মূল খবরে ফিরে যান
যা দেখছেন, PDF-এও সেটাই থাকবে। প্রিন্ট ডায়ালগে “Save as PDF” বেছে নিন।
Wednesday, 02 September 2026
অন্যান্য
banglabrief.com/
সংস্করণ
02 September 2026
অন্যান্য

খাবারের দাম আকাশছোঁয়া, বাংলাদেশ-পাকিস্তানে ছোট হচ্ছে মানুষের খাবারের তালিকা

বাজারে খাবার আছে, কিন্তু মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে অনেক প্রয়োজনীয় পণ্য। উৎপাদন খরচ, জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয়, দুর্বল সরবরাহব্যবস্থা এবং বৈশ্বিক বাজারের অস্থিরতায় বাংলাদেশ ও পাকিস্তান—দুই দেশেই খাদ্যপণ্যের দাম সাধারণ মানুষের জন্য বড় চাপ হয়ে উঠেছে।

এক দেশে বাজারের ব্যাগ ছোট হচ্ছে, অন্য দেশে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়ছে দ্রুত। বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের অর্থনৈতিক বাস্তবতা এক নয়, কিন্তু দুই দেশের মানুষের অভিজ্ঞতায় একটি জায়গায় মিল স্পষ্ট—আয় বাড়ার তুলনায় খাবারের খরচ দ্রুত বাড়ছে।

বাংলাদেশে জুলাই ২০২৬-এ খাদ্য মূল্যস্ফীতি কমে ৭.১৬ শতাংশে নেমেছে। জুনে এ হার ছিল ৮.৬০ শতাংশ। মূল্যস্ফীতি কমার অর্থ বাজারদর কমে যাওয়া নয়; বরং আগের তুলনায় দাম বাড়ার গতি কিছুটা কমেছে। ফলে দীর্ঘদিনের উচ্চমূল্যের চাপ এখনো মানুষের সংসার বাজেটে রয়ে গেছে। 

পাকিস্তানেও পরিস্থিতি স্বস্তিদায়ক নয়। দেশটির সাম্প্রতিক সাপ্তাহিক মূল্যসূচকে মুরগি, গমের আটা, দুধ, গরুর মাংসসহ বেশ কিছু প্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বেড়েছে। জ্বালানি ও খাদ্যের বাড়তি খরচ সামগ্রিক জীবনযাত্রার ব্যয়ও বাড়িয়ে দিচ্ছে। 

কেন বাড়ছে খাবারের দাম?

দুই দেশের পরিস্থিতিতে পার্থক্য থাকলেও কয়েকটি কারণ প্রায় একই।

প্রথমত, উৎপাদন খরচ। সার, জ্বালানি, বিদ্যুৎ, শ্রম ও সেচের খরচ বাড়লে কৃষকের উৎপাদন ব্যয়ও বাড়ে। সেই বাড়তি ব্যয় ধাপে ধাপে চলে আসে পাইকারি ও খুচরা বাজারে।

দ্বিতীয়ত, দুর্বল সরবরাহব্যবস্থা। কৃষকের ক্ষেত থেকে ভোক্তার রান্নাঘর পর্যন্ত পণ্য পৌঁছাতে যত বেশি ধাপ ও মধ্যস্বত্বভোগী যুক্ত হয়, ততই বাড়ে পরিবহন, সংরক্ষণ ও বাণিজ্যিক খরচ। বাংলাদেশে দীর্ঘ সরবরাহচক্র ও উচ্চ লজিস্টিকস ব্যয় খাদ্যপণ্যের দামের বড় কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।

এক গবেষণায় দেখা গেছে, উৎপাদন ব্যয়, মধ্যস্বত্বভোগীদের ওপর কৃষকের নির্ভরতা এবং শহরের পাইকারি বাজারে বাজারক্ষমতা—সব মিলিয়ে খাদ্যপণ্যের দাম বাড়ছে এবং এর সবচেয়ে বড় চাপ পড়ছে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের ওপর। 

তৃতীয়ত, আন্তর্জাতিক বাজারের ধাক্কা। খাদ্য, জ্বালানি বা সারের বৈশ্বিক দাম বাড়লে আমদানিনির্ভর দেশগুলোর বাজারেও তার প্রভাব পড়ে। ২০২৬ সালের জুলাইয়ে বিশ্ব খাদ্যপণ্যের দাম তিন বছরের বেশি সময়ের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে উঠেছিল। বৈরী আবহাওয়া, যুদ্ধ ও সরবরাহব্যবস্থার বিঘ্নকে এর অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা।

দাম বাড়লে বদলে যায় খাবারের তালিকা

খাদ্যের দাম বাড়ার সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ে পরিবারের খাবারের টেবিলে।

আয় একই থাকলে বাড়তি বাজার খরচ সামলাতে মানুষ সাধারণত কম পরিমাণে কেনে, তুলনামূলক সস্তা পণ্য বেছে নেয় কিংবা কিছু খাবার বাদ দেয়। মাংস, মাছ, দুধ, ডিম বা ফলের মতো পুষ্টিকর খাবারের বদলে কম দামের বিকল্প বেছে নেওয়ার প্রবণতা বাড়তে পারে।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। সিপিডির সাম্প্রতিক বিশ্লেষণ বলছে, দেশের ৬০ শতাংশের বেশি পরিবার তাদের আয়ের অন্তত অর্ধেক খাবারের পেছনে ব্যয় করে। ফলে খাদ্যের দাম বাড়লে সঞ্চয়, শিক্ষা, চিকিৎসা কিংবা অন্যান্য প্রয়োজনীয় খাতে ব্যয় কমানোর চাপ তৈরি হয়।

অর্থাৎ, খাদ্য মূল্যস্ফীতির আসল সংকট শুধু বাজারদর নয়—মানুষ কতটা পুষ্টিকর খাবার কিনতে পারছে, সেটিও।

সমাধান শুধু বাজারে অভিযান নয়

খাদ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে সাময়িক বাজার অভিযান বা ভর্তুকি কিছুটা স্বস্তি দিতে পারে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে প্রয়োজন উৎপাদন খরচ কমানো, কৃষকের ন্যায্য দাম নিশ্চিত করা, সংরক্ষণ ও পরিবহনব্যবস্থা উন্নত করা এবং সরবরাহচক্রে অপ্রয়োজনীয় ধাপ কমানো।

একই সঙ্গে মজুতদারি ও বাজার কারসাজি ঠেকাতে কার্যকর নজরদারি এবং প্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যের আমদানি-রপ্তানিতে সময়োপযোগী সিদ্ধান্তও জরুরি।

শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের অভিজ্ঞতা একটি গুরুত্বপূর্ণ সত্য সামনে আনে—বাজারে খাবার থাকলেই খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত হয় না। মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে পুষ্টিকর খাবার পৌঁছানোই আসল চ্যালেঞ্জ।

কারণ দাম যদি আয়ের চেয়ে দ্রুত বাড়তে থাকে, তাহলে প্রথমে ছোট হয় বাজারের ব্যাগ, তারপর খাবারের তালিকা। আর সেই ছোট হতে থাকা তালিকাই বলে দেয়—একটি পরিবারের ক্রয়ক্ষমতা কতটা চাপে আছে।