মূল খবরে ফিরে যান
যা দেখছেন, PDF-এও সেটাই থাকবে। প্রিন্ট ডায়ালগে “Save as PDF” বেছে নিন।
Monday, 22 June 2026
অন্যান্য
banglabrief.com/
সংস্করণ
22 June 2026
অন্যান্য

শেরপুর হাটে ‘ভাড়া বাণিজ্য’: যুগের পর যুগ লক্ষ লক্ষ টাকার রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার

বগুড়ার শেরপুর পৌর শহরের প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী শেরপুর বারদুয়ারী হাট এখন অবৈধ দখল আর ‘ভাড়া বাণিজ্যের’ অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। পৌরসভার খাস জায়গা দখল করে কেউ ২০ বছর, আবার কেউ ৩০ বছর ধরে স্থায়ী দোকান ঘর তুলে ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন। রাজনৈতিক প্রভাব ও পৌর কর্তৃপক্ষের সাবেক কিছু কর্মকর্তার যোগসাজশে হাটখোলা এলাকায় গড়ে উঠেছে এমন ৭৩টি অবৈধ দোকান। শুধু তাই নয়, প্রশাসনের নীরবতার সুযোগে এবার নতুন করে আরও ৬টি দোকান ঘর নির্মাণের মহোৎসব চলছে। এর ফলে প্রতি বছর সরকার লক্ষ লক্ষ টাকার রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হলেও, সেই টাকা চলে যাচ্ছে স্থানীয় একশ্রেণির প্রভাবশালী ‘ভাড়া ব্যবসায়ী’দের পকেটে।

আজ সোমবার (২২ জুন) সরেজমিনে বারদুয়ারী হাটের ভেতরে গিয়ে দেখা যায়, হাটের সরকারি খালি জায়গা দখল করে জোরকদমে চলছে ইটের গাঁথুনির কাজ। প্রায় ৪৪ ফুট দৈর্ঘ্য ও ১০ ফুট প্রস্থের জায়গাজুড়ে ছোট-বড় ৬টি দোকান ঘর নির্মাণ করছেন কয়েকজন শ্রমিক।

সেখানে কর্মরত শ্রমিক আব্দুস সালাম জানান, গত ৩ দিন ধরে এই নির্মাণকাজ চলছে এবং স্থানীয় ফেরদৌস নামের এক ব্যক্তি তাদের মজুরি দিচ্ছেন। এ বিষয়ে জানতে চাইলে ফেরদৌস বলেন, আমি শুধু ইট-বালু সরবরাহ করছি। যারা ১০০ বছরের লিজ নিয়েছে, ঘরগুলো তারাই নির্মাণ করছে। তবে সরকারি হাটের জায়গা এভাবে ১০০ বছরের লিজ দেওয়ার কোনো আইনি ভিত্তি আছে কি না, তার কোনো সদুত্তর তিনি দিতে পারেননি।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, হাটখোলা এলাকার এই ৭৩টি দোকানের মালিকরা যুগের পর যুগ ধরে সরকারি জায়গা ভোগদখল করছেন। অনেকে পৌরসভা থেকে একসময় নামমাত্র চুক্তিপত্র করে নিয়ে এখন অন্য ব্যবসায়ীদের কাছে চড়া মূল্যে দোকান ভাড়া দিয়েছেন। আকারভেদে বড় দোকানগুলোর মাসিক ভাড়া ১৫ হাজার টাকা এবং ছোট দোকানগুলোর ভাড়া ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত আদায় করা হচ্ছে।

হাটের চাউল পট্টি এলাকার ব্যবসায়ী খলিল হাজি জানান, এই লাইনের সব দোকান ব্যক্তি মালিকানার মতো হয়ে গেছে। আমরা শুরু থেকেই মূল দখলদারকে ভাড়া দিচ্ছি। বড় দোকানের ভাড়া ১৫ হাজার আর ছোট দোকানের ১০ হাজার টাকা। পৌরসভা এখান থেকে কিছুই পায় কিনা জানিনা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন ব্যবসায়ী জানান, রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে বা তৎকালীন পৌর কর্তৃপক্ষের সাথে আত্মীয়তার সুবাদে অনেকে বিনা পয়সায় পজিশন বা চুক্তিপত্র নিয়েছেন। এখন তারা নিজেরা ব্যবসা না করে অন্যকে ভাড়া দিয়ে প্রতি মাসে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন। সরকারি জায়গা দখল করে ব্যবসা করলেও দোকানদারদের দাবি ও বক্তব্য বেশ বিচিত্র। হাটখোলার কাজল নামের এক দোকানদার জানান, আমার এক আত্মীয় পৌরসভার কাছ থেকে লিজ নিয়েছিলেন। আমি তাঁর কাছ থেকে নিয়ে ২৫ বছর ধরে দোকান করছি। পৌরসভাকে কোনো ভাড়া দিতে হয় না, শুধু ট্যাক্স-ভ্যাট দিই।

অন্যদিকে চুরীপট্টির প্রভাত নামের একজন দাবি করেন, এটি তাঁর ব্যক্তিগত জায়গা এবং ৩০ বছর ধরে ভোগদখল করছেন। তবে পৌরসভা চাইলে মুহূর্তেই এটি ভেঙে দিতে পারে স্বীকার করে তিনি বলেন, আমাদের মাসিক ভাড়া দিতে হয় না, কেবল হাটের দিনে খাজনা দিই। তবে সরকারি হাটের জায়গা কীভাবে ব্যক্তিগত হয়, সে বিষয়ে তিনি কোনো বৈধ কাগজপত্র দেখাতে পারেননি।

পৌরসভার নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মচারী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, শেরপুর হাট থেকে প্রতিবছর সরকারের কয়েক লক্ষ লক্ষ টাকা রাজস্ব পাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু স্থানীয় প্রভাবশালীদের ভোগদখল ও ভাড়া বাণিজ্যের কারণে পৌরসভা তার প্রাপ্য আয় থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, একটি ঐতিহ্যবাহী হাট কেবল ব্যবসার জায়গা নয়, এটি স্থানীয় অর্থনীতির প্রাণ। এভাবে সরকারি জায়গা দখল করে ব্যক্তিগত পকেট ভারী করা রাষ্ট্রীয় সম্পদের চরম অপচয়।

এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে শেরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও পৌর প্রশাসক সাইদুজ্জামান হিমু কঠোর পদক্ষেপের কথা জানিয়ে বলেন, হাটের ভেতরে নতুন করে যে নির্মাণকাজ চলছিল, তা তাৎক্ষণিকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে। অবিলম্বে এই সরকারি জায়গা দখলমুক্ত করা হবে এবং সঠিক নীতিমালার আওতায় এনে দোকান বরাদ্দ ও নিয়মতান্ত্রিক ভাড়া আদায়ের ব্যবস্থা করা হবে। সরকারের রাজস্ব ফাঁকি দেওয়ার কোনো সুযোগ দেওয়া হবে না।