মূল খবরে ফিরে যান
যা দেখছেন, PDF-এও সেটাই থাকবে। প্রিন্ট ডায়ালগে “Save as PDF” বেছে নিন।
Thursday, 03 September 2026
অন্যান্য
banglabrief.com/
সংস্করণ
03 September 2026
অন্যান্য

দুর্নীতির বরপুত্র ডিএফও মোস্তাফিজ!

বান্দরবানের লামা বন বিভাগে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে গত এক বছরে বদলে গেছে গোটা প্রশাসনিক চিত্র। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) হিসেবে যোগ দেওয়া মোস্তাফিজুর রহমানের অধীনে গড়ে উঠেছে এমন এক ব্যবস্থা, যেখানে ইটভাটা থেকে জোত পারমিট, চেক স্টেশন থেকে রেঞ্জ অফিস- প্রতিটি খাতেই বাঁধা আছে মাসোহারার অঙ্ক।

অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, এই ব্যবস্থার শীর্ষে যেমন আছেন ডিএফও নিজে, তেমনি এর ছায়া গিয়ে ঠেকেছে চট্টগ্রাম অঞ্চলের উপ বন সংরক্ষক এম এ হাসান পর্যন্ত।

চট্টগ্রাম অঞ্চলের উপ বন সংরক্ষক এম এ হাসানের সঙ্গে ডিএফও মোস্তাফিজুর রহমানের ব্যক্তিগত সখ্যের অভিযোগও উঠে এসেছে এই অনুসন্ধানে।

বিভাগের একাধিক কর্মকর্তার ভাষ্য, এই ঘনিষ্ঠতার কারণেই প্রশাসনিকভাবে তদারকির দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তার কাছ থেকে ডিএফওকে কখনো জবাবদিহির মুখে পড়তে হয়নি। ফলে কোনো প্রতিরোধ বা নিয়ন্ত্রণ ছাড়াই বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন মোস্তাফিজুর রহমান, আর তার অধীনে দুর্নীতির মাত্রা বেড়েছে চক্রবৃদ্ধি হারে।

বন বিভাগের এক কর্মকর্তার ভাষ্য, উপরে যখন প্রশ্ন তোলার কেউ নেই, তখন নিচে জবাবদিহি চাওয়ারও উপায় থাকে না। এইসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন উপ বন সংরক্ষক এম এ হাসান।

লামা বন বিভাগের অধীনে রয়েছে লামা, তৈন, মাতামুহুরী, সাঙ্গু, নাইক্ষ্যংছড়ি ও ডলুছড়ি- এই ছয়টি রেঞ্জ। অনুসন্ধান বলছে, দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই ডিএফও মোস্তাফিজুর রহমান অসাধু অধস্তন কর্মকর্তাদের নিয়ে গড়ে তোলেন একটি সুসংগঠিত চক্র, যার কাজ ছিল একাধিক খাত থেকে নিয়মিত মাসোহারা তুলে আনা।

লামা মুখ চেক স্টেশন থেকে প্রতি মাসে দুই লাখ টাকা এবং আরও পঞ্চাশ হাজার টাকা 'বাজার খরচ' হিসেবে সরাসরি পৌঁছে যায় ডিএফওর হাতে। এমন অভিযোগ স্থানীয় একাধিক সূত্রের।

শুধু তাই নয়, ছয়টি রেঞ্জের প্রতিটি থেকে মাসে এক থেকে দুই লাখ টাকা আদায়ের অভিযোগও রয়েছে। এর বাইরে বৈধ-অবৈধ মিলিয়ে ৪৯টি ইটভাটা থেকে মাসে ৫০ হাজার টাকা করে তোলার দায়িত্বে আছে বিভাগেরই একটি চক্র, যারা কয়েকজন ডেপুটি রেঞ্জারের মাধ্যমে ভাটাগুলোতে জ্বালানি কাঠ সরবরাহও নিশ্চিত করছে বলে অভিযোগ রয়েছে। বনের গাছ কেটে জ্বালানি কাঠে রূপান্তরের এই প্রক্রিয়ায় সক্রিয় একাধিক চক্র, আর নাইক্ষ্যংছড়ির ভাটাগুলোতে অবাধে কাঠ সরবরাহ চলছে খোদ লামা বন বিভাগের সহযোগিতায়। এমন অভিযোগ করেছেন স্থানীয় একাধিক কাঠ ব্যবসায়ী।

