মূল খবরে ফিরে যান
এই প্রিভিউ আর চূড়ান্ত প্রিন্ট/PDF একই লেআউট ব্যবহার করে।
Wednesday, 21 October 2026
অন্যান্য
banglabrief.com/
সংস্করণ
21 October 2026
অন্যান্য

সাগরের জলে প্রতিমা বিসর্জন, তীরে সম্প্রীতির মেলা

সৈকতে লাখো মানুষের উপস্থিতি কক্সবাজারে প্রতিমা বিসর্জন যেন সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির মহামিলন সায়ীদ আলমগীর, কক্সবাজার দিগন্তজোড়া সমুদ্র। তীরে মানুষের ঢল। কারও হাতে মোবাইল ফোন, কেউ ব্যস্ত প্রিয় মুহূর্তটি ক্যামেরাবন্দী করতে। আবার কেউ দুই হাত জোড় করে শেষবারের মতো প্রণাম জানাচ্ছেন দেবী দুর্গাকে। ঢাকের বাদ্য, শঙ্খধ্বনি আর মানুষের উচ্ছ্বাসে মুখর সৈকত। প্রতিমা নিয়ে একের পর এক শোভাযাত্রা এগিয়ে যাচ্ছে সমুদ্রের দিকে। ধর্মীয় আচার পালনের পাশাপাশি সেখানে মিলেছে নানা ধর্মের মানুষের উপস্থিতি।

বুধবার (২১ অক্টোবর) বিকেলে কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের লাবণী পয়েন্টে বিজয়া দশমীর প্রতিমা বিসর্জন ঘিরে তৈরি হয় এমনই এক দৃশ্য। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের এই আয়োজনে অংশ নেন বিপুলসংখ্যক পর্যটক ও স্থানীয় বাসিন্দা। লাবণী পয়েন্টের উত্তর থেকে দক্ষিণ পর্যন্ত সৈকতের বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে ছিল মানুষের ভিড়।

আয়োজকদের দাবি, প্রতিমা বিসর্জন দেখতে সেখানে সমবেত হয়েছিলেন লাখো মানুষ। দেবী দুর্গাকে বিদায় জানানোর এই আয়োজন একপর্যায়ে পরিণত হয় বিভিন্ন ধর্মের মানুষের মিলনমেলায়। উৎসবের আনন্দ ভাগাভাগি করে নেন নানা ধর্ম ও সম্প্রদায়ের মানুষ। তাঁদের কাছে এটি কেবল একটি ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও সহাবস্থানেরও প্রকাশ।

কক্সবাজার সদর উপজেলা পূজা উদ্‌যাপন পরিষদের সভাপতি অ্যাডভোকেট বাপ্পী শর্মা বলেন, দেবী দুর্গাকে শেষ বিদায় জানাতে সৈকতে পর্যটকসহ লাখো মানুষের সমাগম হয়েছে। প্রতিবছরের মতো এবারও বিভিন্ন এলাকার মানুষ এই উৎসবে অংশ নিয়েছেন।

প্রতিমা বিসর্জন উপলক্ষে আয়োজিত বিজয়া সম্মেলনে প্রধান অতিথি ছিলেন ভূমি এবং পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার মীর হেলাল উদ্দিন। বক্তব্যে তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান কথা ও কাজের মধ্যে মিল রেখে চলছেন। মহানবমীতে ঢাকার বাইরে রাজশাহী ও চট্টগ্রামের পূজামণ্ডপে গিয়ে পূজার্থীদের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছেন তিনি। পূজার বরাদ্দ ও ছুটি বাড়িয়ে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের দীর্ঘদিনের দাবিও পূরণ করা হয়েছে।

প্রতিমন্ত্রী বলেন, নির্বাচনী ইশতেহারে ‘রেইনবো জাতি’ গঠনের যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে, সরকার সেই পথেই এগোচ্ছে। ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ বাস্তবায়নে সবার সহযোগিতা প্রয়োজন।

