28 September 2026
ঢাকার আশপাশে শরতের সেরা কাশফুলের ঠিকানা

ইট-কাঠের ব্যস্ত শহর থেকে খুব দূরে না গিয়েও শরতের শুভ্রতা উপভোগ করা যায়। এক বিকেলেই ঘুরে আসতে পারেন ঢাকার আশপাশের কাশবন থেকে।
শরৎ এলেই প্রকৃতির রং বদলে যায়। নীল আকাশে সাদা মেঘের ভেলা, বাতাসে হালকা শীতের আভাস আর মাঠের ধারে মাথা দোলানো কাশফুল জানান দেয়—শরৎ এসেছে।
ঢাকা শহর ও এর আশপাশের বিভিন্ন খোলা মাঠ, নদীর পাড়, চর ও জলাভূমিতে এ সময় দেখা মেলে কাশফুলের। দিয়াবাড়ি, আফতাবনগর, পূর্বাচল, আশুলিয়া, বিরুলিয়া, কেরানীগঞ্জের সারিঘাটসহ কয়েকটি জায়গা হতে পারে এক বিকেলের শরৎভ্রমণের গন্তব্য।
দিয়াবাড়ি—কাশফুলের সঙ্গে লেকের বাতাস
ঢাকার ভেতর থেকেই সহজে যেতে চাইলে দিয়াবাড়ি হতে পারে পরিচিত একটি গন্তব্য। উত্তরা ১৫ ও ১৬ নম্বর সেক্টরের বিস্তীর্ণ খোলা জায়গায় শরৎকালে কাশফুলের দেখা মেলে। কাশবনের পাশে হাঁটা, ছবি তোলা কিংবা পরিবার-বন্ধুদের সঙ্গে কিছুটা সময় কাটানোর সুযোগ রয়েছে। দিয়াবাড়ির বাড়তি আকর্ষণ লেক। দিয়াবাড়ি বটতলা থেকে সামনে ৩ নম্বর সেতুর আশপাশে লেকের পাড়ে নৌকায় ঘোরার সুযোগও রয়েছে।
ফলে কাশফুল দেখা শেষে লেকের পানিতে নৌকাভ্রমণ করে বিকেলটা আরও উপভোগ করা যায়। আশপাশে খাবারের দোকানও রয়েছে।
দিয়াবাড়িতে যেতে মেট্রোরেল ব্যবহার করা সুবিধাজনক। উত্তরা উত্তর বা আশপাশের স্টেশন থেকে স্থানীয় রিকশা বা অন্যান্য যানবাহনে কাশবনের এলাকায় যাওয়া যায়।
আফতাবনগর—শহরের কাছেই শরতের মাঠ
খুব বেশি দূরে যেতে না চাইলে আফতাবনগরও হতে পারে বিকেলের গন্তব্য। রামপুরা সেতুর দিক থেকে আফতাবনগরের ভেতরে গেলে বিভিন্ন খোলা জায়গায় কাশফুলের দেখা পাওয়া যায়। বিকেলের নরম আলোয় কাশফুলের শুভ্রতা আরও সুন্দর হয়ে ওঠে। ফলে ছবি তোলার জন্যও সময়টি বেশ উপযোগী।
তবে এসব খোলা জায়গার অনেকটাই অনির্ধারিত জমি হতে পারে। কোথাও যাওয়ার আগে স্থানীয়দের কাছ থেকে পথ ও নিরাপত্তা সম্পর্কে জেনে নেওয়া ভালো।
পূর্বাচল—তিনশ ফিটের পাশে খোলা আকাশ
শহরের কোলাহল থেকে কিছুটা দূরে গিয়ে খোলা আকাশের নিচে কাশফুল দেখতে চাইলে পূর্বাচল ও তিনশ ফিট এলাকার কথা ভাবা যায়। কুড়িল বিশ্বরোড থেকে তিনশ ফিট সড়ক ধরে পূর্বাচলের দিকে গেলে বিভিন্ন খোলা জায়গায় শরতের দৃশ্য চোখে পড়ে। এই এলাকার বিশেষত্ব হলো বিস্তৃত আকাশ ও খোলা প্রান্তর। কাশফুলের সঙ্গে নীল আকাশ ও সাদা মেঘ মিলে তৈরি করে আলাদা এক শরৎদৃশ্য।
তবে ছবি তোলার সময় রাস্তার নিরাপত্তার বিষয়টি মাথায় রাখা জরুরি। ব্যস্ত সড়কের পাশে বা চলন্ত যানবাহনের কাছাকাছি দাঁড়িয়ে ছবি না তোলাই ভালো।
আশুলিয়া—পথের সঙ্গে প্রকৃতির দেখা
ঢাকার কাছ থেকে একটু দীর্ঘ সময়ের জন্য বের হতে চাইলে আশুলিয়া হতে পারে ভালো বিকল্প। মিরপুর বেড়িবাঁধ হয়ে আশুলিয়ার পথে যেতে যেতে বিভিন্ন খোলা জায়গা, জলাভূমি ও গ্রামীণ পরিবেশের দেখা মেলে। এখানে কাশফুল দেখার সঙ্গে যুক্ত হয় সড়কপথের ভ্রমণও। শহরের ব্যস্ততা পেছনে ফেলে যত এগোনো যায়, ততই বদলে যায় চারপাশের দৃশ্য।
