মূল খবরে ফিরে যান
যা দেখছেন, PDF-এও সেটাই থাকবে। প্রিন্ট ডায়ালগে “Save as PDF” বেছে নিন।
Tuesday, 07 July 2026
অন্যান্য
banglabrief.com/
সংস্করণ
06 July 2026
অন্যান্য

ট্রাম্পের এক ফোনেই ফুটবলারের লাল কার্ড প্রত্যাহার, পর্দার আড়ালে যা ঘটেছে

বিশ্বকাপের শেষ ষোলোর ম্যাচে বেলজিয়ামের মুখোমুখি হওয়ার আগে বড় স্বস্তি পেয়েছে স্বাগতিক যুক্তরাষ্ট্র। রাউন্ড অব বত্রিশে বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার বিপক্ষে সরাসরি লাল কার্ড দেখা মার্কিন স্ট্রাইকার ফোলারিন বালোগানের এক ম্যাচের বাধ্যতামূলক নিষেধাজ্ঞা আকস্মিকভাবে স্থগিত করেছে ফিফা।

ফিফার এই সিদ্ধান্ত ফুটবল বিশ্বে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। অনেক ফুটবল বিশ্লেষক ও বোদ্ধা এটিকে বিতর্কিত বলেই মনে করছেন। তবে সিদ্ধান্তটিকে স্বাগত জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে তিনি লেখেন, ‘সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য এবং একটি বড় অবিচার সংশোধন করায় ফিফাকে ধন্যবাদ।’

ফিফা সভাপতিকে ট্রাম্পের ফোন

ব্রিটিশ গণমাধ্যম ডেইলি মেইল এর এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্রাইকার ফোলারিন বালোগানের এক ম্যাচের নিষেধাজ্ঞা পুনর্বিবেচনার জন্য মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ব্যক্তিগতভাবে ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফ্যান্তিনোর সঙ্গে ফোনে কথা বলেন। প্রতিবেদনটি প্রকাশের পর ফুটবল অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, হোয়াইট হাউসের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, বালোগানের নিষেধাজ্ঞা স্থগিতের সিদ্ধান্ত ঘোষণার আগে ট্রাম্প নিজেই ইনফ্যান্তিনোর সঙ্গে যোগাযোগ করেন। ফিফার সিদ্ধান্ত প্রকাশের কিছুক্ষণ পরই ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে এক পোস্টে সংস্থাটিকে ধন্যবাদ জানান।

এদিকে, ট্রাম্পের কথিত এই হস্তক্ষেপ নিয়ে ফুটবল মহলে বিতর্কও তৈরি হয়েছে। সমালোচকদের অনেকে মনে করছেন, এমন পদক্ষেপ টুর্নামেন্টের ফেয়ার প্লে নীতিকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। একই সঙ্গে কয়েকটি মার্কিন গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, ট্রাম্প, বাণিজ্য সচিব হাওয়ার্ড লাটনিক এবং হোয়াইট হাউসের টাস্কফোর্স প্রধান অ্যান্ড্রু গিউলিয়ানি বালোগানের বহিষ্কারাদেশ চ্যালেঞ্জ করতে একটি আইনি দল গঠন করেছিলেন।

স্তম্ভিত ফুটবল বিশ্ব, ক্ষুব্ধ বেলজিয়ামও

ফিফার এই বিতর্কিত সিদ্ধান্তে বেলজিয়াম শিবিরে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। এক বিবৃতিতে বেলজিয়াম ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন (আরবিএফএ) জানায়, তারা এ সিদ্ধান্তে ‘স্তম্ভিত’ এবং ফুটবলের ফেয়ার প্লে ও সততার নীতি রক্ষায় সম্ভাব্য সব ধরনের পদক্ষেপ বিবেচনা করছে।

এ বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন বেলজিয়ামের প্রধান কোচ রুডি গার্সিয়াও। তিনি বলেন, ‘আমি জানতাম না যে বিশ্বকাপে ৫ জুলাই এখন ১ এপ্রিল হয়ে গেছে। আমরা ফুটবল এবং এর নৈতিকতা রক্ষা করার চেষ্টা করছি।’

এদিকে বেলজিয়ামের গোলরক্ষক থিবো কোর্তোয়া বলেন, সিদ্ধান্তটি তাদের জন্য বিস্ময়কর ছিল। তাঁর ভাষায়, ‘এটি যদি আগে জানানো হতো, তাহলে হয়তো আমরা প্রস্তুতি আরও ভালোভাবে নিতে পারতাম। তবে খেলোয়াড় হিসেবে আমাদের লক্ষ্য অপরিবর্তিত—আমরা জয়ের জন্যই মাঠে নামব।’

বেলজিয়াম ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন আরও জোর দিয়ে বলেছে, এই পদক্ষেপটি ফিফার নিজস্ব টুর্নামেন্ট বিধিমালার সম্পূর্ণ পরিপন্থী। সরাসরি লাল কার্ডের ক্ষেত্রে পরবর্তী ম্যাচটিতে স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিষিদ্ধ থাকার নিয়মটি গত মে মাসে অংশগ্রহণকারী দলগুলোর কাছে পাঠানো ফিফা বিশ্বকাপের এক সার্কুলারেও পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছিল।

এই বিষয়ে ফিফা কোনো মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। উল্লেখ্য, গত বছর ডোনাল্ড ট্রাম্প নোবেল শান্তি পুরস্কার পেতে ব্যর্থ হওয়ার পর, ফিফা তড়িঘড়ি করে একটি ‘ফিফা পিস প্রাইজ’ (ফিফা শান্তি পুরস্কার) তৈরি করে তা ট্রাম্পের হাতে তুলে দিয়েছিল।

পর্দার আড়ালে আসলে কী চলেছে

ট্রাম্প যে এই বিষয়ে ইনফ্যান্তিনোকে লাল কার্ডের সিদ্ধান্তটি পুনর্বিবেচনা করতে ফোন করেছিলেন, সেই খবর প্রকাশের আগেই ট্রুথ সোশ্যালে মার্কিন প্রেসিডেন্টের পোস্টটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক জল্পনা-কল্পনার জন্ম দেয়। সেই জল্পনার আগুনে ঘি ঢালেন ‘বারস্টুল স্পোর্টস’-এর প্রধান ডেভ পোর্টনয়।

ফিফার সিদ্ধান্ত নিশ্চিত হওয়ার কয়েক ঘণ্টা আগে পোর্টনয় এক্সে (সাবেক টুইটার) লিখেছিলেন, ‘ডেভি পিচের ফুটবল সূত্রগুলো বলছে যে খুব শিগগিরই একটি লাল কার্ড বাতিল হতে যাচ্ছে।’ এরপর বালোগানের নিষেধাজ্ঞা স্থগিতের খবর আসতেই পোর্টনয় ট্রাম্পের সঙ্গে নিজের একটি এডিটেড ছবি (যেখানে দুজনের মাথাতেই ‘ইউএস সকার’-এর ক্যাপ ছিল) পোস্ট করে ইঙ্গিত দেন যে ট্রাম্প আসলেই এর পেছনে ছিলেন।

তিনি লেখেন, অনেকেই আমাকে জিজ্ঞেস করছেন কীভাবে এই লাল কার্ড বাতিল হলো? পর্দার আড়ালে কী ঘটেছিল? কে এটা করালো? কোন সূত্রের ভিত্তিতে আমি আমার পুরো সম্মান বাজি রেখে এই ডেভি পিচ বোমা ফাটিয়েছিলাম? একজন মহান সাংবাদিক কখনোই তার সূত্র প্রকাশ করেন না। দুঃখিত।’

