03 October 2026
সাগর গিলছে একের পর এক গ্রাম

ভাঙা ভিটার ওপর দাঁড়িয়ে সাগরের দিকে তাকিয়ে থাকেন জাফর আলম মাঝি। যেখানে একসময় ছিল তার বসতঘর, উঠান আর পরিবারের ছোট্ট সংসার, সেখানে এখন জোয়ারের পানি এসে আছড়ে পড়ে। কয়েক বছর ধরে চোখের সামনে সাগরের ভাঙন দেখেছেন তিনি। এবার সেই ভাঙন কেড়ে নিয়েছে তার নিজের ঘরটিও। পরিবার নিয়ে এখন এক আত্মীয়ের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন জাফর। কিন্তু সেখানে কতদিন থাকা যাবে, জানেন না।
জাফর আলম বলেন, ‘প্রতিদিন ভাঙা ভিটার ওপর বসে ভাবি, কোথায় আবার ঘর বাঁধব।’
জাফরের মতোই মহেশখালীর মাতারবাড়ীর জেলেপাড়া ও আশপাশের পাঁচ গ্রামের শত শত পরিবার এখন একই অনিশ্চয়তার মধ্যে। চলতি বর্ষা মৌসুমে সাগরের প্রবল ঢেউ ও জোয়ারের পানিতে চার শতাধিক পরিবার গৃহহীন হয়েছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। প্রতিদিন একটু একটু করে সাগরের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে ভাঙন। কোথাও বসতঘরের অর্ধেক সাগরে চলে গেছে, কোথাও ঘরের দেয়াল ঘেঁষে ঢুকছে জোয়ারের পানি।
ভাঙনের সঙ্গে হারিয়ে যাচ্ছে গাছপালা, রাস্তাঘাট ও নলকূপ। ফলে শুধু বসতভিটা হারানোর সংকট নয়, দেখা দিয়েছে নিরাপদ পানি সংগ্রহের সমস্যাও।
সরেজমিনে মাতারবাড়ীর পশ্চিমে সাইরার ডেইল এলাকার জেলেপাড়াসহ আশপাশের কয়েকটি এলাকা ঘুরে দেখা যায়, সাগরের কিনারে দাঁড়িয়ে থাকা অনেক বাড়িই এখন ভাঙনের মুখে। কোনো কোনো বাড়ির একাংশ ইতোমধ্যে সাগরে বিলীন হয়েছে। কোথাও ঘরের পাশে বড় বড় ফাটল। জোয়ারের সময় সেসব ফাটল দিয়ে পানি ঢুকে পড়ে উঠানে।
ভাঙনের সঙ্গে উপড়ে পড়েছে বহু গাছ। কয়েকটি নলকূপও চলে গেছে সাগরের পেটে। যেগুলো টিকে আছে, সেগুলোও জোয়ারের পানিতে ডুবে যায়। ফলে ভাটার সময় কলসি হাতে দূরের নলকূপে ছুটতে হয় স্থানীয়দের।
ফরিদুল আলমের ঘরও সাগরের ভাঙনে হারিয়েছে। পরিবার নিয়ে এখন আশ্রয় নিয়েছেন বোনের বাড়িতে। কিন্তু ঘর হারালেও জীবিকার পথ বদলানোর সুযোগ নেই। মাছ ধরাই তার পরিবারের আয়ের প্রধান উৎস।
অসহায়ত্ব কণ্ঠে ক্ষোভের সঙ্গে ফরিদুল আলম বলেন, ‘পুরো এলাকা ভেঙে গেলেও আমাদের দিকে কারও নজর নেই। পরিবার নিয়ে অন্য গ্রামে বোনের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছি। ঘর না থাকলেও মাছ ধরতে সাগরে যেতে হয়। কিন্তু আগের মতো মাছও পাওয়া যায় না। নতুন জায়গায় জমি কিনে ঘর করার সামর্থ্য আমাদের নেই।’
জেলেপাড়ার বাসিন্দা নুরুল ইসলামের দিন কাটে আরেক দুশ্চিন্তায়। গ্রামের নলকূপগুলো একে একে সাগরে চলে যাওয়ায় খাবার পানি সংগ্রহ করাই কঠিন হয়ে পড়েছে।
তিনি বলেন, ‘ভাটার সময় কলসি নিয়ে নলকূপ থেকে পানি আনতে হয়। জোয়ারের সময় নলকূপটি পানিতে ডুবে যায়। গ্রামের অনেক নলকূপই এখন সাগরে।’
গৃহবধূ আফরোজা খাতুনের বাড়ির অর্ধেকও চলে গেছে সাগরে। বাকি অংশটুকুও জোয়ারের সময় পানিতে ডুবে যায়।
আফরোজা বলেন, ‘আমার বাড়ির অর্ধেক সাগরে চলে গেছে। বাকি অংশেও জোয়ারের সময় পানি ওঠে। কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই। স্বামী অসুস্থ। একমাত্র ছেলে সাগরে মাছ ধরে সংসার চালায়।’
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রাকৃতিকভাবে সাগরের ঢেউ ও পানির উচ্চতা বাড়ার পাশাপাশি গভীর সমুদ্রবন্দরের চ্যানেল খননের জন্য নিয়মিত বালু উত্তোলনের কারণেও ভাঙন বাড়তে পারে।