তবে যাত্রার আগে সেদিনের সড়ক পরিস্থিতি জেনে বের হওয়া ভালো।
বিরুলিয়া—কাশফুলের সঙ্গে নৌভ্রমণ
কাশফুল দেখার পাশাপাশি নদীর স্বাদ নিতে চাইলে যেতে পারেন বিরুলিয়ার দিকে। তুরাগ নদীর তীরে হওয়ায় এখানে কাশফুলের সঙ্গে নৌভ্রমণের সুযোগও রয়েছে। বর্ষার পানি থাকলে নদী ও আশপাশের নিচু জমির দৃশ্য আরও সবুজ হয়ে ওঠে। কোথাও নদীর ধারে, কোথাও খোলা জমিতে মাথা তোলে সাদা কাশফুল।
মিরপুর, আশুলিয়া কিংবা আমিনবাজারের দিক থেকে বিরুলিয়ায় যাওয়া যায়। এরপর স্থানীয় রিকশা বা অটোরিকশায় নদীর ঘাটের দিকে যাওয়া সম্ভব।
কেরানীগঞ্জের সারিঘাট—নদী, সবুজ আর সাদা কাশ
ঢাকার খুব কাছেই শহরের ব্যস্ততা থেকে একটু দূরে সময় কাটাতে চাইলে কেরানীগঞ্জের সারিঘাটও হতে পারে গন্তব্য। নদী, সবুজ আর কাশফুল মিলে এখানকার পরিবেশে তৈরি হয় শরতের আলাদা আবহ। বিকেলই এ ধরনের জায়গায় যাওয়ার জন্য আরামদায়ক সময়। রোদ কিছুটা কমে আসে, বাতাসও থাকে তুলনামূলক স্বস্তিদায়ক।
কাশবনে ঢোকার সময় অবশ্যই সতর্ক থাকা উচিত। ফুল ও গাছ নষ্ট না করে নির্দিষ্ট পথ ধরে হাঁটা এবং ছবি তোলাই ভালো।
বসিলা-ওয়াশপুর—অল্প সময়ের ভ্রমণে
খুব বেশি দূরে যেতে না চাইলে মোহাম্মদপুরের বসিলা সেতুর ওপার, ওয়াশপুর ও ঘাটারচরের দিকের খোলা জায়গাগুলোও বিবেচনায় রাখা যায়। নদী ও খোলা জমির আশপাশে কোথাও কোথাও কাশফুলের দেখা মেলে। ফলে অল্প সময়ের জন্য বেরিয়ে পড়ার ক্ষেত্রে এসব এলাকা হতে পারে সহজ গন্তব্য।
তবে এসব জায়গার কিছু অংশ ব্যক্তিমালিকানাধীন জমি, নির্মাণাধীন এলাকা বা অনির্ধারিত খোলা জায়গা হতে পারে। তাই স্থানীয় মানুষের অনুমতি ছাড়া ব্যক্তিগত জমিতে প্রবেশ না করাই ভালো।
কখন যাবেন?
কাশফুলের সৌন্দর্য উপভোগ করতে সময় নির্বাচনও গুরুত্বপূর্ণ। সাধারণত সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি থেকে অক্টোবরের শেষভাগ পর্যন্ত ঢাকার আশপাশে শরতের কাশফুলের দৃশ্য দেখা যেতে পারে। তবে জায়গা ও আবহাওয়াভেদে ফুল ফোটার সময় এবং স্থায়িত্বে পার্থক্য হতে পারে। বৃষ্টিতে কাশফুল নুয়ে যেতে পারে। তাই বের হওয়ার আগে আবহাওয়ার পূর্বাভাস ও স্থানীয় পরিস্থিতি দেখে নেওয়া ভালো। বিকেলের শেষভাগ সাধারণত হাঁটা ও ছবি তোলার জন্য আরামদায়ক।
আর কাশফুল দেখতে গিয়ে ফুল ছেঁড়া, গাছ মাড়ানো কিংবা কাশবন নষ্ট করা থেকে বিরত থাকুন। প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগের সবচেয়ে সুন্দর উপায় হলো সেটিকে অক্ষত রাখা।
শরৎ দীর্ঘস্থায়ী নয়। তাই নীল আকাশ, সাদা মেঘ আর বাতাসে দুলতে থাকা কাশফুলের এই সময়টুকু উপভোগ করতে খুব দূরে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। ঢাকার কাছেই কোনো এক বিকেলে বেরিয়ে পড়ুন। শহরের কোলাহল থেকে কিছুটা দূরে কাশফুলের পাশে দাঁড়িয়ে হয়তো মনে হবে—প্রকৃতি এখনও তার নিজস্ব সৌন্দর্যে আমাদের ডাকছে।
