পুরুষের টাক মাথায় চুমু দিয়ে হতো লিপস্টিক পরীক্ষা
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সম্প্রতি একটি পুরোনো ছবি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। ছবিতে দেখা যায়, এক নারী ধারাবাহিকভাবে একজন টাক মাথার পুরুষের মাথায় চুম্বন করছেন। প্রথম দেখায় এটি অনেকের কাছে মজার বা সাজানো দৃশ্য মনে হলেও, বাস্তবে ছবিটির পেছনে রয়েছে প্রসাধনী শিল্পের এক ব্যতিক্রমী ইতিহাস।
১৯৫০-এর দশকে যুক্তরাষ্ট্রের কিছু প্রসাধনী প্রতিষ্ঠান নতুন লিপস্টিকের মান যাচাই করতে অভিনব একটি পদ্ধতি ব্যবহার করত। চুলবিহীন ও মসৃণ মাথার ত্বকে লিপস্টিকের দাগ স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠায় টাক মাথার পুরুষদের পরীক্ষামূলক মডেল হিসেবে বেছে নেওয়া হতো। এতে বিভিন্ন লিপস্টিকের রং, স্থায়িত্ব এবং দাগের বৈশিষ্ট্য সহজে তুলনা করা সম্ভব হতো।
পরীক্ষার সময় নারী স্বেচ্ছাসেবীরা নতুন লিপস্টিক ব্যবহার করে ওই ব্যক্তিদের মাথা বা মুখে চুম্বন করতেন। পরে গবেষকরা দাগের আকার, রঙের ঘনত্ব, ছড়িয়ে পড়ার ধরন এবং কতক্ষণ পর্যন্ত তা অক্ষত থাকে, সেসব বিষয় বিশ্লেষণ করতেন। সে সময়ের প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতায় এটি ছিল বাস্তব ব্যবহারভিত্তিক একটি কার্যকর পরীক্ষাপদ্ধতি।
এই পরীক্ষার সবচেয়ে পরিচিত ছবিগুলো তুলেছিলেন মার্কিন আলোকচিত্রী ইয়েল জোয়েল (Yale Joel)। তিনি সে সময় Life ম্যাগাজিনের জন্য বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম নিয়ে প্রতিবেদন তৈরি করতেন। পরবর্তীতে তার তোলা ছবিগুলো ঐতিহাসিক আর্কাইভে সংরক্ষিত হয় এবং ডিজিটাল যুগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নতুন করে ভাইরাল হয়ে ওঠে।
তবে ইতিহাসবিদরা বলছেন, এ নিয়ে একটি ভুল ধারণাও প্রচলিত রয়েছে। অনেকেই মনে করেন, সে সময় সব প্রসাধনী কোম্পানিই নিয়মিত টাক মাথার পুরুষদের দিয়ে লিপস্টিক পরীক্ষা করত। বাস্তবে এটি ছিল মাত্র কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের ব্যবহৃত একটি বিশেষ পরীক্ষামূলক পদ্ধতি; পুরো প্রসাধনী শিল্পে এটি কখনোই বাধ্যতামূলক বা সর্বজনীন ছিল না।
সে সময় লিপস্টিকের কার্যকারিতা যাচাইয়ে আরও নানা পদ্ধতি ব্যবহার করা হতো। স্বেচ্ছাসেবীদের দীর্ঘ সময় পণ্য ব্যবহার করিয়ে ফলাফল পর্যবেক্ষণ, কাপড় বা কাগজে দাগ পরীক্ষা, কাচের মতো মসৃণ পৃষ্ঠে রঙের স্থায়িত্ব যাচাই এবং বিভিন্ন ধরনের ত্বকে ব্যবহার করে প্রতিক্রিয়া মূল্যায়ন ছিল সেসবের মধ্যে উল্লেখযোগ্য।
বর্তমানে প্রসাধনী গবেষণায় প্রযুক্তির ব্যাপক উন্নয়ন হয়েছে। এখন ডার্মাটোলজিস্টের তত্ত্বাবধানে ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল, কৃত্রিম ত্বকে পরীক্ষা, ডিজিটাল ইমেজ বিশ্লেষণ, ল্যাবভিত্তিক স্থায়িত্ব পরীক্ষা এবং ভোক্তা প্যানেলের মাধ্যমে পণ্যের কার্যকারিতা মূল্যায়ন করা হয়। একই সঙ্গে অধিকাংশ দেশেই প্রসাধনী পরীক্ষায় কঠোর নিরাপত্তা ও নৈতিক মানদণ্ড অনুসরণ বাধ্যতামূলক।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আজকের দৃষ্টিতে টাক মাথার পুরুষদের দিয়ে লিপস্টিক পরীক্ষা অস্বাভাবিক মনে হলেও, সে সময়ের বাস্তবতা ও প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতার প্রেক্ষাপটে এটি ছিল একটি কার্যকর গবেষণাপদ্ধতি। আর ইয়েল জোয়েলের ক্যামেরায় বন্দি সেই মুহূর্তগুলো এখন শুধু কৌতূহলের বিষয় নয়, বরং প্রসাধনী শিল্পের ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল হিসেবেও বিবেচিত হয়।
সূত্র: স্মিথসোনিয়ান ম্যাগাজিন, মিডিয়াম।