জানা গেছে, মার্কিন ফুটবল ফেডারেশনের আইনি দল ফিফার কাছে একটি আবেদন জমা দিয়েছিল, যেখানে তাদের মূল যুক্তি ছিল বালোগানকে লাল কার্ড দেখানোর আগে রেফারিরা স্লো-মোশন রিপ্লের ভুল ব্যবহার করেছিলেন।

নিজের দায় এড়িয়ে ফুটবলের জন্য ভালো বললেন যুক্তরাষ্ট্র কোচ

ফিফার এই সিদ্ধান্তের প্রতিক্রিয়ায় যুক্তরাষ্ট্র জাতীয় ফুটবল দল এক প্রতিক্রিয়ায় জানিয়েছে, ‘আমরা শৃঙ্খলা কমিটির সিদ্ধান্ত মেনে নিচ্ছি এবং ফোলারিন বালোগান আগামী ম্যাচ খেলার যোগ্য হওয়ায় আনন্দিত। আমাদের পুরো মনোযোগ এখন বেলজিয়াম ম্যাচের দিকে।’

যুক্তরাষ্ট্রের কোচ মাউরিসিও পচেত্তিনো অবশ্য জোর দিয়ে বলেছেন যে বালোগানের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের এই আইনি প্রক্রিয়ার সঙ্গে তিনি জড়িত ছিলেন না। ম্যাচ পূর্ববর্তী সংবাদ সম্মেলনে পচেত্তিনো বলেন, ‘ফেডারেশন কঠোর পরিশ্রম করছিল। আমাদের প্রধান নির্বাহী জেটি ব্যাডসন এবং পুরো ফেডারেশন আমাদের পরিস্থিতি দেখভাল করছিল। আমি এতে জড়িত ছিলাম না এবং বেলজিয়ামের বিরুদ্ধে দল প্রস্তুত করায় ব্যস্ত ছিলাম।’ তবে এমন সিদ্ধান্তকে সাধুবাদ জানিয়ে তিনি বলেন, ‘ফুটবলের জন্য এটি ভালো যে মাঠের বাস্তবের বাইরে স্লো-মোশনের ওপর ভিত্তি করে নেওয়া একটি ভুল সিদ্ধান্তকে পরিবর্তন করা গেছে।’

জানা গেছে, রোববার সকাল নাগাদ স্বাগতিক দলকে ফিফার সিদ্ধান্তের কথা জানানো হলেও খেলোয়াড়রা তাৎক্ষণিকভাবে তা জানতে পারেননি, বরং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের বরাতে অনেকে বিষয়টি প্রথম জানতে পারেন। মার্কিন তারকা ক্রিস রিচার্ডস বলেন, ‘আমরা নিশ্চিত ছিলাম না যে এটি সত্যি কি না। আজকাল এআই (কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা) এর যুগে অনেক প্রশ্ন থাকে। তবে শেষ পর্যন্ত আমরা সোশ্যাল মিডিয়া থেকেই জানতে পারি এবং সত্যতা নিশ্চিত হওয়ার পর দারুণ লেগেছে।’

লাল কার্ডের ঘটনা প্রসঙ্গে বালোগান নিজেই বলেছিলেন, ‘প্রথমত, এটি সম্পূর্ণ অনিচ্ছাকৃত ছিল। রেফারি যে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তা তার বিষয়, তবে আমার মনে হয় না এটি সঠিক সিদ্ধান্ত ছিল। অনিচ্ছাকৃত হওয়ার কারণে বড়জোর একটি হলুদ কার্ড দেওয়া ন্যায্য হতো।’ অন্যদিকে মার্কিন অধিনায়ক ক্রিশ্চিয়ান পুলিসিক বলেন, ‘আমরা এখানে আসার পথেই এটা জানতে পারি। প্রথমে মনে হয়েছিল—আরে সত্যি তো? এরপর মনে হলো, এটা দারুণ খবর।’

