23 September 2026
হাওরের বুকেই সম্ভাবনার নতুন ঠিকানা খালিয়াজুরী

বর্ষায় চারদিকে অথৈ জলরাশি, দিগন্তজুড়ে ঢেউ, নৌকার চলাচল আর পানির বুকে সূর্যোদয়-সূর্যাস্তের অপরূপ দৃশ্য। শরৎ পেরিয়ে হেমন্ত এলে সেই জলরাশি সরে গিয়ে জেগে ওঠে বিস্তীর্ণ সবুজ ও সোনালি ধানের মাঠ। ঋতু বদলের সঙ্গে প্রকৃতির এমন নাটকীয় রূপান্তর খুব কম জায়গাতেই দেখা যায়। নেত্রকোণার হাওরবেষ্টিত খালিয়াজুরী যেন প্রকৃতির নিজের হাতে আঁকা এমনই এক জল-সবুজ ভূদৃশ্য।
কিন্তু বিপুল প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও পর্যটন সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও এখানে গড়ে ওঠেনি পরিকল্পিত পর্যটন অবকাঠামো। আধুনিক পর্যটনকেন্দ্র, পর্যাপ্ত আবাসন, মানসম্মত খাবার কিংবা নিরাপদ নৌভ্রমণের সুবিধার অভাবে পর্যটন মানচিত্রে এখনো অনেকটাই আড়ালে রয়েছে ভাটির এই জনপদ।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, খালিয়াজুরী উপজেলার আয়তন প্রায় ২৯৭ দশমিক ৬৪ বর্গকিলোমিটার এবং ১৩৪টি হাওরের আয়তন ২৩ হাজার ২৮০ হেক্টর। উপজেলা সদর থেকে নেত্রকোণা জেলা শহরের দূরত্ব সড়কপথে প্রায় ৫৫ কিলোমিটার এবং নদীপথে প্রায় ৯০ কিলোমিটার। যোগাযোগব্যবস্থার বড় অংশই এখনো মৌসুমি বাস্তবতার ওপর নির্ভরশীল।
এই জলভূমিই খালিয়াজুরীর সবচেয়ে বড় পর্যটন সম্পদ। বর্ষায় নৌকায় হাওরের বুক চিরে ভ্রমণ, সূর্যাস্ত দেখা, জ্যোৎস্নারাত উপভোগ কিংবা বিস্তীর্ণ জলরাশির ছবি ধারণ—সবই হতে পারে পর্যটকদের জন্য বিশেষ আকর্ষণ। শুষ্ক মৌসুমে একই ভূদৃশ্য বদলে যায় সবুজ-সোনালি বোরো ধানের মাঠে। হাওরের এই ঋতুভিত্তিক রূপান্তরকে কেন্দ্র করে বছরজুড়ে ভিন্ন স্বাদের পর্যটন ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব।
খালিয়াজুরীর পর্যটন সম্ভাবনার কথা নতুন নয়। সরকারি একটি প্রকাশনায় উপজেলার হেমনগর কান্দায় ২৬ একর খাস জমিতে ‘হেমনগর পর্যটন কেন্দ্র’ গড়ে তোলার উদ্যোগের কথা উল্লেখ করা হয়েছিল। কয়েক বছর আগে পর্যটনকেন্দ্র স্থাপনের জন্য জমি চিহ্নিতকরণ ও প্রকল্প প্রস্তাবের কথাও বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছিল। তবে সেই উদ্যোগের বর্তমান অগ্রগতি বা বাস্তবায়ন পরিস্থিতি নতুন করে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। এছাড়া সরকারি উপজেলা পোর্টালের পর্যটন-সংক্রান্ত তালিকায় ‘পাঁচহাট জামে মসজিদ’ এবং খালিয়াজুরী ইউনিয়নের সরকারি পোর্টালে ‘চানপুর হাসার আখড়া’র নাম রয়েছে। অর্থাৎ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের পাশাপাশি ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যও পর্যটন পরিকল্পনায় যুক্ত করার সুযোগ রয়েছে।
২০২৫ সালে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বর্ষায় খালিয়াজুরীর বিশাল জলরাশিকে সমুদ্রের সঙ্গে তুলনা করে এটিকে ‘হাওরদ্বীপ’ হিসেবে অভিহিত করা হয়। তবে ২০১৭ সালের এক প্রতিবেদনে যোগাযোগ ও আবাসন সংকটকে হাওরাঞ্চলের পর্যটন বিকাশের বড় বাধা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল।
পর্যটন বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এখানে বড় স্থাপনা নির্মাণের বদলে হাওরের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষা করে ইকো-ট্যুরিজমভিত্তিক পর্যটনকেন্দ্র গড়ে তোলা প্রয়োজন। নির্দিষ্ট নৌরুট, নিরাপদ ঘাট, লাইফ জ্যাকেট, ওয়াচ টাওয়ার, হাঁটার পথ, বসার স্থান, পর্যটক তথ্যকেন্দ্র, পরিচ্ছন্ন টয়লেট, স্থানীয় খাবারের রেস্টুরেন্ট, সীমিত আবাসন এবং শিশুদের জন্য নিরাপদ বিনোদন ব্যবস্থা করা যেতে পারে। একই সঙ্গে স্থানীয় যুবকদের প্রশিক্ষণ দিয়ে নৌ-গাইড ও ট্যুর গাইড হিসেবে যুক্ত করা সম্ভব।
তবে পর্যটন উন্নয়নের সঙ্গে হাওরের পরিবেশ ও মৎস্যসম্পদ সংরক্ষণকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। অনিয়ন্ত্রিত নৌযান, প্লাস্টিক বর্জ্য, অতিরিক্ত শব্দ ও অবকাঠামোগত চাপ যাতে হাওরের স্বাভাবিক পরিবেশ নষ্ট না করে, সে বিষয়ে শুরু থেকেই সতর্ক থাকা প্রয়োজন।
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, খালিয়াজুরীর পর্যটন সম্ভাবনা নিয়ে সরকার একটি সমন্বিত সমীক্ষা করবে। হেমনগরসহ সম্ভাবনাময় এলাকাগুলো চিহ্নিত করে ভূমি, যোগাযোগ, পরিবেশ, নৌপথ ও বিনোদন সুবিধাকে এক পরিকল্পনার আওতায় এনে একটি আধুনিক হাওরভিত্তিক পর্যটন অঞ্চল গড়ে তোলা হবে। কারণ খালিয়াজুরীর বড় সম্পদ কোনো কৃত্রিম স্থাপনা নয়, বরং হাওর নিজেই। বর্ষার জলরাশি, শরতের আকাশ, হেমন্তের সোনালি ধান, শীতের অতিথি পাখি আর ভাটির মানুষের জীবন-সংস্কৃতিকে ঘিরে গড়ে উঠতে পারে বাংলাদেশের অনন্য এক পর্যটন অভিজ্ঞতা। প্রয়োজন শুধু প্রকৃতিকে রক্ষা করে পরিকল্পিত উদ্যোগ।
