মূল খবরে ফিরে যান
এই প্রিভিউ আর চূড়ান্ত প্রিন্ট/PDF একই লেআউট ব্যবহার করে।
Saturday, 10 October 2026
অন্যান্য
banglabrief.com/
সংস্করণ
09 October 2026
অন্যান্য

গারো পাহাড়ে আটকা পড়েছে প্রায় ১৫০ বন্যহাতি

ময়মনসিংহের গারো পাহাড়ি সীমান্ত এলাকায় ভারতের মেঘালয় রাজ্য থেকে চলে আসা প্রায় ১৫০ টির মতো বন্যহাতির দল দীর্ঘকাল যাবত অবাধে বিচরণ করছে। বিগত ২০০০ সালের দিকে বাংলাদেশের গারো পাহাড়ি এলাকায় ১০/১৫ টি বন্যহাতির আগমন ঘটেছিল। বর্তমানে বংশ বিস্তার করে এর সংখ্যা দাড়িয়েছে প্রায় ১৫০ টির মতো। গারো পাহাড়ে বিচরণ করা এসব বন্যহাতি তাদের ভারতের আদি আবাসস্থলে ফিরতে না পেরে বিগত প্রায় দুই যুগেরও অধিক সময় ধরে শেরপুর ও জামালপুর জেলার গারো পাহাড়ি এলাকায় আটকা পড়ে আছে। ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের কাঁটা তারের বেড়ার গেটগুলো ভারত বন্ধ রাখায় হাতিগুলো ফিরতে পারছে না তাদের আদি নিবাসে।

বন বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ভারতের কাঁটা তারের বেড়ার সাথে সংযুক্ত গেটগুলো খুলে দেওয়ার জন্য বারবার অনুরোধ করা হলেও ভারতীয় কর্তৃপক্ষ তা প্রত্যাখ্যান করেছেন। যার ফলে বন্যহাতিগুলো মেঘালয়ের গহীন বনজঙ্গলে ফিরতে পারছে না। যেখানে তারা সাধারণত বেশিরভাগ সময় থাকতো। এমনকি সেটি তাদের আদি আবাসস্থল।

এই অচলাবস্থার মধ্যে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রী আব্দুল আউয়াল মিন্টু শনিবার (১০ অক্টোবর) শেরপুরের বন্যহাতি অধ্যুষিত গারো পাহাড়ি এলাকা পরিদর্শনে আসছেন।

ঢাকার কেন্দ্রীয় বনাঞ্চলের বন সংরক্ষক এএসএম জহির উদ্দিন আকন গণমাধ্যমকে বলেন, “ভারতের মেঘালয় রাজ্যের অনাবাসিক হাতিগুলো বছরে দুইবার বাংলাদেশে আসত। কিন্তু গত দুই বছরে তারা একবারও ভারতের মেঘালয়ে ফিরতে পারেনি। ভারতীয় কর্তৃপক্ষ ২০০৭ সালে শেরপুর ও জামালপুর জেলার সীমান্তে ৫০ কিলোমিটার কাঁটা তারের বেড়া নির্মাণ করে। পরে হাতিরপাল মাঝে মধ্যে বেড়া ভেঙে ফেলায় কাঁটা তারের বেড়ার সাথে প্রায় ৪৪টি গেট বসানো হয়। বন্যহাতি চলাচলের জন্য নদী ও ছড়ার ওপর ১১টি আন্ডারপাসও তৈরি করা হয়। গত দুই বছর ধরে সব গেট বন্ধ রয়েছে। আন্ডারপাস দিয়ে ভারতে ফেরার চেষ্টা করা হলে বন্যহাতিগুলোকে বাঁধা সৃষ্টি করে তাড়িয়ে আবার বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হয়।

বন বিভাগের হিসাব মতে, বর্তমানে প্রায় ১৫০টি বন্যহাতি গারো পাহাড়ে অবাধে বিচরণ করছে। যার মধ্যে ২৫-৩০টি বাচ্চা হাতি রয়েছে। শেরপুর ও জামালপুরের প্রায় ১২ হাজার হেক্টর বন ও আশপাশের এলাকায় কয়েকটি উপদলে বিভক্ত হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে এসব হাতি। তাদের দীর্ঘ অবস্থান ওই এলাকার কৃষিকাজে মারাত্মক ব্যাঘাত ঘটাচ্ছে। বাংলাদেশের বনাঞ্চলে তেমন খাদ্য না থাকায় এসব বন্যহাতি খাদ্যের সন্ধানে এলাকায় বসবাসকারী মানুষের বাড়িঘরে, আবাদি ফসলের মাঠে আবার কখনো সবজিক্ষেতে হানা দেয়। ক্ষুধার্ত হাতিগুলোকে বাঁধা দিতে গেলে কিংবা ফসল রক্ষা করতে গেলে বন্যহাতি আর মানুষের মাঝে দ্বন্দ্ব তৈরি হয়। হাতি মানুষের দ্বন্দ্বে কখনো হাতি আবার কখনো মানুষ মারা যাচ্ছে। এমতাবস্থায় দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হলেও এর কোন স্থায়ী সমাধান হচ্ছে না। তাছাড়া হাতিগুলো বাংলাদেশ থেকে তাড়া খেয়ে ভারতের দিকে ফেরত যেতে চাইলে ভারতীয়রা ব্যাপক প্রতিরোধ গড়ে তুলে বাঁধা দেয়। যে কারনে অসহায় বন্যহাতিগুলো খাদ্য সংকটে ভুগেও যুগ যুগ ধরে বাংলাদেশে অবস্থান করছে। বেঁচে থাকতে খাদ্যের সন্ধানে হাতিগুলো এলাকার মানুষের বসতবাড়িতে হানা দিয়ে জানমালের ব্যাপক ক্ষতি সাধন করে আসছে। সরকার নির্ধারিত ক্ষতিপূরণ সঠিক সময়ে পাচ্ছে না ক্ষতিগ্রস্থরা। আবার পাহাড়ি এলাকায় বনবিভাগের জমি, খাস জমি ও খ তফসিলভুক্ত জমির ক্ষতিপূরণ পেতে নানা হয়রানির স্বীকার হতে হচ্ছে। তাই ক্ষতিপূরণ পেতে কিছু শর্ত শিথিল করতে সরকারের কাছে জোড় দাবী জানিয়েছেন।

