24 June 2026
শরীয়তপুরে ঘোড়ার গাড়িতে চড়ে আবেগঘন বিদায় নিলেন প্রধান শিক্ষক

বিদায় সব সময় বেদনার হলেও কখনো কখনো তা চিরস্মরণীয় হয়ে থাকে। দীর্ঘ ৩৮ বছর চাকরি জীবনের পর এমনই এক বিদায়ী সংবর্ধনা পেয়েছেন শরীয়তপুরের নড়িয়া উপজেলার ঐতিহ্যবাহী কার্তিকপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সাহাবুদ্দিন তালুকদার।
এই শিক্ষকের অবসরগ্রহণ উপলক্ষে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বর্ণিল এই আয়োজন করে। বিভিন্ন ফুলের মালা দিয়ে সাজানো ঘোড়ার গাড়িতে করে ওই শিক্ষককে বিদায় জানান সহকর্মী ও শিক্ষার্থীরা।
বুধবার (২৪ জুন) দুপুরে বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে ব্যতিক্রমী আয়োজনে শিক্ষার্থী, সহকর্মী ও স্থানীয়দের ভালোবাসায় শিক্ষকতার শেষ কর্মদিবসে ঘোড়ার গাড়িতে চড়ে অবসরের যান প্রতিষ্ঠানটির প্রধান শিক্ষক। এ দৃশ্য ছুঁয়ে যায় সবার হৃদয়।
জানা যায়, শরীয়তপুরের নড়িয়া উপজেলার শতবর্ষী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কার্তিকপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. সাহাবুদ্দিন তালুকদার দীর্ঘ ৩৮ বছর ধরে ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে ছড়িয়েছেন শিক্ষার আলো। সেই ছাত্রদের কেউ এখন সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, কেউ জনপ্রতিনিধি, আবার কেউবা দেশের স্বনামধন্য ব্যবসায়ী।
তাই প্রিয় শিক্ষকের চাকরি জীবনের শেষ কর্মদিবসকে স্মরণীয় করে রাখতে ভোলেননি তারা। বিশেষ এ দিনটি স্মরণীয় করে রেখেছেন তার সহকর্মী ও শিক্ষার্থীরা। সুসজ্জিত ঘোড়ার গাড়িতে চড়িয়ে শিক্ষক মো. সাহাবুদ্দিনকে বাড়িতে পৌঁছে দেওয়া হয়।
শেষ কর্মদিবস উপলক্ষে শিক্ষার্থীরা প্রতিটি শ্রেণি থেকে তাঁকে একটি করে ক্রেস্ট তুলে দেয়। এ সময় বিদ্যালয়ের স্কাউট সদস্যরা তাঁকে স্কাউট সালাম দেয়। ঘোড়ার গাড়ির আগে পিছে মোটরসাইকেলে ছিলেন শিক্ষকরা। গাড়িতে ওঠার সময় বিদায়ী প্রধান শিক্ষককে ফুল ছিটিয়ে ও ফুলের মালা পরিয়ে বিদায় জানানো হয়। শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের এমন আয়োজনে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়ে শিক্ষক সাহাবুদ্দিন তালুকদার।
মো. সাহাবুদ্দিন তালুকদার ১৯৮৮সালের ২১ আগষ্ট কার্তিকপুর উচ্চবিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক (ইংরেজি) হিসেবে যোগ দেন। পরে ২০১৯ সালের ৪ জানুআরি থেকে তিনি প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন।
বিদায়ের মুহূর্তে আবেগাপ্লুত মো. সাহাবুদ্দিন তালুকদার বলেন, ৩৮ বছর পর অবসরে যাচ্ছি। এসময় শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা করানোসহ বিদ্যালয়ের উন্নয়নের জন্য আমি সাধ্যমতো চেষ্টা করেছি। জানি আমার ছাত্ররা আমাকে ভালোবাসে। কিন্তু আজকের এই আয়োজন প্রমাণ করেছে, তারা আমাকে কতটা ভালোবাসে। আজ আমার শিক্ষকতা জীবনকে সার্থক মনে হচ্ছে।
স্থানীয়রা জানায়, তার নিরলস প্রচেষ্টায় এলাকায় শিক্ষার প্রসার ঘটেছে। অসংখ্য শিক্ষার্থী আজ দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে কর্মরত রয়েছেন। স্যারের সৎ উপদেশগুলো আমাদের অনেকের জীবনে পরিবর্তন নিয়ে এসেছে। শিক্ষারমান আমাদের বিদ্যালয়ে অনেক উন্নত হয়েছে। আমরা আরও কিছুদিন যদি তাকে পেতাম তাহলে হয়তোবা এই স্কুলটিকে বাংলাদেশের আরও সর্বোচ্চ জায়গায় নিয়ে যেতে পারতাম।
বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বলেন, সাহাবুদ্দিন স্যার ছিলেন ছাত্র ও সহকর্মীদের কাছে অত্যন্ত প্রিয়। তাঁর ন্যায়নীতি ও আদর্শ আমাদের জন্য অনুকরণীয় হয়ে থাকবে।
বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক রহমান মোল্লা ও সোহেল চৌধুরী জানান, স্যার অনেক ভালো ও উদার মনের মানুষ। শিক্ষক হিসেবে শিক্ষার্থীদের কাছে বেশ প্রিয় ছিলেন। কখনো রাগ বা ক্ষোভ দেখিনি। বাবার মতো শিক্ষার্থীদের পড়িয়েছেন। আমাদের কর্মজীবনে এমন শিক্ষক পেয়ে নিজেকে ধন্য মনে করছি। তিনি এতো উদার মনের মানুষ, কোনো শিক্ষকের বিপদ হলে সঙ্গে সঙ্গে যেতেন এবং খোঁজ খবর নিতেন। অবসরজনিত কারণে তিনি বিদায় নিয়েছেন। এটি সবাইকে মানতেই হবে। আমরা তার দীর্ঘায়ু ও সুস্থতা কামনা করছি।
অনুষ্ঠান শেষে আবেগে ভরা পরিবেশে ঘোড়ার গাড়িতে চড়ে বিদ্যালয় ত্যাগ করেন সাহাবুদ্দিন তালুকদার। উপস্থিত শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও এলাকাবাসী দাঁড়িয়ে বিদায় জানান তাঁদের প্রিয় শিক্ষককে।
