দাফন করা হয়েছে রবিউল ইসলাম হৃদয়কে।

যে মানুষটি পরিবারের মুখে হাসি ফোটাতে হাজার মাইল দূরে পাড়ি জমিয়েছিলেন, শেষ পর্যন্ত তার নিজের ঘরেই ফিরতে হলো নিথর দেহ হয়ে। বাবা-মায়ের স্বপ্নের বাড়ি আর করা হলো না রবিউলের। রেখে গেলেন শুধু স্মৃতি, অপূর্ণ স্বপ্ন আর ঋণের বোঝা।