03 July 2026
মেসির পেনাল্টি ঠেকানোর স্বপ্ন নিয়ে আজ মাঠে ভোজিনিয়া

বিশ্বকাপ শুরুর আগে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে সাদা জার্সি গায়ে বসেছিলেন তিনি। বুকজুড়ে লেখা ছিল ‘কাবু ভের্দি’। তখনও আন্তর্জাতিক ফুটবলে তার নাম খুব একটা পরিচিত নয়। শান্ত কণ্ঠে বলেছিলেন, একদিন লিওনেল মেসির বিপক্ষে খেলার স্বপ্ন দেখেন। আর যদি সুযোগ আসে, মেসির নেওয়া একটি পেনাল্টি ঠেকাতে চান।
সেই স্বপ্নই এখন বাস্তবের খুব কাছাকাছি। বাংলাদেশ সময় আগামীকাল ভোর ৪টায় বিশ্বকাপের শেষ ৩২-এর ম্যাচে আর্জেন্টিনার মুখোমুখি হবে কেপ ভার্দে। আর সেই ম্যাচেই বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম সেরা তারকার সামনে দাঁড়াবেন কেপ ভার্দের গোলরক্ষক ভোজিনিয়া।
বিশ্বকাপে নিজেদের অভিষেক আসরে খেলছে কেপ ভার্দে। ফলে ভোজিনিয়াকে চেনার সুযোগও খুব কম মানুষের হয়েছিল। তবে স্পেনের বিপক্ষে গ্রুপ পর্বের প্রথম ম্যাচে সাতটি দুর্দান্ত সেভ করে গোলশূন্য ড্র এনে দিয়ে তিনি আলোচনায় উঠে আসেন। সেই পারফরম্যান্সই বিশ্ব ফুটবলে নতুন এক নায়কের জন্ম দিয়েছে।
গ্রুপ পর্বে কেপ ভার্দের পথচলাও ছিল নাটকীয়। উরুগুয়ের বিপক্ষে এগিয়ে থেকেও পিছিয়ে পড়া, পরে আবার সমতায় ফেরা, আর সৌদি আরবের বিপক্ষে আরেকটি ক্লিন শিট। সংগ্রাম আর প্রত্যাবর্তনের গল্প লিখেই ইতিহাস গড়েছে ছোট্ট দ্বীপরাষ্ট্রটি। বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে ওঠা সবচেয়ে ছোট দেশ এখন কেপ ভার্দে।
দলের সাফল্যের প্রতিফলন পড়েছে ভোজিনিয়ার ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তাতেও। স্পেন ম্যাচের আগে ইনস্টাগ্রামে তার অনুসারী ছিল প্রায় ৪৫ হাজার। কয়েক দিনের ব্যবধানে সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৭ লাখ ৫০ হাজারে। তবে এবার তার সামনে আরও বড় চ্যালেঞ্জ। প্রতিপক্ষ লিওনেল মেসি, যার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনুসারীর সংখ্যা ৫১ কোটিরও বেশি। কিন্তু ভোজিনিয়ার লড়াই সংখ্যার সঙ্গে নয়, ইতিহাসের অন্যতম সেরা ফুটবলারের সঙ্গে।
চলতি বিশ্বকাপে দুর্দান্ত ছন্দে রয়েছেন মেসি। মাত্র তিন ম্যাচে করেছেন ছয় গোল। একই সঙ্গে বিশ্বকাপ ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতার আসনও এখন তার দখলে। কেপ ভার্দের বিপক্ষে ম্যাচটি হবে বিশ্বকাপে তার ৩০তম উপস্থিতি, যা আরও একটি রেকর্ডকে সমৃদ্ধ করবে।
অন্যদিকে পরিসংখ্যান সংস্থা অপ্টার তথ্য বলছে, গ্রুপ পর্বে অন্তত ৯০ মিনিট খেলা ফুটবলারদের মধ্যে সবচেয়ে কম দৌড়ানো খেলোয়াড়দের একজন মেসি। প্রতি ৯০ মিনিটে তিনি গড়ে দৌড়েছেন মাত্র ৮ দশমিক ১ কিলোমিটার। তবে তার খেলায় গতির চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার দক্ষতা, অবস্থান নির্বাচন এবং মুহূর্ত তৈরি করার সামর্থ্য। বল যেন ঠিকই তার হয়ে কাজ করে।
আর্জেন্টিনার কোচ লিওনেল স্কালোনি সতর্ক করে বলেছেন, “কেপ ভার্দেকে সহজ প্রতিপক্ষ ভাবার কোনো সুযোগ নেই।” অন্যদিকে কেপ ভার্দের প্রেসিডেন্ট হোসে মারিয়া নেভেস ম্যাচের আগে মেসিকে সম্মান জানিয়ে জাতীয় দলের জার্সি উপহার দেওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন। একই সঙ্গে আশাও ব্যক্ত করেছেন, তার দেশ যেন ১-০ ব্যবধানে হারাতে পারে বর্তমান বিশ্ব চ্যাম্পিয়নদের।
তবে সবচেয়ে আকর্ষণীয় গল্পটি ভোজিনিয়ার নিজের। বিশ্বকাপ শুরুর আগে তিনি কল্পনা করেছিলেন একটি দৃশ্য। ম্যাচে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে থাকবে কেপ ভার্দে। শেষ দিকে পেনাল্টি পাবে আর্জেন্টিনা। স্পটকিকে দাঁড়াবেন মেসি। আর সেই শটটি তিনি ঠেকিয়ে দেবেন। তখনই বলেছিলেন, “মেসির পেনাল্টি সেভ করতে পারলে সেটাই হবে আমার জীবনের সবচেয়ে বড় স্বপ্নপূরণ।”
আগামীকাল ভোরে মায়ামির হার্ড রক স্টেডিয়ামে মুখোমুখি হবে দুই ভিন্ন বাস্তবতার দুই দল। একদিকে বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে সফল ও পরিচিত নাম আর্জেন্টিনা, অন্যদিকে জনসংখ্যা ও সামর্থ্যে অনেক ছোট কেপ ভার্দে। তবে ফুটবলের সৌন্দর্যই হলো, মাঠে অতীত কিংবা পরিচিতির চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে ৯০ মিনিটের লড়াই।
মেসি হয়তো আরও একটি রেকর্ড গড়বেন। আবার ভোজিনিয়াও হয়তো তার গ্লাভসে আটকে দেবেন বিশ্বসেরা ফুটবলারের কোনো গুরুত্বপূর্ণ শট। ফল যা-ই হোক, বিশ্বকাপ আবারও এমন এক গল্প উপহার দিতে চলেছে, যেখানে অচেনা এক নায়ক উঠে আসতে পারেন বিশ্বের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে।
এই মুহূর্তে সেই গল্পের নাম ভোজিনিয়া। আর তার সামনে দাঁড়িয়ে আছেন সেই ফুটবলার, যাকে টেলিভিশনের পর্দায় দেখে একদিন স্বপ্ন বুনেছিলেন তিনি। আগামীকাল ভোরে ভোজিনিয়া শুধু গোলপোস্টই আগলে রাখবেন না, রক্ষা করবেন একটি ছোট্ট দ্বীপরাষ্ট্রের স্বপ্ন, বিশ্বাস এবং ইতিহাস গড়ার সম্ভাবনাকেও।
