11 September 2026
কৃষক দল নেতার আচরণে অতিষ্ঠ, ছাড়পত্র নিয়ে স্কুল ছাড়ছেন শিক্ষার্থীরা

কক্সবাজারের মহেশখালী উপজেলার কালারমারছড়া উচ্চ বিদ্যালয়ে একের পর এক ছাড়পত্র নিয়ে চলে যাচ্ছে শিক্ষার্থীরা। বিদ্যালয়ের অভিভাবক সদস্য ও কালারমারছড়া ইউনিয়ন কৃষক দলের সভাপতি শামসুল আলমের আচরণে অতিষ্ঠ হয়ে বাধ্য হয়েই তারা এই সিদ্ধান্ত নিচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
গত সোমবার নবম শ্রেণির বাণিজ্য বিভাগের দুই শিক্ষার্থী ছাড়পত্র নিয়েছে। বুধবার একই শ্রেণির আরও তিনজন ছাড়পত্রের জন্য যোগাযোগ করলেও বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তা দেয়নি। তবে ছাড়পত্র ছাড়াই নবম শ্রেণির আরেক শিক্ষার্থী বুধবার একটি ভিন্ন উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছে।
বিষয়টি জানার পর উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা বিদ্যালয় পরিদর্শন করে প্রধান শিক্ষককে লিখিতভাবে কারণ দর্শানোর নির্দেশ দিয়েছেন।
স্কুল কর্তৃপক্ষ, ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাত দিয়ে জানা গেছে, গত রোববার টিফিন পিরিয়ডে নবম শ্রেণির পাঁচ শিক্ষার্থীসহ কয়েকজন বিদ্যালয় সংলগ্ন একটি প্রাইভেট সেন্টারে খেতে যায়। সে সময় বাইরের চারজন ছেলে সেখানে প্রবেশের চেষ্টা করলে শিক্ষার্থীরা বাধা দেয়। এরপর তাদের একজন তার চাচা, বিদ্যালয়ের অভিভাবক সদস্য ও কৃষক দল নেতা শামসুল আলমকে ডেকে আনে।
ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীদের ভাষ্য, শামসুল আলম এসেই তাদের অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করেন এবং পরে প্রধান শিক্ষকের কক্ষে নিয়ে যান। সেখানে অভিভাবকদের ডেকে শিক্ষার্থীদের চরিত্র নিয়ে কটূক্তি করা হয়, প্রতিবাদ করলে স্কুল থেকে বের করে দেওয়া ও পরিবারের ক্ষতি করার হুমকিও দেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
শিক্ষার্থীরা বলছে, 'আমাদের স্কুলের খাবার পানি ব্যবহার অনুপযোগী এবং খাবারের জন্য আলাদা কোনো জায়গা নেই। কোচিং সেন্টারটি স্কুল থেকে মাত্র দুই-তিন মিনিটের পথ, তাই সেখানে গিয়েছিলাম।'
তাদের দাবি, ফেরার আগেই ওই নেতা সেখানে পৌঁছে কোনো কিছু জিজ্ঞাসা না করেই তাদের অভিভাবকদের সামনে অপমান করেন।
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, তাদের ক্লাসের ছয়জন সহপাঠী প্রায়ই তাদের উত্ত্যক্ত করত, পথ আটকাত এবং কুপ্রস্তাব দিত- আর তিনজন সহপাঠী তাদের পক্ষে সাফাই গাইত। এ নিয়ে লিখিত অভিযোগও করা হয়েছিল প্রধান শিক্ষকের কাছে। অভিযুক্তদের মধ্যে দুজন সেই অভিভাবক সদস্যের আত্মীয় বলে জানায় তারা।
অভিযোগকারী এক শিক্ষার্থী বলে, 'অভিযুক্তদের প্রধান শিক্ষকের কক্ষে ডেকে সামান্য বকাঝকা করে ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তারা সেখান থেকে বেরিয়েই আমাদের চরিত্র নষ্ট করার, হেনস্তা করার এবং স্কুল থেকে বের করে দেওয়ার হুমকি দেয়।'
শামসুল আলম গালিগালাজ ও হুমকির অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, স্কুল চলাকালে ওই পাঁচ শিক্ষার্থী একটি কোচিং সেন্টারে অবস্থান করছিল বলে শিক্ষক রফিকের কাছ থেকে খবর পেয়ে তিনি সেখানে যান। সেখানে কোনো শিক্ষককে না পেয়ে শিক্ষার্থীদের নিয়ে স্কুলে ফেরেন এবং প্রধান শিক্ষকের মাধ্যমে অভিভাবকদের খবর পাঠান।
