মূল খবরে ফিরে যান
যা দেখছেন, PDF-এও সেটাই থাকবে। প্রিন্ট ডায়ালগে “Save as PDF” বেছে নিন।
Friday, 16 October 2026
অন্যান্য
banglabrief.com/
সংস্করণ
16 October 2026
অন্যান্য

বিশ্বব্যাংক-আইএমএফের চোখে ফ্যামিলি ও কৃষক কার্ড সরকারের কাযর্করী পদক্ষেপ

কর্মসংস্থান সৃষ্টি, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও দারিদ্র্য কমানোর চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বিএনপি সরকারের নেওয়া ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ড কর্মসূচিকে কার্যকর উদ্যোগ হিসেবে দেখছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও বিশ্বব্যাংক। এ দুই কর্মসূচির মাধ্যমে মূল্যস্ফীতির চাপে ক্ষতিগ্রস্ত দরিদ্র মানুষের দুর্ভোগ কমানো সম্ভব বলে মনে করছে আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগী সংস্থাগুলো।

শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংক গ্রুপের সঙ্গে বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে এসব বিষয় উঠে আসে। ব্যাংককের কুইন সিরিকিত ন্যাশনাল কনভেনশন সেন্টারে (কিউএসএনসিসি) অনুষ্ঠিত বৈঠকে দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, মূল্যস্ফীতি, রাজস্ব আহরণ, ব্যাংকিং খাতের সংস্কার ও কর্মসংস্থান নিয়ে আলোচনা হয়।

প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, দীর্ঘস্থায়ী মূল্যস্ফীতির চাপে দরিদ্র হয়ে পড়া মানুষের দুর্ভোগ কমানো এবং দারিদ্র্য হ্রাসের লক্ষ্যেই ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ড কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। স্বাধীন গবেষণা সংস্থাগুলোর প্রক্ষেপণ অনুযায়ী, ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে দারিদ্র্যের হার ৫ শতাংশ কমতে পারে বলে দাবি করেন তিনি। আইএমএফ, বিশ্বব্যাংক ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকও এ ধরনের কর্মসূচিকে কার্যকর পদ্ধতি হিসেবে বিবেচনা করছে বলে জানান তিনি।

মধ্যপ্রাচ্যের সংকট, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি ও দীর্ঘস্থায়ী মূল্যস্ফীতির প্রভাবে সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে নিম্ন আয়ের মানুষের জীবনযাত্রায় চাপ বেড়েছে উল্লেখ করে তিতুমীর বলেন, এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সরকারের নেওয়া উদ্যোগগুলো বৈঠকে তুলে ধরা হয়েছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, এসব কর্মসূচির মাধ্যমে মানুষের জীবনযাত্রায় স্বস্তি ফিরিয়ে আনা এবং নতুন করে দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যাওয়ার ঝুঁকি কমানোর বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনেও দীর্ঘস্থায়ী মূল্যস্ফীতি ও মধ্যপ্রাচ্যের সংকটের কারণে মানুষের দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে যাওয়ার ঝুঁকির বিষয়টি উঠে এসেছে। আগের সরকারের সময়ে প্রায় ৮০ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে গেছেন বলে দাবি করেন তিনি।

তিতুমীরের অভিযোগ, অতীতের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে উপকারভোগী নির্বাচনে ত্রুটি ছিল। ফলে যাঁদের সহায়তা পাওয়ার কথা, তাঁদের অনেকে বাদ পড়েছেন। বিপরীতে যোগ্য নন, এমন ব্যক্তিদেরও তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এই পরিস্থিতি পরিবর্তনে ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ডকে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচি হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি।

জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি ও জীবনযাত্রার ব্যয় প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর এই উপদেষ্টা বলেন, সাধারণ মানুষের ওপর অতিরিক্ত চাপ এড়াতে সরকার জ্বালানির মূল্য সমন্বয়ের ক্ষেত্রে যথাসম্ভব সংযত থাকার চেষ্টা করেছে। অতীতের মূল্যস্ফীতিতে দরিদ্র হয়ে পড়া মানুষ এবং মধ্যপ্রাচ্যের সংকটে যাঁদের ব্যয় বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে, তাঁদের দুর্ভোগ কমানোই সরকারের লক্ষ্য।