পেছনের দরজা দিয়ে নিয়ম বদল ফিফার

ফিফার টুর্নামেন্ট বিধিমালা অনুযায়ী লাল কার্ডের শাস্তি হিসেবে এক ম্যাচের নিষেধাজ্ঞা বাধ্যতামূলক এবং পূর্বে ফিফা কর্মকর্তারাও নিশ্চিত করেছিলেন যে লাল কার্ডের বিরুদ্ধে কোনো দলের আপিল করারও সুযোগ নেই। তবে ফিফার জুডিশিয়াল কমিটি এবার ২৭ নম্বর ধারার একটি বিরল ফাঁকফোকর ব্যবহার করে এই নিষেধাজ্ঞা এড়াতে সক্ষম হয়েছে। 

ফিফার ডিসিপ্লিনারি কমিটি তাদের শৃঙ্খলা বিধির ২৭ নম্বর ধারা অনুযায়ী এই বিশেষ সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে এক বিবৃতিতে নিশ্চিত করেছে। ফুটবলের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি জানিয়েছে, বালোগানের নিষেধাজ্ঞা আগামী এক বছরের জন্য স্থগিত থাকবে। তবে এই সময়ের মধ্যে তিনি যদি একই ধরনের কোনো গুরুতর ফাউল বা নিয়মভঙ্গ না করেন, তবে এই নিষেধাজ্ঞা আর কার্যকর হবে না।

প্রসঙ্গত, পর্তুগালের অধিনায়ক ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর ক্ষেত্রেও ফিফা এই একই পরীক্ষামূলক নিয়ম প্রয়োগ করেছিল। ২০২৫ সালের নভেম্বরে আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচে কনুই দিয়ে আঘাত করার কারণে রোনালদোকে লাল কার্ড দেখানো হয়েছিল। এরপর আর্মেনিয়ার বিপক্ষে ম্যাচে এক ম্যাচের নিষেধাজ্ঞা কাটানোর পর, ফিফা হস্তক্ষেপ করে তাঁর বাকি দুই ম্যাচের নিষেধাজ্ঞা এক বছরের জন্য স্থগিত করে দেয়, যার ফলে তিনি চলতি বিশ্বকাপের শুরু থেকেই পর্তুগালকে নেতৃত্ব দিতে পারছেন।

বালোগানের লাল কার্ড নিয়ে এত বিতর্ক কেন ? 

গত ১ জুলাই শেষ ষোলোর ম্যাচে বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার বিপক্ষে প্রথমার্ধে দারুণ এক গোল করে দলকে এগিয়ে দেন ফোলারিন বালোগান। তবে ম্যাচের ৬১তম মিনিটে লাল কার্ডের ঘটনা ঘটে। বল দখলের লড়াইয়ে বসনিয়ার মুহারেমোভিচ এবং যুক্তরাষ্ট্রের বালোগান একসঙ্গে চ্যালেঞ্জে যান। সেই সময় বল নিয়ে সামনে এগিয়ে যাচ্ছিলেন মুহারেমোভিচ, আর পেছন থেকে তার ডান পায়ে কঠোর ট্যাকল করেন বালোগান।

ঘটনার পর রেফারি ভিএআরের সাহায্য নেন এবং ৬৪তম মিনিটে সরাসরি লাল কার্ড দেখিয়ে বালোগানকে মাঠ ছাড়ার নির্দেশ দেন।

চলতি বিশ্বকাপে এখন পর্যন্ত তিনটি গোল করে যুক্তরাষ্ট্রকে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন বালোগান। দলের গুরুত্বপূর্ণ এই খেলোয়াড়কে হারিয়ে ম্যাচ শেষে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানান মার্কিন কোচ মাউরিসিও পচেত্তিনো। তবে ফিফার নিয়ম অনুযায়ী সরাসরি লাল কার্ডের কারণে এক ম্যাচের নিষেধাজ্ঞা বাধ্যতামূলক হওয়ায় এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিলের সুযোগ ছিল না। ফিফা কোডের ৬৬.৪ ধারা অনুযায়ী এ ধরনের শাস্তি স্বয়ংক্রিয়ভাবে কার্যকর হয়।