26 October 2026
৩ হাজার লাউয়ের দামে মিলছে ১ কেজি গরুর মাংস

মাঠজুড়ে সবুজ লাউয়ের সমারোহ, গাছে গাছে ঝুলছে ফল, ফলনও হয়েছে আশানুরূপ, কিন্তু সেই লাউ বিক্রি করেই উৎপাদন খরচ তোলা কঠিন হয়ে পড়েছে কৃষকদের জন্য। ঠাকুরগাঁও ও পঞ্চগড়ে লাউয়ের বাম্পার ফলন হলেও বাজারে ন্যায্য দাম না পেয়ে চরম লোকসানে পড়েছেন চাষিরা। কোথাও প্রতি পিস লাউ বিক্রি হচ্ছে মাত্র এক থেকে চার টাকায়, আবার কোথাও চারটি লাউয়ের দাম মিলছে মাত্র এক টাকা। অথচ শহরের খুচরা বাজারে একই লাউ বিক্রি হচ্ছে ২০ থেকে ৪০ টাকায়।
স্থানীয় বাজারে লাউয়ের এমন দরপতনে কৃষকদের মধ্যে হতাশা বাড়ছে। উৎপাদন খরচ, সার, শ্রমিকের মজুরি ও পরিবহন ব্যয় মেটাতে না পেরে অনেকেই এখন দিশেহারা। একসময় যে ফসল ঘিরে লাভের স্বপ্ন দেখেছিলেন, সেই লাউ এখন তাঁদের জন্য আর্থিক সংকটের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
গ্রামে প্রতি পিস লাউ এক থেকে চার টাকায় বিক্রি হলেও শহরের খুচরা বাজারে তার দাম কয়েক গুণ বেশি। কোথাও কোথাও চারটি লাউ বিক্রি হচ্ছে মাত্র এক টাকায়। অর্থাৎ, প্রতিটি লাউয়ের দাম দাঁড়াচ্ছে মাত্র ২৫ পয়সা। কচি লাউয়ের কিছুটা চাহিদা থাকলেও পরিপক্ব লাউ বিক্রি করতে গিয়ে বিপাকে পড়ছেন কৃষকেরা।
ঠাকুরগাঁওয়ের পূর্ব চন্ডিপুর, লিলারহাট ও কালিতলা গ্রামের মাঠে মাঠে এখন কৃষকদের হতাশার চিত্র। কম দামে লাউ বিক্রি করে লোকসান গুনতে গুনতে অনেকে বাগানের পরিচর্যা বন্ধ করে দিয়েছেন। কেউ বাগান কেটে ফেলছেন, আবার কেউ অবিক্রীত পাকা লাউ জমিতেই ফেলে রাখছেন। একপর্যায়ে সেসব লাউ গবাদিপশুর খাবার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।
লোকসানের এমন চিত্রের মধ্যে রয়েছেন ঠাকুরগাঁওয়ের কৃষক আদিল ইসলাম। বন্ধক নিয়ে পাঁচ একর জমিতে লাউ চাষ করেছিলেন তিনি। আশা ছিল, আগের বছরের মতো এবারও ভালো লাভ হবে। কিন্তু বাজারে দাম না থাকায় সেই আশায় গুড়েবালি। আদিল ইসলাম জানান, লাউ চাষে তাঁর প্রায় তিন লাখ ৮০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। ক্ষেতের ৮০ শতাংশ লাউ বিক্রি করে পেয়েছেন মাত্র ৯৬ হাজার টাকা। এই অর্থ দিয়ে শ্রমিকের মজুরিও পরিশোধ করতে পারছেন না। গত আট দিন দেখভাল না করায় ক্ষেতের বাকি লাউয়ে ছত্রাক ধরেছে, অনেক লাউ ফেলে দিয়েছি।
ধারদেনা করে চাষ, এখন দুশ্চিন্তায় কৃষক-
পঞ্চগড়ের আটোয়ারী উপজেলার কিসমত এলাকার কৃষক হাসিনুর রহমানও পড়েছেন একই সংকটে। ধারদেনা করে ১০ শতক জমিতে লাউ চাষ করেছিলেন তিনি। কিন্তু বাজারে দাম না থাকায় খরচ তোলার পরিবর্তে ঋণের বোঝা বাড়ছে তাঁর। ক্ষোভ প্রকাশ করে হাসিনুর রহমান বলেন, ‘সারের দাম বেশি, কামলার দাম (মজুরি) বেশি, ধারদেনা করি লাউ করিছিনু, আর দাম যদি ১-২ টাকা পিস হয়, তাহিলে হামেরা কেন-গো বাঁচিমো! সরকার যদি হামার তানে দামটা ঠিক করি দেয়, হামরা বাঁচবা পারিমো।’