রাজস্ব আহরণ বাড়াতে সংস্কারের উদ্যোগ

রাজস্ব খাত সংস্কার ও কর-জিডিপি অনুপাত বাড়ানোর বিষয়ে আইএমএফের পরামর্শ প্রসঙ্গে তিতুমীর বলেন, সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারেই রাজস্ব আয় বাড়ানোর বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। অতীতে পৃষ্ঠপোষকতার সংস্কৃতি, কর অব্যাহতি ও কর জালিয়াতির কারণে রাজস্ব আহরণ প্রত্যাশিত মাত্রায় বাড়েনি বলে মন্তব্য করেন তিনি।

তাঁর দাবি, এসব সমস্যা মোকাবিলায় সরকার ইতিমধ্যে টাস্কফোর্স গঠন করেছে এবং রাজস্ব আহরণে অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে গত অর্থবছরে ৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছিল উল্লেখ করে তিনি বলেন, বর্তমান সরকার ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি দায়িত্ব নেওয়ার পর ৩০ জুন পর্যন্ত রাজস্ব আয়ে ১২ থেকে ১৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে।

তিতুমীর বলেন, সরকার পৃষ্ঠপোষকতার সংস্কৃতি, কর ফাঁকি ও কর জালিয়াতি থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করছে। তাঁর মতে, কাজের মাধ্যমেই সরকারের প্রতি আস্থা তৈরি করতে হবে।

অতীতের সরকার আইএমএফের কর্মসূচিতে থাকলেও কার্যকর সংস্কার বাস্তবায়ন করেনি বলে অভিযোগ করেন তিনি। সে সময় কর-জিডিপি অনুপাত ছিল ৬ দশমিক ৭ শতাংশ উল্লেখ করে তিতুমীর বলেন, বর্তমান সরকার রাজস্ব আহরণ বাড়াতে কাজ করছে এবং এর ফলও দেখা যাচ্ছে।

অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিয়ে আইএমএফের পূর্বাভাস

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিয়ে আইএমএফের পূর্বাভাসের ব্যাখ্যায় তিতুমীর বলেন, সংস্কার বাস্তবায়ন না হলে অর্থনীতি যে পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে পারে, আইএমএফের প্রক্ষেপণকে সেই প্রেক্ষাপটে বিবেচনা করা প্রয়োজন। তাঁর দাবি, আইএমএফের আর্টিকেল ফোর মিশনের প্রক্ষেপণে ৪ দশমিক ৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধির কথাও উল্লেখ রয়েছে।

তিনি অভিযোগ করেন, অতীতে বিভিন্ন সরকার আইএমএফের কাছে সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিলেও তা বাস্তবায়ন করেনি। ক্ষমতায় টিকে থাকার স্বার্থে পৃষ্ঠপোষকতার সংস্কৃতি বজায় রাখা, কর অব্যাহতি দেওয়া এবং কর ফাঁকির সুযোগ রাখার কারণে সংস্কার বাধাগ্রস্ত হয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

বর্তমান সরকার সরকারি হিসাবের স্বচ্ছতা ও যাচাইযোগ্যতার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে জানিয়ে তিতুমীর বলেন, আইবাসসহ সরকারি ব্যবস্থায় সংরক্ষিত তথ্য যাচাই করা সম্ভব। তাঁর মতে, সংস্কারের বিশ্বাসযোগ্যতা প্রমাণের জন্য শুধু প্রতিশ্রুতি নয়, বাস্তব ফলাফলও দেখাতে হবে।

ব্যাংকিং খাতে আস্থা ফেরানোর চেষ্টা

ব্যাংকিং খাতের সংস্কার প্রসঙ্গে তিতুমীর বলেন, অতীতে ব্যাংক থেকে অর্থ লুটপাটের কারণে সৃষ্ট সংকট মোকাবিলায় প্রায় ৪০ বিলিয়ন ডলার প্রয়োজন হতে পারে। এ সংকটের দায় সাধারণ মানুষ কেন বহন করবে, সে প্রশ্নও তোলেন তিনি।

সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকে আমানতকারীদের আস্থা ফেরানোর উদ্যোগের কথা উল্লেখ করে তিনি দাবি করেন, গত ১ সেপ্টেম্বর থেকে আমানতকারীরা তাঁদের প্রাপ্য অর্থ উত্তোলনের সুযোগ পাচ্ছেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, আস্থা ফেরায় অতিরিক্ত অর্থ উত্তোলনের চাপ কমেছে এবং অনেকে নতুন করে আমানত রাখছেন।

অন্য যেসব ব্যাংকে অনিয়ম ও অর্থ লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে, সেগুলোর বিষয়ে রেজল্যুশন অ্যাক্টের মাধ্যমে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে বলেও জানান তিনি। ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা এবং আমানতকারীদের স্বার্থ সুরক্ষা সরকারের সংস্কার কর্মসূচির অন্যতম অগ্রাধিকার বলে উল্লেখ করেন তিতুমীর।

সরকারের নেওয়া পদক্ষেপের প্রভাব অর্থনৈতিক সূচকেও দেখা যাচ্ছে দাবি করে তিনি বলেন, ট্রেজারি বন্ডের সুদের হার কমছে। তাঁর মতে, এটি ব্যাংকগুলোর স্বাভাবিক কার্যক্রমে ফিরে আসার ইঙ্গিত।

উৎপাদন ও রপ্তানির মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি

দারিদ্র্য কমানো ও ব্যাংকিং খাতের সংকট মোকাবিলার পাশাপাশি কর্মসংস্থান সৃষ্টি সরকারের অর্থনৈতিক কৌশলের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক বলে উল্লেখ করেন তিতুমীর।

তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী উৎপাদন ও রপ্তানি বাড়ানোর লক্ষ্যে ম্যানুফ্যাকচারিং হাব এবং এক্সপোর্ট গেটওয়ে গড়ে তোলার কথা বলেছেন। এসব উদ্যোগের মাধ্যমে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা হবে।

তিতুমীরের মতে, সরকারের অর্থনৈতিক কৌশলের বিশেষত্ব হলো, প্রতিটি ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার নির্ধারণ করা হয়েছে। ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে দারিদ্র্য কমানো, ব্যাংকিং খাতে আস্থা ফিরিয়ে আনা এবং কর্মসংস্থান বাড়ানোর উদ্যোগ একই পরিকল্পনার অংশ।

মধ্যপ্রাচ্যের সংকট ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব সম্পর্কে তিনি বলেন, এসব সংকট বাংলাদেশের তৈরি নয়। তবে এর প্রভাব যাতে সাধারণ মানুষের ওপর কম পড়ে, সে জন্য সরকার কাজ করছে। জ্বালানি, তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) ও সার আমদানির ব্যয়ের পাশাপাশি কৃষক ও পরিবহন খাতের ওপর এর প্রভাবও বিবেচনায় নিতে হচ্ছে।

তিনি বলেন, ‘আমাদের মনে রাখতে হবে, আর কোনো মানুষ যেন দারিদ্র্যসীমার নিচে না চলে যায়।’

প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টার দাবি, অতীতের অর্থনৈতিক সংকট ও ব্যাংকিং খাতের ক্ষতির জন্য বর্তমান সরকার দায়ী না হলেও জনগণের প্রতি দায়িত্ববোধ থেকে এসব সমস্যা মোকাবিলা করা হচ্ছে। ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ডের মাধ্যমে দরিদ্র মানুষের সহায়তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি অর্থনীতির গতি সচল রাখার চেষ্টা চলছে।

তিনি আবারও দাবি করেন, আইএমএফ, বিশ্বব্যাংকসহ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো সামাজিক সুরক্ষায় এ ধরনের কর্মসূচির কার্যকারিতা স্বীকার করছে। দীর্ঘস্থায়ী মূল্যস্ফীতির কারণে দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যাওয়া মানুষকে সেখান থেকে তুলে আনা এবং নতুন করে মানুষের দরিদ্র হয়ে পড়া ঠেকানোই সরকারের প্রধান লক্ষ্য।