মূল খবরে ফিরে যান
এই প্রিভিউ আর চূড়ান্ত প্রিন্ট/PDF একই লেআউট ব্যবহার করে।
Saturday, 04 July 2026
অন্যান্য
banglabrief.com/
সংস্করণ
03 July 2026
অন্যান্য

গালিবাফ-আরাঘচিকে হত্যার ছক ইসরায়েলের, ইরানের কাছে ফাঁস করে দেয় যুক্তরাষ্ট্র

যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান ও সাবেক কর্মকর্তাদের দাবি, ইসরায়েল ইরানের শীর্ষ পর্যায়ের আলোচকদের হত্যা করতে পারে—এমন আশঙ্কায় গভীর উদ্বেগে ছিল ওয়াশিংটন। ঠিক সেই সময় প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন যুদ্ধের অবসান এবং হরমুজ প্রণালি পুনরায় উন্মুক্ত করার লক্ষ্যে কূটনৈতিক সমঝোতার চেষ্টা চালাচ্ছিল।

মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি এবং দেশটির পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফকে লক্ষ্য করে সম্ভাব্য হত্যাচেষ্টার আশঙ্কায় যুক্তরাষ্ট্র মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে তেহরানকে গোপনে সতর্কবার্তা পাঠায়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মার্কিন কর্মকর্তা বলেন, ‘আপনি যদি এই ব্যক্তিদের হত্যা করেন, তাহলে বাস্তববাদীদেরই হত্যা করবেন।’ ইসরায়েলের লক্ষ্যভিত্তিক হত্যাকাণ্ডের কৌশল নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি এ মন্তব্য করেন।

আরেক কূটনীতিক জানান, মার্চ মাস থেকেই ট্রাম্প প্রশাসন ইসরায়েলকে বারবার অনুরোধ করে আসছিল, যেন তারা ইরানের রাজনৈতিক নেতৃত্বকে লক্ষ্য করে কোনো হত্যাকাণ্ড না চালায়। কারণ, তেহরানের সঙ্গে সম্ভাব্য আলোচনার পথ খোলা রাখাই ছিল তখন ওয়াশিংটনের অগ্রাধিকার।

বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র শুধু ইসরায়েলকে সতর্ক করেই থেমে থাকেনি, বরং ইরানকেও সম্ভাব্য হামলার বিষয়ে আগাম সতর্ক করেছিল। তাদের মতে, এই পদক্ষেপ যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সম্পর্কের ভেতরের মতপার্থক্য এবং ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর ইসরায়েলের সীমিত প্রভাবকে স্পষ্ট করে।

যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের সাবেক কর্মকর্তা ও মধ্যপ্রাচ্য বিশ্লেষক অ্যারন ডেভিড মিলার বলেন, ‘এটি দেখায়, যুদ্ধের উদ্দেশ্য নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য ছিল। একই সঙ্গে এটি প্রমাণ করে, সম্ভাব্য কূটনৈতিক সমাধান ভণ্ডুল করতে ইসরায়েল দৃঢ় অবস্থানে ছিল।’

এ বিষয়ে ওয়াশিংটনে অবস্থিত ইসরায়েলি দূতাবাস কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি। হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তা শুধু বলেছেন, ‘প্রেসিডেন্ট চান শান্তি প্রক্রিয়া এগিয়ে যাক।’

ইসরায়েলের সম্ভাব্য হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগের বিষয়টি এর আগেও দ্য নিউইয়র্ক টাইমস প্রকাশ করেছিল।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ সামরিক অভিযানে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিসহ দেশটির বেশ কয়েকজন রাজনৈতিক ও সামরিক নেতা নিহত হন। অভিযানের শুরুতে দুই মিত্র দেশের লক্ষ্য ছিল ইরানে শাসন পরিবর্তন। তবে পরে যুক্তরাষ্ট্রের মূল্যায়নে দেখা যায়, তেহরানের সামরিক ও ধর্মীয় নেতৃত্ব এখনও ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে সক্ষম। এরপর থেকেই ওয়াশিংটন ও তেলআবিবের অবস্থানের মধ্যে স্পষ্ট দূরত্ব তৈরি হতে শুরু করে।

কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, মার্চের মাঝামাঝি সময়ে ইরানের জাতীয় নিরাপত্তা কাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি আলী লারিজানিকে হত্যার পর সেই মতপার্থক্য আরও প্রকট হয়ে ওঠে। এক পশ্চিমা কর্মকর্তা বলেন, ‘পরিস্থিতির মোড় ঘুরেছিল লারিজানিকে হত্যার পর। যুক্তরাষ্ট্র এমন একজন কর্মকর্তার সঙ্গে আলোচনা করতে চাইছিল, যিনি হঠাৎ করেই আর জীবিত ছিলেন না।’

পরবর্তীতে এপ্রিলের যুদ্ধবিরতি এবং জুনে যুদ্ধ শেষ করার লক্ষ্যে প্রস্তাবিত কাঠামোগত চুক্তির আলোচনায় আব্বাস আরাঘচি ও মোহাম্মদ গালিবাফই ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান যোগাযোগের ব্যক্তি। তবে চুক্তি চূড়ান্ত হওয়ার আগেই ইসরায়েলি কর্মকর্তারা এবং ওয়াশিংটনের প্রভাবশালী ইসরায়েলপন্থী লবিস্টরা এর বিরোধিতা শুরু করেন। তাদের দাবি ছিল, এই সমঝোতা ইরানে শাসন পরিবর্তনের লক্ষ্যকে কার্যত থামিয়ে দেবে এবং দেশটির ওপর আরোপিত অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা শিথিলের পথ খুলে দেবে।

মার্চ মাসে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও প্রকাশ্যে ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, ইসরায়েলের ধারাবাহিক হত্যাকাণ্ড কূটনৈতিক প্রচেষ্টাকে জটিল করে তুলছে। সে সময় তিনি বলেন, ‘জানেন, বিষয়টা কঠিন হয়ে গেছে। তারা সবাইকে সরিয়ে ফেলেছে। আমি চাই না তাদের হত্যা করা হোক।’

মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, গত বছরের ১২ দিনের যুদ্ধে ইসরায়েলের হামলার লক্ষ্য হওয়া একটি ভবনে গালিবাফও উপস্থিত ছিলেন। এছাড়া দ্য নিউইয়র্ক টাইমস জানিয়েছে, চলতি বছর একটি ভূগর্ভস্থ বাঙ্কারে জ্যেষ্ঠ ইরানি কর্মকর্তাদের বৈঠকে ইসরায়েলের হামলায়ও অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে যান তিনি।

বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, গালিবাফ, নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি এবং ইরানের অন্যান্য শীর্ষ কর্মকর্তাদের লক্ষ্য করে সম্ভাব্য হত্যাচেষ্টা অঞ্চলজুড়ে নতুন অস্থিতিশীলতার জন্ম দিতে পারে। তাদের মতে, এমন পরিস্থিতি ভবিষ্যতে আরও কঠোর ও প্রতিশোধপরায়ণ নেতৃত্বের উত্থানের পথ তৈরি করতে পারে, যা মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলবে।