07 July 2026
কক্সবাজারে ১৩ প্রাণ গেলেও পাহাড় ছাড়ছে না মানুষ

টানা কয়েক দিনের ভারী বর্ষণে আবারও ভয়াল রূপ নিয়েছে কক্সবাজারের পাহাড়। একের পর এক পাহাড়ধসে প্রাণহানির ঘটনা ঘটলেও ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ের ঢাল ছাড়তে রাজি নন হাজারো মানুষ। প্রশাসনের মাইকিং, সতর্কবার্তা আর নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার আহ্বান যেন তাদের কাছে গুরুত্বহীন। জীবন-মৃত্যুর মাঝখানে দাঁড়িয়ে একই জায়গায় রয়ে গেছে অসংখ্য পরিবার।
এদিকে চলতি বর্ষায় জেলায় পাহাড়ধসে ইতোমধ্যে অন্তত ১৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। তবুও পাহাড়ের বুকেই কাটছে হাজারো মানুষের দিন-রাত।
জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, কক্সবাজারের বিভিন্ন পাহাড়ে প্রায় পাঁচ লাখ মানুষ বসবাস করছে। এর মধ্যে অন্তত পাঁচ হাজারের বেশি বসতঘর রয়েছে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থানে। প্রতি বছর বর্ষা এলেই এসব এলাকায় পাহাড়ধসের আশঙ্কা তৈরি হলেও স্থায়ী কোনো সমাধান হয়নি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কক্সবাজারে পাহাড়ধস কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগের একক ফল নয়। বছরের পর বছর নির্বিচারে পাহাড় কাটা, দখল, বন উজাড় এবং অপরিকল্পিত বসতি নির্মাণই এই বিপর্যয়ের মূল কারণ। বর্ষার পানি পাহাড়ের মাটি আলগা করে দিলে মুহূর্তেই ধসে পড়ছে বিশাল অংশ। শহরের পাহাড়তলী, বৈদ্যঘোনা, ঘোনারপাড়া, বাদশাঘোনা, খাজামঞ্জিল, লাইটহাউস, কলাতলী ও বাস টার্মিনাল এলাকাসহ অন্তত ১০টির বেশি স্থানে এখনও পাহাড় কাটার অভিযোগ রয়েছে। পাহাড় সমতল করে নতুন বসতভিটা ও বহুতল ভবন নির্মাণের প্রবণতা অব্যাহত থাকায় ঝুঁকি আরও বাড়ছে।
প্রশাসন বলছে, প্রাণহানি এড়াতে জেলাজুড়ে মাইকিং করা হচ্ছে। পাহাড়ের পাদদেশ ও নিম্নাঞ্চলে বসবাসকারীদের নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যেতে অনুরোধ জানানো হয়েছে। ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি এবং বিভিন্ন সংস্থার মাধ্যমে সচেতনতামূলক প্রচারণাও চালানো হচ্ছে।
তবে বাস্তব চিত্র ভিন্ন। স্থানীয়দের অনেকেই বলছেন, বিকল্প আশ্রয়ের ব্যবস্থা না থাকায় বাধ্য হয়েই ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় থাকতে হচ্ছে। কেউ আবার দীর্ঘদিনের বসতভিটা ছেড়ে যেতে চান না। ফলে সতর্কবার্তা থাকলেও অধিকাংশ পরিবার পাহাড় ছাড়ছে না।
এদিকে টানা বর্ষণে শুধু স্থানীয় বাসিন্দারাই নন, আতঙ্কে রয়েছেন রোহিঙ্গা শরণার্থীরাও। উখিয়ার বালুখালী, কুতুপালং, মধুরছড়া, লম্বাশিয়াসহ বিভিন্ন আশ্রয়শিবিরে পাহাড়ে বড় বড় ফাটল দেখা দিয়েছে এবং একাধিক স্থানে ভূমিধসের ঘটনা ঘটেছে। অন্তত ৩০ হাজার রোহিঙ্গা ভূমিধসের ঝুঁকিতে রয়েছে বলে জানিয়েছেন ক্যাম্পের নেতারা।
শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি) মোহাম্মদ মিজানুর রহমান জানান, অতিঝুঁকিতে থাকা অন্তত চার হাজার রোহিঙ্গাকে ইতোমধ্যে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। অন্যদেরও সতর্ক করা হচ্ছে এবং নিয়মিত প্রচারণা চালানো হচ্ছে।
কক্সবাজার আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, সাগরে লঘুচাপের প্রভাবে আরও ভারী বৃষ্টিপাত হতে পারে। একই সঙ্গে দমকা বা ঝোড়ো হাওয়ার আশঙ্কায় চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, মোংলা ও পায়রা সমুদ্রবন্দরকে তিন নম্বর স্থানীয় সতর্ক সংকেত দেখাতে বলা হয়েছে।
সচেতন মহলের মতে, শুধু বর্ষাকালে সতর্কতা জারি করলেই হবে না। অবৈধ পাহাড় কাটা বন্ধ, পাহাড় দখলমুক্ত করা, ঝুঁকিপূর্ণ বসতি অপসারণ এবং বিকল্প পুনর্বাসনের কার্যকর উদ্যোগ না নিলে প্রতিবছরই একইভাবে পাহাড়ধসে প্রাণহানির মিছিল দীর্ঘ হবে। পাহাড় বাঁচলেই বাঁচবে মানুষ, বাঁচবে কক্সবাজারের পরিবেশও।