তার ভাষ্য, অভিভাবকদের সন্তানদের নজরে রাখার পরামর্শ দিয়েছি, শিক্ষার্থীদের একটু শাসন করেছি। এর বাইরে কিছুই ঘটেনি।
শিক্ষার্থীরা কেন ছাড়পত্র নিচ্ছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এর কারণ তার জানা নেই। বিদ্যালয়ে পড়ুয়া সবাইকে নিজের আত্মীয় বা সন্তানের মতো দাবি করে তিনি বলেন, আগের অভিযোগের বিচার হয়ে গেছে। অভিযুক্ত শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যতে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছিল।
ছাড়পত্র নেওয়া এক শিক্ষার্থীর অভিভাবক জানান, রোববারের ঘটনার পর তিনি দুই দিন স্কুলে গিয়ে প্রধান শিক্ষককে ব্যবস্থা নিতে বলেন, কিন্তু তিনি অপারগতা প্রকাশ করেন। ঘটনার বিবরণ লিখিতভাবে দিতে বললেও তা দেওয়া হয়নি। শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা দেওয়া সম্ভব কি না জানতে চাইলে প্রধান শিক্ষক সরাসরি জানিয়ে দেন, তা সম্ভব নয়। এরপরই তারা ছাড়পত্রের জন্য আবেদন করেন।
আরেক অভিভাবক বলেন, ওই স্কুলে যে পরিবেশ, সেখানে ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া করানোর অবস্থা নেই, নিরাপত্তাও নেই।
তিনি জানান, তার মেয়ে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছে এবং ওই স্কুলে আর পড়তে চাইছে না।
বিদ্যালয় কমিটির সভাপতি আবু হেনা মোস্তফা বলেন, স্কুল সময়ে কোচিংয়ে থাকার কারণে শিক্ষার্থীদের ডেকে অভিভাবকদের খবর দেওয়া হয়েছিল, তবে গালমন্দের বিষয়ে তিনি অবগত নন। কোচিং সেন্টারের শিক্ষক শাকের উল্লাহ দাবি করেন, তিনি কখনো স্কুল সময়ে প্রাইভেট পড়াননি; প্রমাণ পেলে যেকোনো শাস্তি মেনে নেবেন বলে জানান।
প্রধান শিক্ষক প্রিয়তোষ পাল বলেন, আগে ছাড়পত্র পাওয়া দুই শিক্ষার্থী এর আগে বিদ্যালয়ের নয়জন শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছিল। রোববারের ঘটনার পর তারা ছাড়পত্র চাইলে ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে তিনি তা দেন। তবে আরও শিক্ষার্থী ছাড়পত্র চাইবে, তা তার ধারণার বাইরে ছিল বলে জানান। গতকাল তিনজন ছাড়পত্রের জন্য এলে অভিভাবকদের বোঝানোর চেষ্টা করে তিনি ছাড়পত্র দেননি।
তিনি বলেন, আপনারাসহ অভিভাবকদের একটু বোঝান। ভবিষ্যতে এমন ঘটনা ঘটবে না, আমি কথা দিচ্ছি।
মহেশখালী উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোহাম্মদ জাহিদুর রহমান বলেন, খবর পেয়ে তিনি বিদ্যালয় পরিদর্শন করেছেন এবং প্রধান শিক্ষককে দুই দিনের মধ্যে লিখিতভাবে কারণ দর্শাতে বলেছেন। তিনি প্রশ্ন তোলেন, ম্যানেজিং কমিটির সিদ্ধান্ত ছাড়া প্রধান শিক্ষক কীভাবে ছাড়পত্র দিলেন। স্কুল ক্যান্টিন না থাকলে শিক্ষার্থীরা বাইরে যাবে- এটিও তাকে জানানো হয়েছে বলে জানান তিনি।
তার ভাষ্য, কোনো অভিভাবক সদস্য বা অন্য কেউ কোনো শিক্ষার্থীকে টিফিন পিরিয়ড বা অন্য যেকোনো সময় এভাবে নাজেহাল করতে পারেন না।
মহেশখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ইমরান মাহমুদ ডালিম জানান, ঘটনা শোনার পর মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তাকে প্রধান করে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে এবং দ্রুত প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