স্থানীয়দের অভিযোগ, ডিএফও মোস্তাফিজুর রহমান লামায় যোগদানের পর থেকেই জোত পারমিট ও ট্রানজিট পারমিট (টিপি) ইস্যুকে হাতিয়ার বানিয়ে নির্বিচারে সাবাড় করেছেন লামার সংরক্ষিত বন। অনেক ক্ষেত্রে বাস্তবে কোনো বাগানই নেই, অথচ কাগজে-কলমে ভুয়া জোত তৈরি করে সেই 'ভূতুড়ে' পারমিটের বিপরীতেই বৈধতা দেওয়া হয়েছে রিজার্ভ বনের কাঠ পাচারকে।

স্থানীয়দের ভাষ্য, এটি নিছক অনিয়ম নয়- চাকরিজীবনের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে একরকম পরিকল্পিত 'শেষ বাজি' হিসেবেই সর্বোচ্চ মুনাফা তুলে নিতে নেমেছেন তিনি।

একাধিক স্থানীয় বাসিন্দা ও কাঠ ব্যবসায়ীর দাবি, তার দায়িত্ব নেওয়ার এই সময়ের মধ্যেই লামার বনের ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ কাঠ পাচার হয়ে গেছে। কার্যত অর্ধেক বন উজাড় হয়ে গেছে চোখের সামনে, অথচ যার কাঁধে বন রক্ষার দায়িত্ব, তিনিই তার সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগী। এই বিপুল পাচারের বিনিময়ে ডিএফও মোস্তাফিজুর রহমান দুই হাতে কামিয়েছেন কাড়ি কাড়ি টাকা।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ব্যবসায়ী বলেন, 'বনের কাঠ নিয়ে ব্যবসা করতে গেলে শুধু কাঠ কেনা-বেচার হিসাব থাকলে হয় না। পথে কোথায় কত দিতে হবে, সেটাও ব্যবসার হিসাবের মধ্যে রাখতে হয়।' আরেকজনের ভাষ্য, 'যে গাড়ি টাকা দিয়ে লাইন নেয়, সেটি অনেক সময় সহজে চলে যায়। আর কাগজপত্র ঠিক থাকলেও টাকা না দিলে নানা অজুহাতে গাড়ি আটকে দেওয়া হয়।'

স্থানীয় একাধিক ব্যবসায়ীর দাবি, কাঠবাহী ট্রাক ও মাতামুহুরী নদীপথে চোরাই কাঠের নৌকা থেকে 'লাইন' নেওয়ার জন্যও আলাদা চক্র সক্রিয় রয়েছে। নিষিদ্ধ মৌসুমেও চলছে বাঁশ কাটার লাইন। লামা সদর রেঞ্জের লাইনঝিরি ও ইয়াংছা গেটেও প্রতিদিন ছোট-বড় ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে টাকা তোলার অভিযোগ উঠেছে গার্ড দুদু মিয়া, স্টাফ কাসেম ও ফরেস্ট স্টাফ আমিরুল ইসলামের বিরুদ্ধে।

স্থানীয়দের ভাষ্য, প্রতি ভোরে চোরাই গামারি, বেলজিয়াম ও সেগুন কাঠবোঝাই মিনি ট্রাক থেকে গাড়িপ্রতি ৫০০ টাকা করে আদায় হয় এই গেট দুটি দিয়ে, যা নিয়ন্ত্রণ করেন খোদ ডিএফওর লোকজন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বন বিভাগের একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী জানান, ডিএফওর মাসোহারা কাণ্ডে তারা অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছেন। চাহিদা পূরণ না করলে জোটে হুমকি-ধমকি, ফলে অনেকেই স্বেচ্ছায় বদলি হয়ে যেতে চাইছেন অন্য বিভাগে।

জোত পারমিটের আড়ালে পাচার:

লামার ইয়াংছা খালের মাথায় কিয়াংঝিরিতে চকরিয়ার কাকারা ইউনিয়নের কাঠ ব্যবসায়ী নেজামের নামে এক বছর আগে পাঁচ একর বাগানের জোত পারমিট হয়, যাতে প্রায় ২,৮০০টি গাছ কাটার অনুমোদন ছিল।