কৃষকদের অভিযোগ, উৎপাদন খরচ ক্রমাগত বাড়লেও কৃষিপণ্যের ন্যায্য দাম নিশ্চিত করার কার্যকর ব্যবস্থা নেই। ফলে ভালো ফলন হলেও লাভের মুখ দেখতে পারছেন না তাঁরা।
বাম্পার ফলনে কমেছে পাইকারি ক্রেতাদের আগ্রহ -
ঠাকুরগাঁও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জেলায় ৪৬৬ হেক্টর জমিতে লাউ চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। ওই অর্থবছরে উৎপাদন হয়েছিল ১৬ হাজার ৬৩৯ টন। চলতি বছরের পূর্ণাঙ্গ উৎপাদন-পরিসংখ্যান এখনো পাওয়া যায়নি।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. মাজেদুল ইসলামের ভাষ্য, পঞ্চগড়, রংপুরসহ আশপাশের জেলাগুলোতে এবার লাউয়ের বাম্পার ফলন হয়েছে। ফলে পাইকারি ক্রেতাদের আগ্রহ কমেছে।
পঞ্চগড়ের ব্যবসায়ীরাও বলছেন, এবার ঢাকা ও অন্যান্য জেলায় লাউয়ের চাহিদা তুলনামূলক কম। পাশাপাশি পণ্য ওঠানো-নামানো ও পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় ব্যবসায়ীদের খরচও বাড়ছে। সব মিলিয়ে কৃষকের কাছ থেকে কম দামে লাউ কিনেও বাজারজাত করতে নানা সমস্যার মুখে পড়ছেন তাঁরা।
অন্যদিকে, কৃষিপণ্যের দাম নিয়ে কৃষকদের অভিযোগের বিষয়ে জেলা কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা ভিন্ন অবস্থান জানিয়েছেন। অধিদপ্তরের কর্মকর্তা মুয়াল্লেমা খানম বলেন, পর্যাপ্ত জনবল না থাকলেও তাঁরা বাজার তদারকি করছেন।
ন্যায্য দাম না পেলে কৃষিতে আগ্রহ হারানোর শঙ্কা-
কৃষকেরা বলছেন, বাম্পার ফলন তাঁদের জন্য আশীর্বাদ হওয়ার কথা থাকলেও বাজারে চাহিদা ও ন্যায্য মূল্য না থাকায় তা অভিশাপে পরিণত হয়েছে। উৎপাদিত ফসল বিক্রি করে খরচ তুলতে না পারলে পরবর্তী মৌসুমে চাষাবাদের জন্য পুঁজি জোগাড় করাও কঠিন হয়ে পড়বে।
বিশেষজ্ঞদের মতামত ও বাজারের বিস্তারিত তথ্য না পাওয়া পর্যন্ত সংকটের সব কারণ নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়। তবে কৃষকের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করা, বাজারে সরবরাহ ও চাহিদার সমন্বয় এবং পরিবহনব্যবস্থার ব্যয় কমানোর বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনার দাবি রাখে।
মাঠভরা লাউয়ের বিপরীতে কৃষকের ঘরে যখন লোকসানের হিসাব, তখন এই সংকট শুধু একটি সবজির দাম কমে যাওয়ার ঘটনা নয়; এটি কৃষকের উৎপাদন ব্যয়, বাজারব্যবস্থা এবং ন্যায্য মূল্য পাওয়ার প্রশ্নও সামনে নিয়ে এসেছে।
