09 October 2026
সন্দেহের ভিত্তিতে কাউকে বাংলাদেশি বলে তাড়ানো যাবে না

কেবল সন্দেহের ভিত্তিতে কাউকে ‘বাংলাদেশি’ আখ্যা দিয়ে দেশছাড়া করার ক্ষমতা রাজ্য সরকারের নেই বলে মন্তব্য করেছেন কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতি সৌগত ভট্টাচার্য। পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদের এক বাসিন্দাকে আটক রেখে বাংলাদেশে পাঠানোর প্রস্তাব চ্যালেঞ্জ করে করা একটি রিট আবেদনের শুনানিতে তিনি এ পর্যবেক্ষণ দেন।
শুক্রবার (৯ অক্টোবর) ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য টেলিগ্রাফ-এর এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, আবেদনকারীর আইনজীবী আদালতকে জানান, কয়েকজন প্রতিবেশীর বক্তব্যের ভিত্তিতে তৈরি হওয়া সন্দেহের জেরে গত ৮ আগস্ট থেকে তাঁর মক্কেলকে আটক রাখা হয়েছে। ফরেনার্স রিজিওনাল রেজিস্ট্রেশন অফিসের (এফআরআরও) দেশান্তরের নির্দেশ এবং স্বামীর আটকের আদেশ চ্যালেঞ্জ করে তাঁর স্ত্রী হাইকোর্টে রিট আবেদন করেন। ওই ব্যক্তির স্ত্রীকে অবশ্য আটক করা হয়নি।
শুনানিতে বিচারপতি সৌগত ভট্টাচার্য জানান, দেশান্তরের আদেশ আপাতত স্থগিত রাখা হয়েছে। কোনো ব্যক্তির নাগরিকত্ব নির্ধারণের আগে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে তাঁকে নিজের বক্তব্য ও প্রয়োজনীয় নথিপত্র উপস্থাপনের পর্যাপ্ত সুযোগ দিতে হবে।
আদালতের পর্যবেক্ষণ, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ আটক ব্যক্তিকে আত্মপক্ষ সমর্থনের কোনো সুযোগ দিয়েছে বলে মনে হচ্ছে না। এ সময় বিচারপতি প্রশ্ন তোলেন, ওই ব্যক্তিকে কেন দুই মাস ধরে হেফাজতে রাখা হয়েছে এবং তাঁর জাতীয়তা নির্ধারণে কেন একটি সুস্পষ্ট ও যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়নি।
আবেদনকারীর আইনজীবী রবিউল ইসলাম বলেন, তাঁর মক্কেল দুই মাসেরও বেশি সময় ধরে আটক রয়েছেন। কয়েকজন প্রতিবেশীর বক্তব্যের ভিত্তিতে তৈরি হওয়া সন্দেহই তাঁকে আটকের মূল ভিত্তি।
এর পরিপ্রেক্ষিতে বিচারপতি প্রশ্ন করেন, কেবল এ ধরনের তথ্যের ওপর নির্ভর করে কীভাবে একজন ব্যক্তির জাতীয়তা বা নাগরিকত্ব চূড়ান্তভাবে নির্ধারণ করা সম্ভব? তিনি জোর দিয়ে বলেন, যথাযথ আইনগত প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে কাউকে আটক রাখা উচিত নয়।
বিচারপতি আরও প্রশ্ন করেন, ‘১৯৭০-এর দশক থেকে কত মানুষ সীমান্ত অতিক্রম করেছেন? তাঁদের সবাইকে কি ফেরত পাঠানো সম্ভব?’
পরে মামলাটি হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতির কাছে পাঠিয়ে উপযুক্ত বেঞ্চে শুনানির ব্যবস্থা করার অনুরোধ জানান তিনি।
নথিপত্র যাচাইয়ের ওপর গুরুত্ব
বিচারপতি সৌগত ভট্টাচার্য বলেন, কাউকে দেশান্তরের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে তাঁর নথিপত্র যথাযথভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। কয়েকজনের বক্তব্যের ভিত্তিতে কোনো ব্যক্তিকে অনুপ্রবেশকারী হিসেবে চিহ্নিত করা যায় না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
অন্যদিকে, পশ্চিমবঙ্গ সরকারের পক্ষে উপস্থিত অতিরিক্ত অ্যাডভোকেট জেনারেল রাজদীপ মজুমদার যুক্তি দেন, আটক ব্যক্তি জাল বা ভুয়া নথিপত্রের মাধ্যমে ভোটার কার্ড, আধার ও প্যান কার্ডের মতো পরিচয়পত্র সংগ্রহ করে থাকতে পারেন।
বাংলাভাষীদের ‘বাংলাদেশি’ আখ্যা দেওয়ার অভিযোগ
প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৫ সালের মাঝামাঝি সময় থেকে বিজেপিশাসিত কয়েকটি রাজ্যের বিরুদ্ধে বাংলাভাষী মুসলিম পরিযায়ী শ্রমিকদের অবৈধ বাংলাদেশি হিসেবে চিহ্নিত করার অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, আদালত বা ট্রাইব্যুনালের নির্দেশ ছাড়াই তাঁদের বিএসএফের সহায়তায় বাংলাদেশে ঠেলে পাঠানো হয়েছে, যা ‘পুশ-ইন’ নামে পরিচিত।
এ ছাড়া পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি সরকার গঠনের পর ‘ডিটেইন, ডিলিট, ডিপোর্ট’ বা আটক, বাদ দেওয়া ও বিতাড়ন নীতি ঘোষণার বিষয়টিও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, এ নীতির আওতায় সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের হোল্ডিং সেন্টারে আটকে রেখে দ্রুত বাংলাদেশে পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়।
এমন চারজন ভারতীয় নাগরিক—যাঁদের মধ্যে একজন নারী ও দুটি শিশু ছিল—বাংলাদেশে প্রায় এক বছর কাটানোর পর গত জুলাইয়ে আদালতের নির্দেশে মালদার মহদিপুর স্থলবন্দর দিয়ে ভারতে ফিরে আসেন বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়।
ভোটার তালিকা, নাগরিকত্ব ও পরিচয়পত্র নিয়ে ভারতে রাজনৈতিক বিতর্কের মধ্যেই কলকাতা হাইকোর্টের এ পর্যবেক্ষণ সামনে এল। আদালতের বক্তব্যে নাগরিকত্ব নির্ধারণের ক্ষেত্রে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ এবং নথিপত্র যাচাইয়ের গুরুত্ব আবারও উঠে এসেছে।
সূত্র: দ্য টেলিগ্রাফ
