15 July 2026
অর্থের অভাবে থেমে গেছে সি-অ্যাম্বুলেন্স, দুর্ভোগে দ্বীপের রোগীরা

কক্সবাজারের দ্বীপ উপজেলা মহেশখালী ও কুতুবদিয়ার মানুষের জরুরি চিকিৎসাসেবার নতুন ভরসা হওয়ার কথা ছিল দুটি আধুনিক সি-অ্যাম্বুলেন্সের। প্রসূতি, হৃদরোগী কিংবা দুর্ঘটনায় আহত রোগীকে দ্রুত জেলা সদর হাসপাতালে পৌঁছে দিতে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে আনা হয়েছিল জলযান দুটি। কিন্তু প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর পরিচালন ব্যয় ও রক্ষণাবেক্ষণের অর্থের অভাবে সেগুলো এখন অচল।
একটি খালের কাদায় পড়ে আছে, অন্যটি দীর্ঘদিন অব্যবহারে যন্ত্রাংশ নষ্ট হয়ে কার্যত পরিত্যক্ত। ফলে জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে থাকা রোগীদের আবারও ভরসা করতে হচ্ছে কাঠের ট্রলার, ইঞ্জিনচালিত নৌকা কিংবা সুযোগমতো পাওয়া অন্য জলযানের ওপর। বর্ষা, বৈরী আবহাওয়া কিংবা গভীর রাতে সেই সংকট আরও তীব্র হয়ে ওঠে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, সময়মতো হাসপাতালে পৌঁছাতে না পারায় অনেক রোগীর অবস্থা আরও জটিল হয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে প্রসূতি, স্ট্রোক, হৃদরোগ ও দুর্ঘটনায় আহত রোগীদের ক্ষেত্রে প্রতিটি মিনিটই হয়ে উঠছে মূল্যবান।
কক্সবাজার সিভিল সার্জন কার্যালয় সূত্র জানায়, মহেশখালী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জন্য সি-অ্যাম্বুলেন্সটি বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে স্থানীয় সরকার সহায়তা প্রকল্প (এলজিএসপি) এবং কুতুবদিয়ারটি বিশ্বব্যাংকের সহযোগী সংস্থা রিসার্চ ট্রেনিং অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট ইন্টারন্যাশনাল (আরটিএমআই) প্রকল্পের মাধ্যমে সরবরাহ করা হয়। আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম) অ্যাম্বুলেন্স দুটি কিনে সিভিল সার্জন কার্যালয়ের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে হস্তান্তর করে।
কক্সবাজারের সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ ছাবের বলেন, ২০১৭ সালে শুরু হওয়া বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নের প্রকল্প থেকে চালক, সহকারী, জ্বালানি ও অন্যান্য পরিচালন ব্যয় বহন করা হতো। কিন্তু ২০২৪ সালের জুনে প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর অর্থের অভাবে সি-অ্যাম্বুলেন্স দুটি সচল রাখা সম্ভব হয়নি।
মহেশখালী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স সূত্র জানায়, কক্সবাজার-মহেশখালীর প্রায় আট কিলোমিটার নৌপথে জরুরি রোগী পরিবহনের জন্য ২০২৩ সালের মে মাসে সি-অ্যাম্বুলেন্সটি চালু হয়। প্রথম বছরে ৮৫ জন এবং ২০২৪ সালে আরও ১৭৯ জন রোগীকে উন্নত চিকিৎসার জন্য কক্সবাজারে আনা-নেওয়া করা হয়।
উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসক ডা. ফাহিম শাহরিয়ার শাওন বলেন, প্রতিদিন গড়ে ১০ থেকে ১২ জন রোগীকে উন্নত চিকিৎসার জন্য কক্সবাজারে পাঠাতে হয়। তাদের মধ্যে গুরুতর অসুস্থ রোগী, প্রসূতি ও জটিল গাইনি রোগী থাকেন।
অনেক সময় গভীর রাতেও জরুরি অস্ত্রোপচারের রোগী পাঠানোর প্রয়োজন হয়। সম্প্রতি মহেশখালী জেটিঘাটের পূর্ব পাশে গিয়ে দেখা যায়, খালের মধ্যে নোঙর করে রাখা সি-অ্যাম্বুলেন্সটি জোয়ারে পানিতে ভাসলেও ভাটার সময় কাদায় আটকে থাকে। দীর্ঘদিন ব্যবহার না হওয়ায় কোথাও রক্ষণাবেক্ষণের কোনো চিহ্নও নেই।