স্থানীয় তরুণ নুরুল ইসলাম বলেন, মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরের চ্যানেল খননের জন্য নিয়মিত বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। এর প্রভাব ভাঙনের ওপর পড়ছে কি না, তা খতিয়ে দেখা দরকার।
তার আশঙ্কা, জেলেপাড়াসহ আশপাশের গ্রামগুলো আরও ভেঙে গেলে সাগরের ঢেউয়ের সামনে বড় ধরনের প্রাকৃতিক প্রতিরোধ আর থাকবে না।
তিনি বলেন, ‘গ্রামগুলো বিলীন হয়ে গেলে সাগরের ঢেউ সরাসরি বিদ্যুৎকেন্দ্র ও বন্দরের দিকে আঘাত হানতে পারে।’
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) কক্সবাজার জেলা শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক এইচএম নজরুল ইসলাম বলেন, ভাঙনে শুধু মানুষের বসতবাড়িই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে না, ধ্বংস হচ্ছে গাছপালা ও প্রাকৃতিক পরিবেশ। এর প্রভাব স্থানীয় জীববৈচিত্র্য ও জলজ প্রাণীর ওপরও পড়ছে।
তার মতে, মাতারবাড়ী এখন শুধু একটি জনপদের নাম নয়। দেশের বিদ্যুৎ ও বন্দর অবকাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রও এখানে গড়ে উঠেছে। রয়েছে মাতারবাড়ী কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র এবং গভীর সমুদ্রবন্দর।
স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের আশঙ্কা, উপকূলীয় ভাঙন ঠেকানো না গেলে একদিকে যেমন বিপুলসংখ্যক মানুষ বাস্তুচ্যুত হবেন, অন্যদিকে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোও দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
মাতারবাড়ী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আবু হায়দার বলেন, ‘বর্ষা মৌসুমে ভাঙনকবলিত এলাকার বাসিন্দাদের দুর্ভোগের বিষয়টি সংসদ সদস্যসহ ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। ভাঙন অব্যাহত থাকলে কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র ও গভীর সমুদ্রবন্দরের স্থাপনাও ঝুঁকিতে পড়তে পারে। এসব গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা রক্ষায় দ্রুত উদ্যোগ নেওয়া দরকার।’
বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের কক্সবাজার কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী নুরুল ইসলাম বলেন, মাতারবাড়ী ও ধলঘাটায় মোট ৩২ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ রয়েছে। এর মধ্যে ৬ দশমিক ৫ কিলোমিটার অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। আরও প্রায় ১৮ কিলোমিটার বাঁধ সংস্কার প্রয়োজন।
তিনি বলেন, কয়েকটি ঝুঁকিপূর্ণ অংশে জরুরি সংস্কারের অনুমতি পাওয়া গেছে এবং কাজও শুরু হয়েছে। তবে স্থানীয়দের দাবি, বিচ্ছিন্নভাবে সংস্কার নয়, পুরো উপকূলীয় এলাকার জন্য দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। একই সঙ্গে যেসব পরিবার ইতোমধ্যে ঘরবাড়ি হারিয়েছে, তাদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থাও করতে হবে।
কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আবদুল মান্নান বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সমুদ্রে পানির উচ্চতা বাড়ায় এসব এলাকায় ভাঙন দেখা দিয়েছে।
তিনি বলেন, ভাঙন রোধে বেড়িবাঁধ নির্মাণসহ প্রয়োজনীয় প্রকল্পের জন্য পানি উন্নয়ন বোর্ডের মাধ্যমে বিস্তারিত প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) তৈরির কাজ চলছে।
