মূল খবরে ফিরে যান
যা দেখছেন, PDF-এও সেটাই থাকবে। প্রিন্ট ডায়ালগে “Save as PDF” বেছে নিন।
Saturday, 17 October 2026
অন্যান্য
banglabrief.com/
সংস্করণ
16 October 2026
অন্যান্য

জীবিকার লড়াইয়ে ৭০ বছরেও ঢাক নিয়ে বাদ্য বাজাচ্ছেন গৌরাঙ্গ

৭০ বছর বয়সেও থেমে নেই জীবিকার লড়াই। ঢাকার নবাবগঞ্জ থেকে ৫৫ বছর বয়সী ছোট ভাই নৃত দাসকে সঙ্গে নিয়ে প্রতিবছর দুর্গাপূজার আগে কিশোরগঞ্জের কটিয়াদীর ঐতিহ্যবাহী ঢাকের হাটে আসেন গৌরাঙ্গ মনি দাস। প্রায় ২০ বছর ধরে এই হাটে আসছেন দুই ভাই। তাদের কাছে এটি শুধু ঢাকিদের মিলনমেলা নয়, স্ত্রী-সন্তানদের মুখে খাবার তুলে দেওয়ার আশায় শ্রম বিক্রির জায়গা।

ঢাকের বাদ্যে উৎসবের সুর ছড়ানোর পাশাপাশি এখানে নিজেদের জীবিকার সন্ধান করেন তারা। বায়না মিললে সংসার চলে, আর কাজ না পেলে বাড়ে অনিশ্চয়তা।

বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) কটিয়াদী পৌরসভার পুরানবাজার এলাকায় মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্স মাঠসংলগ্ন ঢাকের হাটে দেখা যায়, দুর্গাপূজার মণ্ডপে বাজনা বাজানোর চুক্তি পেতে দরদাম করছেন বিভিন্ন এলাকার ঢাকি ও বাদ্যযন্ত্র শিল্পীরা। তাদেরই একজন গৌরাঙ্গ মনি দাস। পাশে ছোট ভাই নৃত দাস। দীর্ঘদিন ধরে বাদ্যযন্ত্র বাজানোই তাদের পেশা। প্রতিবছর এই হাটে এসে পূজা আয়োজকদের সঙ্গে দরদাম করেন তাঁরা।

গৌরাঙ্গের সংসারে স্ত্রী, এক ছেলে ও ছয় মেয়ে। অন্যদিকে নৃতের পরিবারে রয়েছেন স্ত্রী ও ছয় মেয়ে। দুই ভাইয়ের উপার্জনের ওপর নির্ভরশীল পরিবারের সদস্যদের জীবনযাপন। তাই দুর্গাপূজার মৌসুমে ভালো বায়না পাওয়া তাদের কাছে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ বলে জানালেন। বড় ভাই গৌরাঙ্গ মনি দাস ঢাকে তাল তোলেন আর ছোট ভাই সেই তালের সুর তোলেন বাঁশিতে।

ঢাকার নবাবগঞ্জের কলাকোপা-বান্দুরার বাসিন্দা গৌরাঙ্গ মনি দাস জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমরা দুই ভাই প্রায় ২২ বছর ধরে কটিয়াদীর ঢাকের হাটে আসছি। আগে এখানে ঢাকিদের চাহিদা বেশি ছিল। এখন সাউন্ড সিস্টেমের ব্যবহার বেড়ে যাওয়ায় ঢাকের চাহিদা কিছুটা কমেছে। বর্তমানে দলভেদে ১৮-২৫ হাজার টাকা পর্যন্ত বায়না হচ্ছে। আগে ১৪-১৫ হাজার টাকায় যে বায়না হতো, এখন তা বেড়ে ২০-২২ হাজার টাকা পর্যন্ত হয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘আমার বয়স এখন ৭০ বছর। এই বয়সেও বাদ্য বাজিয়েই খেতে হচ্ছে। সংসারে স্ত্রী, এক ছেলে ও ছয় মেয়ে। ছেলে মনি দাস কাতারে থাকে। সে এই পেশায় আসেনি। তাই এখনো নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী ঢাক বাজিয়ে সংসার চালাতে হচ্ছে। এ থেকে যা আয় হয় তা দিয়ে কোনোভাবে সংসার চলে।’

দুর্গাপূজার মৌসুম ছাড়াও তারা বাদ্য বাজানোর কাজ করেন বলে জানালেন এ দুই ভাই। গৌরাঙ্গ মনি দাস বলেন, ‘আমাদের এলাকায় ব্যান্ড পার্টি আছে। কার্তিক মাসের পর খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের বিভিন্ন অনুষ্ঠানেও বাজনা বাজাই। পাশাপাশি অন্য কাজ ও ব্যবসা করতে হয়।’

ছোট ভাই নৃত্য দাস বলেন, ‘প্রতিবছরই আমরা দুই ভাই একসঙ্গে কটিয়াদীর ঐতিহ্যবাহী ঢাকের হাটে আসি। আমার বড় ভাই ঢাক বাজান, আর আমি বাঁশি বাজাই। দুই ভাই মিলে বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে মানুষের মন জয় করার চেষ্টা করি। দুর্গাপূজার মৌসুমে এই হাট আমাদের কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এখানে এসে বিভিন্ন পূজামণ্ডপের আয়োজকদের সামনে নিজেদের বাজনা পরিবেশন করি, যাতে তারা আমাদের পছন্দ করে বায়না করেন। বায়না পেলে দুই ভাই মিলে পূজামণ্ডপে বাজনা বাজাতে যাই।’