সৈকতে বিভিন্ন ধর্মের মানুষের উপস্থিতির প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, সমুদ্রপাড়ের এই মিলন প্রমাণ করে, অসাম্প্রদায়িক চেতনায় বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছিল এবং এখনো সেই চেতনা বহমান রয়েছে। বিজয়া দশমীর এই আয়োজনকে ঘিরে স্থানীয় বাসিন্দাদের পাশাপাশি কক্সবাজারে বেড়াতে আসা পর্যটকদের মধ্যেও ছিল ব্যাপক আগ্রহ। অনেকে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে সৈকতে আসেন। প্রতিমা বিসর্জনের দৃশ্য দেখতে সৈকতের বিভিন্ন স্থানে ভিড় করেন তারা।

আয়োজকদের ভাষ্য, প্রতিবছর বিজয়া দশমীতে দেবী দুর্গার বিসর্জন উপলক্ষে কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে বিপুল মানুষের সমাগম ঘটে। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। বিভিন্ন উপজেলা ছাড়াও আশপাশের এলাকার পূজামণ্ডপ থেকে প্রতিমা আনা হয় লাবণী পয়েন্টে।

জেলা পূজা উদ্‌যাপন পরিষদের অর্থ সম্পাদক স্বপন গুহ জানান, এবার লাবণী পয়েন্টে বিভিন্ন এলাকা থেকে আনা প্রায় অর্ধশত প্রতিমা বিসর্জন দেওয়া হয়েছে। লামা, নাইক্ষ্যংছড়ি এবং উখিয়ার রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবির থেকেও প্রতিমা আনা হয়।

কক্সবাজার জেলার অন্যান্য স্থানেও একই সময়ে প্রতিমা বিসর্জন দেওয়া হয়। রামুর বাঁকখালী নদী, চকরিয়ার মাতামুহুরী নদী, টেকনাফের সমুদ্র ও নাফ নদী এবং উখিয়ার ইনানী সৈকত ও রেজু নদীতে বিসর্জনের আয়োজন করা হয়।

জেলা পূজা উদ্‌যাপন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক স্বপন দাশ জানান, বুধবার দুপুরের পর বিভিন্ন মণ্ডপ থেকে প্রতিমা এনে রাখা হয় লাবণী পয়েন্টের উন্মুক্ত মঞ্চের সামনে। বেলা দুইটায় শুরু হয় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। বিকেল তিনটার দিকে প্রতিমা মঞ্চে আনার পর শুরু হয় বিজয়া সম্মেলন। জেলা পূজা উদ্‌যাপন পরিষদের সভাপতি উদয় শংকর পাল মিঠুর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন প্রতিমন্ত্রী মীর হেলাল উদ্দিন, কক্সবাজার সদর আসনের সংসদ সদস্য ও কেন্দ্রীয় বিএনপি নেতা লুৎফুর রহমান কাজল, কক্সবাজার-৪ আসনের সংসদ সদস্য ও জেলা বিএনপির সভাপতি শাহজাহান চৌধুরী, জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট শামীম আরা স্বপ্না, জেলা প্রশাসক এম এ মান্নান, পুলিশ সুপার এএনএম সাজেদুর রহমান এবং ট্যুরিস্ট পুলিশের পুলিশ সুপার নিশাত এঞ্জেলা।

এ ছাড়া বক্তব্য দেন অধ্যাপক সোমেশ্বর চক্রবর্তী, দুলাল চক্রবর্তী, জেলা যুবদলের সাধারণ সম্পাদক জিসান, জেলা ছাত্রদলের সভাপতি ফাহিমুর রহমান ফাহিম, পূজা উদ্‌যাপন পরিষদের সাবেক সাধারণ সম্পাদক বাবুল শর্মা, জেলা শ্রমিক দলের সভাপতি রফিকুল ইসলাম, সদর উপজেলা পূজা উদ্‌যাপন পরিষদের সভাপতি অ্যাডভোকেট বাপ্পী শর্মা ও সাধারণ সম্পাদক বলরাম দাশ অনুপমসহ বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা।

বিকেল পাঁচটার দিকে আলোচনা সভা শেষ হয়। এরপর বিসর্জনের মন্ত্র পাঠের মাধ্যমে সোয়া পাঁচটার দিকে প্রতিমা বিসর্জন শুরু হয়। একে একে প্রতিমা নিয়ে ভক্তরা এগিয়ে যান সমুদ্রের দিকে।

জেলা পূজা উদ্‌যাপন পরিষদের সভাপতি উদয় শংকর পাল মিঠু বলেন, এ বছর কক্সবাজার জেলায় ৩২৪টি মণ্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হয়েছে। এর মধ্যে ১৫৫টি মণ্ডপে প্রতিমা পূজা এবং ১৬৯টিতে ঘটপূজা হয়েছে।