নালিতাবাড়ী উপজেলার নয়াবিল ইউনিয়নের দাওধারা গ্রামের কৃষক আব্দুল হালিম বলেন, গত বোরো মৌসুমে বন্যহাতি তার জমির প্রায় ৪০ মণ পাকা বোরো ধান নষ্ট করে দিয়েছে। তিনি এখনো বন বিভাগ থেকে কোনো ক্ষতিপূরণ পাননি।

একই উপজেলার পোড়াগাঁও ইউনিয়নের বুরুঙ্গা গ্রামের আরেক কৃষক এরশাদ আলম বলেন, বন্যহাতির হামলার ভয়ে গত দুই বছর ধরে মধুটিলা বনাঞ্চলের কাছে তার আড়াই একর জমিতে চাষাবাদ বন্ধ করে রেখেছেন।

বন বিভাগের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ ও ২০২৫-২৬ অর্থবছরে শেরপুরে বন্যহাতির হামলায় অন্তত ৩৫৬টি ঘটনায় ঘরবাড়ি ও ফসলের জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। একইসাথে ৪৩৫ হেক্টর জমির ফসল নষ্ট হয়েছে। এ সময় মানুষ-হাতি দ্বন্দ্বে অন্তত ১০ জন মানুষ ও ৪টি বন্যহাতি মারা গেছে। ঢাকা জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক এমএ আজিজ, যিনি ‘উত্তর বাংলাদেশে বন্যহাতি, সীমান্ত কাঁটা তারের বেড়া নির্মাণ, মানব-হাতি দ্বন্দ্ব ও হাতি সংরক্ষণে দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতার প্রভাব’ শীর্ষক গবেষণার লেখক। তিনি বলেন, “ফসলের ক্ষেতে ঢুকে পড়া হাতিগুলোকে প্রায়ই গ্রামবাসী তাড়া করে। এ সময় তাড়া খেয়ে ভারতের কাঁটা তারের বেড়ার কাছে পৌঁছে আটকা পড়ে যাওয়া হাতিগুলো আরও বেশি উত্তেজিত হয়ে পড়ে।

তিনি আরো বলেন, ‘বাংলাদেশ ও ভারতকে অবশ্যই বাংলাদেশে আটকে পড়া বন্যহাতির সমস্যার সমাধান করতে হবে। হাতিগুলো যাতে অবাধে চলাচল করতে পারে সেজন্য গেট খুলে দিতে হবে। বাংলাদেশ ও ভারত ২০১৭ সালে আন্তঃসীমান্ত হাতি সংরক্ষণ নিয়ে আলোচনা শুরু করে এবং ২০২০ সালের ডিসেম্বরে একটি প্রটোকল স্বাক্ষর করে। এরপর তেমন কোনো কার্যকর অগ্রগতি হয়নি। প্রটোকলটিকে তিনি ‘কাগজে-কলমে দলিল ছাড়া আর কিছুই না’ বলে বর্ণনা করেন। আজিজ বলেন, ‘সব অংশীজনের স্বার্থ নিষ্পত্তি না করে শুধু পাহাড়ি এলাকাটিকে অভয়ারণ্য ঘোষণা করলে কোনো ফল আসবে না।’

এদিকে, মানুষ ও বন্যহাতির দ্বন্দ্ব কমাতে শেরপুর-২ (নকলা-নালিতাবাড়ী) আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ ফাহিম চৌধুরী বন্যহাতির গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করতে বেশ কয়েকটি এআই-ভিত্তিক ক্যামেরা স্থাপনের উদ্যোগ গ্রহন করেছেন।

মোহাম্মদ ফাহিম চৌধুরী সাংবাদিকদের বলেন, “বন্যহাতির আবাসস্থলকে অভয়ারণ্য ঘোষণার জন্য সরকারকে অনুরোধ করা হয়েছে।”

অপরদিকে, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম গনমাধ্যমকে বলেন, বন্যহাতিগুলোর অবাধ চলাচলের জন্য বাংলাদেশ থেকে ভারত সরকারকে চিঠি দেবে।