তিনি বলেন, ‘এই আয় থেকেই আমাদের সংসারের খরচ চলে। দুই ভাইয়ের এই একসঙ্গে বাজনা বাজানো শুধু আমাদের পেশা নয়, এটি আমাদের ভালোবাসা ও জীবিকারও অংশ। যত দিন পারব, তত দিন এই পেশার সঙ্গে থাকতে চাই।’

কাপাসিয়ার বাসিন্দা সুমন চন্দ্র মনি দাস জাগো নিউজকে বলেন, ‘প্রতিবছরই কটিয়াদীর ঢাকের হাটে আসি। এখানকার পরিবেশ ও ব্যবস্থাপনা ভালো। এ হাট থেকে ভালো বায়না পাওয়া যায় বলেই বারবার আসি।’

তিনি বলেন, ‘গতবছর ছয়জন মিলে ৮০ হাজার টাকায় বায়না পেয়েছিলাম। এবার ৯০ হাজার টাকা পেলে যেতে রাজি আছি। দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে ঢাকিরা এখানে আসেন। সবমিলিয়ে হাটটি বেশ ভালো।’

কিশোরগঞ্জ শহরের বাসিন্দা গৌরাঙ্গ চন্দ্র বর্মণ। তিনিও এবার হাটে এসেছেন। আলাপকালে তিনি বলেন, ‘এবার অন্য বছরের তুলনায় ঢাকিদের বায়নার দাম অনেক বেশি। যারা ভালো বাজাতে পারেন, তাদের চাহিদাও বেশি। সবকিছুর দাম বাড়ায় ঢাকিদের পারিশ্রমিকও বেড়েছে। আমার ভাগনে ২৫ হাজার টাকা চেয়েছে, আমি ২০ হাজার টাকা বলেছি। এখনো দরদাম মেলেনি। তবে পূজার আয়োজন তো করতেই হবে। তাই কিছুটা বেশি টাকা লাগলেও শেষ পর্যন্ত ঢাকি নিতে হবে।’

গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়া উপজেলার বনগ্রামের বাসিন্দা উত্তম কুমার সেন পেশায় হেলথ ইন্সপেক্টর। তিনি বলেন, ‘আমাদের ইউনিয়নে এবার আটটি সার্বজনীন দুর্গাপূজা হচ্ছে। এর মধ্যে সাতটির ঢাকির বায়না হয়ে গেছে। আরেকটির জন্য ঢাকি নিতে এসেছি।’

উত্তম কুমার বলেন, ‘কটিয়াদীর ঢাকের হাট প্রায় ৫০০ বছরের ঐতিহ্য। এখান থেকে ঢাকি নিতে পারলে অন্যরকম আনন্দ পাই। গতবছর ১৭ হাজার টাকায় দুটি ঢাক ও একটি ঢোল নিয়েছিলাম। এবার একটি দলের জন্য ১৮ হাজার টাকা দিতে হয়েছে। বাজনার প্রতি ভালোবাসা থেকে কিছু টাকা বেশি দিতে হলেও আপত্তি নেই। আমরা চাই, ঢাকিরাও ভালো পারিশ্রমিক পেয়ে খুশি মনে ফিরে যাক।’

কটিয়াদী উপজেলা পূজা উদযাপন ফ্রন্টের সভাপতি দিলীপ কুমার সাহা বলেন, ‘শারদীয় দুর্গাপূজা সুষ্ঠু, শান্তিপূর্ণ ও নির্বিঘ্নে উদযাপনে সার্বিক নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। পূজামণ্ডপে পূজারি, ভক্ত ও দর্শনার্থীদের নির্বিঘ্নে অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট সবার সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করা হচ্ছে।’

কটিয়াদী মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. রফিকুল ইসলাম জানান, ঢাকের হাটের নিরাপত্তায় পুলিশের একটি মোবাইল টিম কাজ করছে। সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

কিশোরগঞ্জ-২ আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট মো. জালাল উদ্দিন বলেন, ‘ঐতিহ্যবাহী কটিয়াদীর ঢাকের হাটের পরিবেশ উন্নয়ন ও ঢাকিদের সুযোগ-সুবিধা বাড়াতে উদ্যোগ নেওয়া হবে। তাদের জন্য শৌচাগার ও থাকার শেড নির্মাণের ব্যবস্থাও করা হবে।

তিনি আরও জানান, দুর্গাপূজায় মণ্ডপপ্রতি চালের বরাদ্দ ৫০০ থেকে বাড়িয়ে ৬০০ কেজি করা হয়েছে। সনাতন ধর্মাবলম্বী নারীদের মধ্যে বিতরণের জন্য বরাদ্দ পাওয়া ৩০০টি শাড়ির মধ্যে ২০০টি কটিয়াদী ও ১০০টি পাকুন্দিয়ায় বিতরণ করা হবে।