তিনি বলেন, শান্তিপূর্ণ পরিবেশে সৈকতে প্রতিমা বিসর্জনের আয়োজন সম্পন্ন করতে পারা কক্সবাজারের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির পরিচয় বহন করে। বিভিন্ন ধর্মের মানুষের অংশগ্রহণ এই আয়োজনকে আরও অর্থবহ করেছে।

রামু থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এ কে ফজলুল হক বলেন, রামু থেকে নাইক্ষ্যংছড়িসহ আশপাশের কয়েকটি এলাকার প্রতিমা কড়া নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে আনা হয়। অন্য প্রতিমাগুলো বিসর্জন দেওয়া হয়েছে বাঁকখালী নদীতে। সেখানেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা সতর্ক অবস্থানে ছিলেন। নিরাপত্তায় কয়েক স্তরের ব্যবস্থা বিপুলসংখ্যক মানুষের সমাগমকে কেন্দ্র করে সৈকত এলাকায় নেওয়া হয় কয়েক স্তরের নিরাপত্তাব্যবস্থা। প্রতিমা বহনের পথে পুলিশের টহল, গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে নজরদারি, সাদাপোশাকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের অবস্থান এবং সমুদ্রের তীরবর্তী এলাকায় নৌযানের টহল ছিল নিরাপত্তাব্যবস্থার অংশ।

ট্যুরিস্ট পুলিশ কক্সবাজার অঞ্চলের পুলিশ সুপার নিশাত এঞ্জেলা বলেন, দুর্গাপূজার ছুটি শুরুর পর থেকেই কক্সবাজারে বিপুলসংখ্যক পর্যটক ও দর্শনার্থীর সমাগম ঘটেছে। সাপ্তাহিক ছুটি মিলিয়ে আরও কয়েক দিন পর্যটকদের ভিড় থাকতে পারে। বিজয়া দশমীর প্রতিমা বিসর্জনেও পূজার্থী, পর্যটক ও স্থানীয় দর্শনার্থী মিলিয়ে বিপুল মানুষের উপস্থিতি ছিল।

তিনি বলেন, উৎসব নির্বিঘ্ন করতে আগে থেকেই প্রয়োজনীয় নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল। ট্যুরিস্ট পুলিশের পাশাপাশি এসআরবি ও বিভিন্ন সংস্থার সদস্যরা দায়িত্ব পালন করেছেন। যানজট নিয়ন্ত্রণেও বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়।

ট্রাফিক পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার দেবদূত মজুমদার বলেন, শহরের বাইরের উপজেলাগুলোর পূজামণ্ডপ থেকে আসা প্রতিমাবাহী যানবাহন কলাতলী ডলফিন মোড় হয়ে সৈকতের দিকে এসেছে। শহরের ভেতরের প্রতিমাবাহী যানবাহনের জন্য ব্যবহার করা হয়েছে প্রধান সড়কের হলিডে মোড়।

কক্সবাজারের পুলিশ সুপার এএনএম সাজেদুর রহমান বলেন, প্রতিমা মণ্ডপ থেকে ট্রাকে করে আনার সময় আনসার সদস্যরা নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করেন। প্রতিমাবাহী ট্রাকের বহরে যাতে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটে, সে জন্য পুলিশের টহল দল সক্রিয় ছিল। সৈকতের প্রবেশপথ, প্রতিমা বহনের সড়ক ও বিভিন্ন মোড়ে সাদাপোশাকে নজরদারি বাড়ানো হয়েছিল।

তিনি বলেন, কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ছাড়াই বিপুল মানুষের অংশগ্রহণে প্রতিমা বিসর্জন সম্পন্ন হয়েছে। এ জন্য সংশ্লিষ্ট সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান তিনি।

জেলা প্রশাসক এম এ মান্নান বলেন, অতীতের মতো এবারও কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে বিপুল মানুষের উপস্থিতিতে দেশের অন্যতম বৃহৎ প্রতিমা বিসর্জন উৎসব অনুষ্ঠিত হয়েছে। পূজার্থীদের পাশাপাশি পর্যটক ও স্থানীয় দর্শনার্থীরাও এই আয়োজনে অংশ নিয়েছেন।