মহেশখালী উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মাহফুজুল ইসলাম জানান, অ্যাম্বুলেন্সটিতে ১৫০ লিটার অকটেন ও পাঁচ লিটার মবিল দিয়ে চারবার যাওয়া-আসা করা যায়। প্রতিবার যাওয়া-আসায় জ্বালানি খরচ হয় আট থেকে নয় হাজার টাকা। ৪০০ হর্সপাওয়ার ক্ষমতাসম্পন্ন এই জলযানে একসঙ্গে আট থেকে ১০ জন যাত্রী বহন করা সম্ভব। তবে ২০২৪ সালের অক্টোবরের পর এটি আর চালানো যায়নি।
তিনি বলেন, সি-অ্যাম্বুলেন্সটি বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে পরিচালিত ইনক্লুসিভ সার্ভিসেস অ্যান্ড অপরচুনিটিজ (আইএসও) প্রকল্পে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য একাধিকবার আবেদন করা হয়েছে। পরিচালন ব্যয় বেশি হওয়ায় এখনো সিদ্ধান্ত হয়নি। চলতি জুলাইয়ে এ বিষয়ে অগ্রগতি হতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।
মহেশখালীর বাসিন্দা মাহবুব রোকন বলেন, দ্বীপাঞ্চলের মানুষের চিকিৎসাসেবা এখনো অনেকটাই প্রকৃতির ওপর নির্ভরশীল। সি-অ্যাম্বুলেন্স বন্ধ থাকায় রাতে জটিল রোগী নিয়ে বের হলেও অনেক সময় নৌযান পাওয়া যায় না। এতে সাধারণ মানুষ চরম দুর্ভোগে পড়ছেন। কুতুবদিয়ার চিত্র আরও হতাশাজনক। দীর্ঘদিন অচল থাকার পর চলতি বছরের মে মাসে বড়ঘোপ ঘাটে জোয়ারের পানিতে সি-অ্যাম্বুলেন্সটি তলিয়ে যায়।
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রায় দুই বছর ধরেই এটি কার্যত কোনো সেবা দিতে পারেনি। সম্প্রতি বড়ঘোপ জেটিঘাট এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, দীর্ঘদিন অব্যবহৃত থাকায় অ্যাম্বুলেন্সটির বিভিন্ন যন্ত্রাংশ নষ্ট হয়ে গেছে।
ঘাটের টোল আদায়ের দায়িত্বে থাকা নজরুল ইসলাম বলেন, জনগণের প্রত্যাশা অনুযায়ী অ্যাম্বুলেন্সটি কখনোই নিয়মিত সেবা দিতে পারেনি। এখন এটি দেখভালেরও কেউ নেই।
উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স সূত্র জানায়, কুতুবদিয়ার ছয়টি ইউনিয়নে প্রায় দুই লাখ মানুষের বসবাস। ৫০ শয্যার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও ১২টি কমিউনিটি ক্লিনিক থাকলেও উন্নত চিকিৎসার জন্য অধিকাংশ রোগীকেই সাগরপথে কক্সবাজার বা চট্টগ্রামে যেতে হয়।
কুতুবদিয়া উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. রেজাউল হাসান বলেন, সাড়ে তিন বছর আগে একটি ঘূর্ণিঝড়ে অ্যাম্বুলেন্সটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। পরে সংস্কার করা হলেও বর্তমানে ব্যাটারির মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে। একবার যাওয়া-আসায় প্রায় পাঁচ হাজার টাকার জ্বালানি লাগে, যা উপজেলা পর্যায়ে বহন করা সম্ভব নয়। গত ডিসেম্বর বিশ্বব্যাংক, আইওএম ও ইউনিসেফকে বিষয়টি জানানো হলেও নতুন অর্থায়নের বিষয়ে এখনো কোনো ইতিবাচক সাড়া মেলেনি।
স্বাস্থ্য বিভাগ বলছে, নতুন প্রকল্প কিংবা বিশেষ সরকারি বরাদ্দ ছাড়া সি-অ্যাম্বুলেন্স দুটি সচল করার বাস্তবসম্মত কোনো উপায় নেই।
সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ ছাবের বলেন, সি-অ্যাম্বুলেন্স দুটি পুনরায় চালুর জন্য স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে একাধিকবার চিঠি পাঠানো হয়েছে। আবারও চিঠি দেওয়া হবে। একই সঙ্গে আইএসও প্রকল্পের আওতায় এগুলো পরিচালনার সুযোগ আছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
তিনি বলেন, দ্বীপাঞ্চলের মানুষের জরুরি স্বাস্থ্যসেবায় সি-অ্যাম্বুলেন্সের কার্যকর কোনো বিকল্প নেই। প্রয়োজনীয় অর্থায়ন নিশ্চিত করা গেলে খুব দ্রুতই এগুলো আবার চালু করা সম্ভব।
