মূল খবরে ফিরে যান
যা দেখছেন, PDF-এও সেটাই থাকবে। প্রিন্ট ডায়ালগে “Save as PDF” বেছে নিন।
Sunday, 30 August 2026
অন্যান্য
banglabrief.com/
সংস্করণ
29 August 2026
অন্যান্য

সাড়ে ১৪ বছরেও ফেরেননি মুকাদ্দাস-ওয়ালীউল্লাহ, কাঁদছে দুই পরিবার

২০১২ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি। ঢাকা থেকে কুষ্টিয়া ফেরার পথে গুম হন ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইবি) দুই মেধাবী শিক্ষার্থী আল-মুকাদ্দাস ও মো. ওয়ালীউল্লাহ। এরপর পেরিয়ে গেছে সাড়ে ১৪ বছর। কিন্তু ফেরেননি তারা। তাঁরা বেঁচে আছেন, নাকি চিরতরে মেরে ফেলা হয়েছে- এসব প্রশ্নের উত্তর মেলেনি আজও। সন্তানকে ফিরে পাওয়ার আশায় আজও পথ চেয়ে আছেন তাঁদের বৃদ্ধ বাবা-মা। শেষবারের মতো সন্তানকে দেখা কিংবা অন্তত তাঁর কবরের ঠিকানাটুকু জানার আকুতি নিয়ে দিন গুনছে দুই পরিবার। রাষ্ট্রের কাছে সন্তানদের সন্ধান ও ঘটনার বিচার চেয়ে অপেক্ষায় রয়েছেন স্বজনেরা।

জানা যায়, ২০১২ সালের ২ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় যান আল-ফিকহ বিভাগের শিক্ষার্থী আল-মুকাদ্দাস। পরে ৪ ফেব্রুয়ারি রাতে তিনি ও তাঁর বন্ধু দাওয়াহ অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের শিক্ষার্থী মো. ওয়ালীউল্লাহ রাজধানীর কল্যাণপুর থেকে হানিফ পরিবহনের একটি বাসে (নম্বর-৩৭৫০) ওঠেন।

বাসটি রাত সাড়ে ১১টার দিকে কল্যাণপুর থেকে ছেড়ে রাত ১টার দিকে সাভারের নবীনগর এলাকায় পৌঁছায়। সেখানে র‍্যাব-৪-এর একটি কালো গাড়ি বাসটির গতিরোধ করে। র‍্যাবের পোশাক পরিহিত ৮-১০ জন এবং সাদা পোশাকধারী কয়েকজন ব্যক্তি বাসে উঠে র‍্যাব ও ডিবি পরিচয়ে মুকাদ্দাস ও ওয়ালীউল্লাহকে নামিয়ে নিয়ে যান। এরপর থেকে তাদের আর কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি।

এ ঘটনায় ৬ ফেব্রুয়ারি মুকাদ্দাসের চাচা আবদুল হাই রাজধানীর দারুস সালাম থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। ওয়ালীউল্লাহর নিখোঁজের ঘটনায় ৮ ফেব্রুয়ারি তাঁর বড় ভাই খালেদ সাইফুল্লাহ আশুলিয়া থানায় জিডি করেন।

পরে নিখোঁজ দুই শিক্ষার্থীর পরিবার পুলিশ, র‍্যাবসহ প্রশাসনের বিভিন্ন কর্মকর্তার কাছে যোগাযোগ করেও তাঁদের সন্ধান না পেয়ে হাইকোর্টে পৃথক দুটি রিট পিটিশন করেন। পরবর্তীতে রিট দুটিও খারিজ হয়ে যায়।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আল-মুকাদ্দাস ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের আল-ফিকহ বিভাগের অনার্স চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী এবং বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রশিবিরের সাংস্কৃতিক সম্পাদক। তাঁর বাড়ি পিরোজপুর সদর উপজেলার খানাকুনিয়ারী গ্রামে। বাবা মাওলানা আবদুল হালিম ও মা আয়শা সিদ্দিকার তিন সন্তানের মধ্যে জ্যেষ্ঠ ছিলেন তিনি। তাঁর একমাত্র বোন তাজরিয়ান এবং ছোট ভাই মুকাররম হোসাইন জারীর বর্তমানে চট্টগ্রাম আইআই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। অন্যদিকে, মো. ওয়ালিউল্লাহ ছিলেন ইবির দাওয়াহ অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের মেধাবী শিক্ষার্থী এবং শাখা ছাত্রশিবিরের অর্থ সম্পাদক। ঝালকাঠির কাঁঠালিয়া উপজেলার পশ্চিম শৌলজালিয়া গ্রামের বাসিন্দা ওয়ালীউল্লাহ ছিলেন সাত ভাইবোনের মধ্যে পঞ্চম।

২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর শিক্ষার্থীদের দাবির মুখে গত বছরের সেপ্টেম্বরে আল-মুকাদ্দাস ও মো. ওয়ালীউল্লাহর নিখোঁজের ঘটনা তদন্তে একটি ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটি গঠন করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। কমিটিতে ব্যবস্থাপনা বিভাগের অধ্যাপক আব্দুল হান্নানকে আহ্বায়ক এবং পরিকল্পনা ও উন্নয়ন বিভাগের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক মোয়াজ্জেম হোসেনকে সদস্যসচিব করা হয়।