অভিযোগ আছে, নেজাম মৌখিকভাবে এই জোত ও বদুরঝিরির কাঠের ডিপো হস্তান্তর করেন স্থানীয় হামিদ ও আব্বাস সওদাগরের কাছে। অথচ অনুমোদিত জায়গায় মাত্র ১০০ ঘনফুটের মতো গাছ কাটার চিহ্ন থাকলেও গত এক বছরে বিভিন্ন ডিপো থেকে প্রায় ৩০ ট্রাকের বেশি কাঠ পাচার করা হয়েছে বলে দাবি করেছেন স্থানীয়রা।

স্থানীয় এক জোত মালিক জানান, নেজামের নামে বৈধ পারমিটের আড়ালেই বন বিভাগের কর্মকর্তাদের সহযোগিতায় লাগোয়া রিজার্ভ বাগান থেকে কাঠ পাচার হচ্ছে।

তার ভাষ্য, 'পাঁচ একরের বাগান থেকে কত কাঠ বের হওয়ার কথা, সেটা কাগজে আছে। কিন্তু বাস্তবে কত কাঠ বের হচ্ছে, সেটার হিসাব কেউ মিলিয়ে দেখে না।'

স্থানীয় এক কাঠ ব্যবসায়ীর ভাষ্য, অবৈধভাবে জোত অনুমোদন পেতে গুনতে হয় সাত-আট লাখ টাকা পর্যন্ত, অথচ সরকারি কোষাগারে জমা পড়ে বড়জোর দেড়-দুই লাখ। বাকিটা ভাগ-বাটোয়ারা হয়ে যায় অসাধু কর্মকর্তাদের মধ্যে। নিয়ম অনুযায়ী ভূমি অফিসের কানুনগোর সরেজমিন তদন্তের কথা থাকলেও মোটা অঙ্কের বিনিময়ে অফিসে বসেই তৈরি হয় প্রতিবেদন। আর সব করা হয় ডিএফও মোস্তাফিজের ইশারায়।

অনুসন্ধানে সবচেয়ে বিস্ফোরক তথ্য উঠে এসেছে বিলুপ্তপ্রায় প্রজাতির কাঠ পাচার ঘিরে। যার সুতো গিয়ে ঠেকেছে খোদ চট্টগ্রাম অঞ্চলের শীর্ষ এক কর্মকর্তার কাছে।

অভিযোগ আছে, তারই প্রত্যক্ষ প্রশ্রয়ে লামায় বিশেষ টহল দলের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হিসেবে পদায়ন পান ফরেস্টার এ.কে.এম আলতাফ হোসেন। যিনি একাই সামলাচ্ছেন চারটি গুরুত্বপূর্ণ পদ: বিশেষ টহল দলের প্রধান, চেক স্টেশন ইনচার্জ, বিট কর্মকর্তা ও রেঞ্জ কর্মকর্তা।

বন বিভাগের একাধিক কর্মকর্তার ভাষ্য, এই অস্বাভাবিক দায়িত্বভার এসেছে সিএফের বিশেষ হস্তক্ষেপেই।

ক্ষুব্ধ এক স্থানীয় কাঠ ব্যবসায়ী বলেন, 'ডিএফও থেকে সিএফ পর্যন্ত সবাই ভাগ নেয়। মূল হোতা আলতাফ, আর তার পেছনে সিএফ। তিনি না চাইলে লামায় পাতাও নড়ে না।'

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রেঞ্জার ও ডেপুটি রেঞ্জারের মতো গুরুত্বপূর্ণ তিনটি পদ- একজন ফরেস্ট রেঞ্জার ও দুইজন ডেপুটি রেঞ্জারের পদ ইচ্ছাকৃতভাবে ফাঁকা রেখেছেন ডিএফও মোস্তাফিজুর রহমান। এই তিনটি পদের দায়িত্ব একসঙ্গে চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে তারই আস্থাভাজন ও বিভাগে 'মাইম্যান' হিসেবে পরিচিত ফরেস্টার রনি পারভেজের কাঁধে, যিনি এখন একাই সামলাচ্ছেন পাঁচ-পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। প্রশ্ন উঠেছে, একজন ফরেস্টার পদমর্যাদার কর্মকর্তাকে দিয়ে কেন চালানো হচ্ছে রেঞ্জার ও ডেপুটি রেঞ্জার পর্যায়ের কাজ। নিয়োগবিধি ও প্রশাসনিক শৃঙ্খলার প্রশ্নে যা স্পষ্টতই ব্যতিক্রমী।

