গতিপথ পরিবর্তন করেছে শক্তিশালী টাইফুন 'বাভি'
প্রথমে চীন ও তাইওয়ানের দিকে অগ্রসর হওয়ার পূর্বাভাস থাকলেও শক্তিশালী টাইফুন ‘বাভি’ শেষ পর্যন্ত গতিপথ পরিবর্তন করে জাপানের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সাকিশিমা দ্বীপপুঞ্জের দিকে ধেয়ে যাচ্ছে। ঝড়টির প্রভাবে প্রবল ঝোড়ো হাওয়া, ভারী বৃষ্টিপাত, ভূমিধস ও আকস্মিক বন্যার আশঙ্কায় স্থানীয় কর্তৃপক্ষ সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি করেছে। আবহাওয়াবিদদের ধারণা, এটি গত কয়েক দশকের মধ্যে এ অঞ্চলের সবচেয়ে শক্তিশালী ও বিধ্বংসী টাইফুনগুলোর একটি হতে পারে।
বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানায়, শুক্রবার (১০ জুলাই) ভোরে বাভি তাইওয়ানের কাছাকাছি অবস্থান করে সাকিশিমা দ্বীপপুঞ্জের দিকে অগ্রসর হচ্ছিল। ঝড়টির কেন্দ্রস্থলে বাতাসের সর্বোচ্চ গতিবেগ ছিল ঘণ্টায় ১৬২ কিলোমিটার। তবে এর বিস্তৃত বায়ুপ্রবাহের কারণে ঘণ্টায় প্রায় ২০০ কিলোমিটার বেগের দমকা হাওয়া বইতে পারে। প্রায় এক হাজার কিলোমিটারজুড়ে বিস্তৃত এই টাইফুনকে ১৯৮৭ সালের পর এ অঞ্চলের সবচেয়ে বড় আকারের ঝড় হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
বাণিজ্যিক আবহাওয়া পূর্বাভাস প্রতিষ্ঠান অ্যাকুওয়েদারের বিশেষজ্ঞ জেসন নিকোলস বলেন, বৃহস্পতিবার থেকে ঝড়ের শক্তি কিছুটা কমতে শুরু করলেও শুক্রবার থেকে সোমবার (১৩ জুলাই) পর্যন্ত এটি অত্যন্ত বিপজ্জনক অবস্থায় থাকবে।
বিজ্ঞানীদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ক্রমেই শক্তিশালী হয়ে উঠছে টাইফুনগুলো। এর সঙ্গে চলতি বছরে সম্ভাব্য এল নিনো পরিস্থিতি যুক্ত হওয়ায় তাপমাত্রা বৃদ্ধি এবং আরও ঘন ঘন শক্তিশালী ঝড়ের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। ফলে চীন, জাপান ও তাইওয়ান সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আগের তুলনায় বেশি তীব্র প্রাকৃতিক দুর্যোগের মুখোমুখি হচ্ছে।
প্রথমদিকে বাভির সম্ভাব্য আঘাতের কেন্দ্র হিসেবে চীন ও তাইওয়ানকে বিবেচনা করে ব্যাপক প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছিল। চীনের জাতীয় আবহাওয়া কেন্দ্র জানিয়েছিল, ঝড়টি উত্তর তাইওয়ানের পাশ দিয়ে অতিক্রম করে শনিবার (১১ জুলাই) সন্ধ্যায় পূর্বাঞ্চলীয় ফুজিয়ান প্রদেশে আঘাত হানতে পারে।
তাইওয়ানের কেন্দ্রীয় আবহাওয়া প্রশাসনের পূর্বাভাসকারী জেসন চ্যাং রয়টার্সকে বলেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এত বড় আকারের টাইফুন খুবই বিরল। তাঁর মতে, বাভি সরাসরি আঘাত হানলে এটি ১৯৮৭ সালের পর তাইওয়ানে আঘাত হানা সবচেয়ে বড় টাইফুন হতে পারত। রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের কং-রে টাইফুনের পর এটিই দেশটির দিকে ধেয়ে আসা সবচেয়ে শক্তিশালী ঝড় হওয়ার আশঙ্কা ছিল। কং-রে টাইফুনে তিনজন নিহত হয়েছিলেন।
এর আগে চীনের উপকূলে টাইফুন ‘মায়সাক’-এর ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা চলছিল। নতুন ঝড়ের আশঙ্কায় তাইওয়ানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় প্রায় ২৯ হাজার সেনা প্রস্তুত রাখে এবং উপকূলীয় এলাকাগুলোতে সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি করে।
কর্তৃপক্ষ জানায়, রাজধানী তাইপের আশপাশের উত্তরাঞ্চলের পার্বত্য এলাকায় সর্বোচ্চ এক মিটার পর্যন্ত বৃষ্টিপাত হতে পারে। সম্ভাব্য জলাবদ্ধতা মোকাবিলায় তাইপেই সিটি প্রশাসন বাসিন্দাদের জন্য বালুর বস্তা সংগ্রহকেন্দ্র স্থাপন করে। উত্তর ও পূর্বাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকায় সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয় এবং আর্থিক বাজারও সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়।
যদিও আবহাওয়াবিদদের ধারণা, বাভি সরাসরি তাইওয়ানে আঘাত নাও হানতে পারে, তবে শুক্রবার গভীর রাত থেকে সেখানে ভারী বৃষ্টিপাত ঘটাতে পারে। এরপর এটি চীনের উপকূলের দিকে অগ্রসর হয়ে ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়বে। সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে তাইপেইয়ের প্রধান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে নির্ধারিত সব ফ্লাইট বাতিল করেছে বিমান সংস্থাগুলো।
অন্যদিকে সাকিশিমা দ্বীপপুঞ্জে সম্ভাব্য আঘাতের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর স্থানীয় বাসিন্দা ও ব্যবসায়ীরা ঘরবাড়ি এবং দোকানপাট সুরক্ষিত করতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। নিরাপত্তার কারণে ডজনখানেক অভ্যন্তরীণ ও আঞ্চলিক ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে। জনপ্রিয় পর্যটন দ্বীপ ইশিগাকিতে বাসিন্দারা প্রয়োজনীয় খাদ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য মজুত করছেন। স্থানীয় সুপারমার্কেটগুলোতে শুকনো খাবারের সংকট দেখা দিয়েছে। পাশাপাশি পাবলিক বিচ, উপকূলীয় পার্ক এবং স্থানীয় ফেরি টার্মিনাল সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।