কমিটির আহ্বায়ক হিসেবে অধ্যাপক আব্দুল হান্নান শেখ দুটি সভা করেন এবং প্রাথমিকভাবে কিছু কাজের খসড়াও প্রস্তুত করেন। তবে পরবর্তী সময়ে কমিটির অন্য সদস্যদের অসহযোগিতার অভিযোগ তুলে তিনি পদত্যাগ করেন। এরপর প্রায় এক বছরে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন কমিটি পুনর্গঠন বা নতুন কোনো উদ্যোগ না নেওয়ায় তদন্ত কার্যক্রম আর এগোয়নি। তৎকালীন কমিটির আহ্বায়ক অধ্যাপক আব্দুল হান্নান শেখ বলেন, “আমি কয়েকটি সভা করেছিলাম। কিন্তু কমিটির অন্য সদস্যরা অসহযোগিতা করায় আমি পদত্যাগ করি। তবে এ বিষয়ে প্রশাসন কোনো বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেনি এবং কমিটিও পুনর্গঠনও করেনি।”

সার্বিক বিষয়ে মো. ওয়ালীউল্লাহর বড় ভাই খালিদ সাইফুল্লাহ বলেন, “বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে আমাদের সঙ্গে কখনো যোগাযোগ করেনি। শুধু আগের উপাচার্য থাকাকালে আমরা একবার সাক্ষাৎ করার সুযোগ পেয়েছিলাম। এখন এসব নিয়ে কথা বলতে আর ইচ্ছা হয় না। কথা বলতে বলতে, লিখতে লিখতে আমরা হয়রান হয়ে গেছি।”

সরকারের কাছে প্রত্যাশা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “সরকারের কাছে প্রত্যাশা করলেও তো কিছু পাব না। আপনার কী মনে হয় সরকার আসলে এসব ঘটনার বিচার করতে পারবে? এই ঘটনার সঙ্গে র‍্যাব, সেনাবাহিনী জড়িত। সেনাবাহিনীতে যারা এখনো কর্মরত, তারা কি তাদেরই বিচার করবে? আসলে এ দেশের প্রেক্ষাপটে এটি বিচারযোগ্য নয়। যারা গুম থেকে ফিরে এসেছে, তাদের ক্ষেত্রেও তো বিচার হয়নি। আপনি যেহেতু মিডিয়ায় কাজ করেন, বাস্তবতা তো বোঝেন।”

কেনো রাষ্ট্রীয় সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ হয়েছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, “কারও সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়নি। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ছাত্রশিবির যোগাযোগ করে তথ্য নিয়েছিল। তখন বিষয়টি নিয়ে নতুন করে কিছুটা আলাপ-আলোচনা হয়েছিল। তবে গুম কমিশন বা অন্য কোনো সংস্থা আমাদের সঙ্গে কোনো ধরনের যোগাযোগ করেনি।”

আল-মুকাদ্দাসের ছোট ভাই মুকাররম হোসাইন জারির বলেন, “বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং কমিটি করলেও আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেনি।‘গুম কমিশন’ বা রাষ্ট্রীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকেও যোগাযোগ করা হয়নি। এ বিষয়ে ছাত্রশিবির গুম কমিশনের সঙ্গে যোগাযোগ করলে আমি সেখানে উপস্থিত ছিলাম। তৎকালীন চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলামের পরামর্শে আশুলিয়া একটি থানায় অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে মামলা করেছি। সেটি বর্তমানে চলমান রয়েছে। কিন্তু সরকার পরিবর্তনের পর বর্তমানে এ বিষয়ে আর তেমন কোনো আলোচনা হচ্ছে না।

পরিবারের সদস্যদের বিষয়ে জানতে চাইলে মুকাররম জারির বলেন, “মুকাদ্দেসের বাবা-মা দুজনই জীবিত আছেন। তবে তারা মানসিকভাবে বিপর্যস্ত এবং প্রায়ই কান্নাকাটি করেন। তাদের সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তা হলোÑতাদের সন্তান আদৌ বেঁচে আছেন কি না, নাকি মারা গেছেন, সেটি পর্যন্ত তারা এখনো নিশ্চিত নন। তারা অন্তত তাদের সন্তানের কবরের সন্ধানটা পেতে চান। গুমের ঘটনায় তৎকালীন শাখা ছাত্রলীগ নেতা জাপানসহ কয়েকজন জড়িত আছে বলে আমরা মনে করছি।”

শাখা ছাত্রশিবিরের সভাপতি ইউসুব আলী বলেন, “মুকাদ্দাস ও ওয়ালীউল্লাহর পরিবারের প্রতি আমাদের গভীর সমবেদনা। আওয়ামী সরকারের আমলে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু শিক্ষক-কর্মকর্তা ও ছাত্রলীগের সহায়তায় এই দুই মেধাবী ছাত্রনেতাকে গুম করা হয়েছে। জুলাই বিপ্লবের পরও তাঁদের কোনো সন্ধান দিতে না পারা রাষ্ট্রীয় প্রশাসনের চরম ব্যর্থতা। অনতিবিলম্বে এ গুমের নেপথ্যে থাকা ব্যক্তিদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনতে হবে।”

এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. একেএম মতিনুর রহমানকে একাধিকবার কল দিলেও তিনি ফোন রিসিভ করেন নি।