শেরপুরে দুই নদীর ভাঙনে বিলীন ঘরবাড়ি ও ফসলি জমি
বর্ষার উদ্যাম ঢলে থৈ থৈ পানি। সে পানির কলরবে যেখানে জীবনের স্পন্দন থাকার কথা, সেখানেই এখন মৃত্যুর সমতুল্য হাহাকার। নদী যার কাছে জীবন, সেই নদীই আজ কেড়ে নিচ্ছে জীবনের শেষ সম্বলটুকু।
উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল আর বর্ষার পানি বাড়ার সাথে সাথে বগুড়ার শেরপুর উপজেলায় বুকচাপা কান্না ভারী হয়ে উঠেছে বাঙ্গালী ও করতোয়া নদীর পাড়ে। নদীর রাক্ষসী রূপ কেড়ে নিচ্ছে কৃষকের সোনার ফসল ফলা জমি, শত বছরের ভিটেমাটি আর মাথা গোঁজার শেষ আশ্রয়টুকু। চোখের সামনেই নদীগর্ভে তলিয়ে যাচ্ছে পূর্বপুরুষের স্মৃতি আর আগামীর স্বপ্ন।
“রাইতে ঘুম আহে না বাপ। কোনো সময় যে নদী ঘরটা তুল্যা নিয়া যায়! বাপদাদার ভিটা আছিল, সেটাও শ্যাষ। এহন আমরা যামু কই?” কান্নাভেজা কণ্ঠে কথাগুলো বলছিলেন সুঘাট এলাকার মাজেদা খাতুনসহ অনেকে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বর্ষার পানি বৃদ্ধির ফলে শেরপুর উপজেলার বাঙ্গালী ও করতোয়া নদীর তীব্র স্রোতে অন্তত ১৪টি পয়েন্টে ভয়াবহ নদীভাঙন দেখা দিয়েছে। এর মধ্যে বাঙ্গালী নদীর ভাঙনে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে খানপুর, সুঘাট ও খামারকান্দি ইউনিয়ন। অন্যদিকে করতোয়া নদী গিলে খাচ্ছে গাড়ীদহ ও মির্জাপুর ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকা।
পানি উন্নয়ন বোর্ড ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের তথ্য এবং সরেজমিনে দেখা যায়, উপজেলার দুই নদীর বিভিন্ন পয়েন্টে ভাঙ্গন মারাত্মক আকার ধারণ করেছে: বাঙালি নদী এলাকার খানপুর ইউনিয়নের বড়ইতলি উত্তর পাড়ায় নদীর ডান তীরে ২৪০ মিটার, চকখানপুর হাওলাদার হিন্দু পাড়া ও শ্মশান মন্দির সংলগ্ন ২০০ মিটার এবং দহখানপুর পাড়ায় ১৫০ মিটার এলাকা ভাঙনের কবলে পড়েছে, সুঘাট ও সীমাবাড়ী ইউনিয়ন: সুঘাট ইউনিয়ন পরিষদ ও সুঘাট বাজার সংলগ্ন বাম তীরে ৫০০ মিটার, মধ্যেভাগ গ্রামে ১৫০ মিটার, বিনোতপুর সাহেববাড়ী সংলগ্ন ডান তীরে ৬০০ মিটার এবং সুঘাট ও সীমাবাড়ী ইউনিয়নের সীমান্তবর্তী চকপাহাড়ী/ঘাসুরীয়া গ্রামে প্রায় ৬০০ মিটার নদীগর্ভে তলিয়ে যাচ্ছে, খামারকান্দি ইউনিয়ন: বিলনোথার গ্রামে বাম তীরে ৮০ মিটার এবং ঝাঝর উত্তর পাড়ায় ডান তীরে ২০০ মিটার এলাকা তীব্র ভাঙনের মুখে, করতোয়া নদী এলাকার সুঘাট ইউনিয়নের মোহনা (মাওনা) এলাকায় প্রায় ১৫০ মিটার এবং বিনোদপুর উত্তরপাড়ায় ৬০ মিটার এলাকা ভাঙছে, গাড়ীদহ ইউনিয়নের কালশিমাটি স্কুল সংলগ্ন বাম তীরে ২০০ মিটার এবং ফুলবাড়ি ঘাটপার ব্রিজ ও মসজিদ সংলগ্ন ১৫০ মিটার নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে, মির্জাপুর ইউনিয়নের কাশিয়াবালা গ্রামের রাস্তা ও মাদ্রাসা সংলগ্ন ডান তীরে ২০০ মিটার এলাকা আশঙ্কাজনকভাবে ভাঙছে।
ভিটেমাটি ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ ধর্মীয় উপাসনালয় রক্ষায় নদীপাড়ের মানুষ এখন চরম আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন। গৃহহীন পরিবারগুলো খোলা আকাশের নিচে ও স্বজনদের আশ্রয়ে দিনাতিপাত করছে। এ বিষয়ে স্থানীয় ভুক্তভোগী চান মিয়া, বাবলু, বুলু, এবাদুল্লাহ, কমরউদ্দিন, আলাউদ্দিন, সায়েদ আলী, ঈমান আলী ও মওলাবক্সসহ অনেকে, প্রতিবছরই বর্ষায় আমরা সর্বস্ব হারাই।
কিন্তু শুধু আশ্বাসে কাজ হয় না, স্থায়ী জিও ব্যাগ কিংবা টেকসই ব্লক বাঁধ না দিলে মানচিত্র থেকেই মুছে যাবে এসব গ্রাম। নদীভাঙন প্রতিরোধে আকুতি জানিয়ে দ্রুত সরকারের জরুরি হস্তক্ষেপ ও স্থায়ী টেকসই বাঁধ নির্মাণের দাবি জানিয়েছেন ভাঙনকবলিত হাজারও পরিবার।
বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড বগুড়া উপ-সহকারী প্রকৌশলী সবুজ কুমার শীল বলেন, আমারা খবর পেয়ে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছি। এছাড়াও মাননীয় সংসদ সদস্য খবর পেয়ে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। ভাঙ্গন রোধ করতে কাজ চলমান রয়েছে।
