বন্যায় সাপের কামড় এড়াতে যা করবেন
বন্যা শুধু মানুষের ঘরবাড়ি, ফসল ও গবাদিপশুর ক্ষতিই করে না, এ সময় বেড়ে যায় সাপের উপদ্রবও। বন্যার পানিতে প্রাকৃতিক আবাসস্থল তলিয়ে যাওয়ায় সাপ নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে বাড়িঘর, আঙিনা, ক্ষেত এমনকি জনবসতিপূর্ণ এলাকাতেও ঢুকে পড়ে। তাই বন্যার সময় ও পরে বাড়তি সতর্কতা জরুরি বলে পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বন্যার পানিতে সাপের স্বাভাবিক বাসস্থান নষ্ট হয়ে যায়। ফলে তারা শুকনো জায়গার খোঁজে মানুষের বসতবাড়ির দিকে চলে আসে। এ কারণে বন্যাকবলিত এলাকায় সাপের মুখোমুখি হওয়ার ঝুঁকি অনেক বেড়ে যায়।
বাংলাদেশে বিষধর ও নির্বিষ—দুই ধরনের সাপই দেখা যায়। বিষধর সাপের মধ্যে চন্দ্রবোড়া, গোখরা ও কালাচ উল্লেখযোগ্য। এছাড়া নির্বিষ ইঁদুরখেকো সাপও অনেক সময় আকারের কারণে ভয় সৃষ্টি করে। তাই যেকোনো সাপ দেখলেই সতর্ক থাকা প্রয়োজন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বন্যার আগেই বাড়ির দেয়াল, দরজা-জানালার ফাঁকফোকর বন্ধ করে রাখা উচিত, যাতে সাপ সহজে ঘরে ঢুকতে না পারে। বাড়ির চারপাশ পরিষ্কার রাখা, ঝোপঝাড় কেটে ফেলা এবং কাঠ বা আবর্জনার স্তূপ সরিয়ে ফেললেও সাপের লুকিয়ে থাকার সুযোগ কমে।
পরিবারের সবাইকে, বিশেষ করে শিশুদের সাপ সম্পর্কে সচেতন করা জরুরি। সাপ দেখলে কাছে না যাওয়া এবং বড়দের জানানো—এই অভ্যাস ছোটবেলা থেকেই শেখানো উচিত।
বন্যার সময় প্রয়োজন ছাড়া বাইরে বের না হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। যদি পানির মধ্যে হাঁটতেই হয়, তাহলে লম্বা লাঠি দিয়ে সামনে পরীক্ষা করে এগোনো ভালো। এ সময় লম্বা প্যান্ট ও বুট পরলে সাপের কামড়ের ঝুঁকি কিছুটা কমে।
বন্যার পানিতে ভেসে আসা গাছের ডাল, কাঠ বা অন্যান্য আবর্জনার নিচেও সাপ লুকিয়ে থাকতে পারে। তাই এসব সরানোর সময় খুব সতর্ক থাকতে হবে। রাতে বাড়ির ভেতর ও আশপাশে পর্যাপ্ত আলো রাখলেও সাপের চলাচল কিছুটা কমে।
বন্যার পানি নেমে যাওয়ার পরও ঝুঁকি শেষ হয় না। ঘরে ঢোকার আগে অন্ধকার কোণা, আসবাবের নিচে, আলমারির পেছনে বা রান্নাঘরের বিভিন্ন জায়গা ভালোভাবে পরীক্ষা করে নিতে হবে। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার সময় হাতে দস্তানা, পায়ে বুট ও শরীর ঢাকা পোশাক ব্যবহার করা নিরাপদ।
আবর্জনা বা ভেজা জিনিসপত্র সরানোর সময় কখনো খালি হাতে হাত দেওয়া উচিত নয়। কোদাল, রেক বা লাঠির মতো সরঞ্জাম ব্যবহার করলে ঝুঁকি কমে।
যদি সাপের মুখোমুখি হন, তাহলে শান্ত থাকতে হবে। সাপের কাছে যাওয়া, ধরার চেষ্টা করা বা তাড়ানোর চেষ্টা করা ঠিক নয়। নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে সাপটিকে সরে যাওয়ার সুযোগ দিতে হবে। ঘরের ভেতরে সাপ ঢুকে পড়লে নিজে না ধরে সংশ্লিষ্ট উদ্ধারকারী বা প্রশিক্ষিত ব্যক্তির সহায়তা নেওয়া উচিত।
কোনো ব্যক্তিকে সাপে কামড় দিলে দ্রুত হাসপাতালে নিতে হবে। আক্রান্ত অঙ্গ যতটা সম্ভব স্থির রাখতে হবে। বিষ চুষে বের করা, ক্ষত কেটে দেওয়া বা শক্ত করে কাপড় বেঁধে দেওয়ার মতো ভুল পদ্ধতি ব্যবহার করা উচিত নয়, কারণ এতে আরও ক্ষতি হতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা আরও জানান, অনেকেই মনে করেন সাপ শুধু বিরক্ত করলে কামড় দেয় বা বন্যার সময় ঘরে ঢোকে না। বাস্তবে বন্যার সময় সাপ ভয় ও চাপের কারণে অস্বাভাবিক আচরণ করতে পারে এবং নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে মানুষের ঘরেও ঢুকে পড়ে। তাই বিষধর হোক বা নির্বিষ—যেকোনো সাপ দেখলেই সতর্ক থাকতে হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সচেতনতা, আগাম প্রস্তুতি এবং সঠিক পদক্ষেপই বন্যার সময় ও পরে সাপের কামড়ের ঝুঁকি কমানোর সবচেয়ে কার্যকর উপায়। বন্যাকবলিত এলাকায় নিজের নিরাপত্তার পাশাপাশি পরিবারের সবাইকে এ বিষয়ে সচেতন করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