বন বিভাগের একাধিক কর্মকর্তার অভিযোগ, এই বিন্যাস কোনো প্রশাসনিক প্রয়োজনে নয়- বরং সুপরিকল্পিতভাবেই সাজানো। যোগ্য ও জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের পাশ কাটিয়ে রনি পারভেজকে একচ্ছত্র ক্ষমতায় বসিয়ে দেওয়ার পেছনে কাজ করছে সুনির্দিষ্ট স্বার্থ- কারণ একজনের হাতে দায়িত্ব কেন্দ্রীভূত থাকলে জবাবদিহির জায়গা যেমন সংকুচিত হয়, তেমনি সহজ হয় নিয়ন্ত্রণ।

অভিযোগকারীদের ভাষ্য, রনি পারভেজের মাধ্যমেই জোত পারমিট, কাঠ পরিবহনের অনুমতি, চেক স্টেশনের তদারকি ও জব্দ-প্রক্রিয়া- প্রতিটি সংবেদনশীল ক্ষেত্র নিয়ন্ত্রণ করছেন ডিএফও মোস্তাফিজুর রহমান নিজেই, আর এই কাঠামোর আড়ালে ছয় রেঞ্জ ও একাধিক ইটভাটা-কাঠচক্র থেকে গড়ে উঠেছে কোটি কোটি টাকার লুটপাটের বন্দোবস্ত।

একাধিক সূত্রের দাবি, রনি পারভেজ কার্যত ডিএফওর 'প্রক্সি' হিসেবে কাজ করেন। সিদ্ধান্ত নেন ওপর থেকে, বাস্তবায়ন হয় তার হাত দিয়ে, আর দায় এড়ানোর সুযোগ থেকে যায় সবার শীর্ষে বসা কর্মকর্তার জন্য।

গত বছরের ১৩ জুন ডলুছড়ি রেঞ্জের শিলের ঝিরি এলাকা থেকে জব্দ করা বিলুপ্তপ্রায় প্রজাতির কাঠ ও যানবাহন পরে গোপনে ছেড়ে দেওয়া হয়। ডিএফও মোস্তাফিজুর রহমানের ইঙ্গিতেই ওসি আলতাফ হোসেন কাঠ ও গাড়ি ছেড়ে দেন। বিশ্বস্ত সূত্রমতে, সংশ্লিষ্ট দুই কর্মকর্তা এ বাবদ ঘুষ নেন দুই লাখ ২০ হাজার টাকা, যার একাংশ পৌঁছায় উপর মহলের কাছেও।

লামা বন বিভাগে ঘুষের এই কাঠামো কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং একটি স্তরে-স্তরে বিন্যস্ত ব্যবস্থা, যার প্রতিটি ধাপে অংশ পায় গার্ড থেকে শুরু করে চট্টগ্রাম অঞ্চলের সিএফ পর্যন্ত প্রশাসনের বিভিন্ন স্তর। ডিএফও মোস্তাফিজুর রহমান যেখানে স্থানীয় মাসোহারা কাঠামোর কেন্দ্রবিন্দু, সেখানে বিলুপ্তপ্রায় প্রজাতির কাঠ পাচারের সিন্ডিকেট প্রসারিত হয়েছে আরও উঁচু স্তর পর্যন্ত। লামার সংরক্ষিত বনভূমি যে হারে উজাড় হচ্ছে, তাতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কি আদৌ এই সিন্ডিকেট ভাঙতে প্রস্তুত, নাকি দুর্নীতিই থেকে যাবে লামা বন বিভাগের অলিখিত নীতি হয়ে? এমনটাই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এবিষয়ে জানতে অভিযুক্ত ডিএফও মোস্তাফিজুর রহমানের সাথে একাধিকবার যোগাযোগ চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি।

চট্টগ্রামের উপ বন সংরক্ষক এম এ হাসান বলেন, তার বিরুদ্ধে তদন্তে যা উঠে আসবে, সেটিই কতৃপক্ষকে পাঠিয়ে দেওয়া হবে।

বন অধিদপ্তরের এক সহকারী প্রধান বন সংরক্ষক বলেন, তার বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।