গ্লাসগো ২০২৬ বদলে দিল কমনওয়েলথ গেমসের ধারণা
বড় কোনো আন্তর্জাতিক ক্রীড়া আয়োজন মানেই বিশাল বাজেট, নতুন অবকাঠামো নির্মাণ এবং বিপুল ব্যয়ের প্রচলিত ধারণাকে পাল্টে দিয়েছে গ্লাসগো ২০২৬ কমনওয়েলথ গেমস। মাত্র ১৮ মাসের প্রস্তুতিতে অনুষ্ঠিত এই আসর দেখিয়েছে—বিদ্যমান অবকাঠামোর সর্বোচ্চ ব্যবহার, সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা এবং পরিবেশবান্ধব উদ্যোগের মাধ্যমে কম খরচেও সফলভাবে আয়োজন করা সম্ভব বড় ক্রীড়া প্রতিযোগিতা।
১১ দিনব্যাপী এই আয়োজন শেষে প্রকাশিত স্বাধীন মূল্যায়ন প্রতিবেদনে গ্লাসগো ২০২৬-কে ভবিষ্যতের আন্তর্জাতিক ক্রীড়া আয়োজনের জন্য একটি কার্যকর ও টেকসই মডেল হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
‘দ্য স্টোরি সো ফার’ শীর্ষক অন্তর্বর্তী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গ্লাসগো শুধু একটি কমনওয়েলথ গেমস আয়োজন করেনি; বরং সীমিত সম্পদ কাজে লাগিয়ে কীভাবে আরও কার্যকর, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও পরিবেশবান্ধব ক্রীড়া আসর আয়োজন করা যায়, তার একটি নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।
নতুন স্টেডিয়াম নয়, পুরোনো অবকাঠামোর সর্বোচ্চ ব্যবহার
গ্লাসগো ২০২৬-এর অন্যতম বড় বৈশিষ্ট্য ছিল নতুন কোনো স্টেডিয়াম নির্মাণ না করা। আগে থেকে থাকা ক্রীড়া অবকাঠামো আধুনিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে ব্যবহার করেই সম্পন্ন করা হয়েছে পুরো আয়োজন। এতে একদিকে যেমন ব্যয় কমেছে, অন্যদিকে কমেছে পরিবেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব।
এবারের গেমসে ৭৪টি দেশ ও অঞ্চল থেকে প্রায় তিন হাজার ক্রীড়াবিদ অংশ নেন। ১০টি মূল ক্রীড়া এবং ছয়টি প্যারা ক্রীড়া ডিসিপ্লিনে মোট ২১৫টি পদক ইভেন্ট অনুষ্ঠিত হয়। প্রতিযোগিতায় বিতরণ করা হয় ১ হাজার ১৬৮টি পদক।
দর্শক-সমর্থকদের ব্যাপক অংশগ্রহণ
গেমস চলাকালে প্রতিযোগিতা ভেন্যু, লাইভ সাইট এবং গ্লাসগো ২০২৬ ফেস্টিভ্যাল মিলিয়ে ৬ লাখ ৩০ হাজারের বেশি মানুষ সরাসরি যুক্ত হন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গেমসের বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে দেখা হয়েছে প্রায় ৫০ কোটি বার।
আয়োজনের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন চার হাজারের বেশি স্বেচ্ছাসেবক। তারা মোট ১ লাখ ৫৬ হাজার ১১০ ঘণ্টা দায়িত্ব পালন করেন।
প্যারা ক্রীড়ায় নতুন ইতিহাস
গ্লাসগো ২০২৬-এর সবচেয়ে প্রশংসিত দিকগুলোর একটি ছিল প্যারা ক্রীড়ায় সর্বোচ্চ অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করা। কমনওয়েলথ গেমসের ইতিহাসে এবারই প্রথম ছয়টি প্যারা ডিসিপ্লিনে ৪৭টি পদক ইভেন্ট অনুষ্ঠিত হয়।
এবারের আসরের প্রথম স্বর্ণপদকও আসে প্যারা ক্রীড়া থেকে। ইংল্যান্ডের মার্ক সোয়ান প্যারা পাওয়ারলিফটিংয়ে স্বর্ণ জিতে গেমসের ইতিহাসে বিশেষ জায়গা করে নেন।
পরিবেশবান্ধব আয়োজনে নতুন মানদণ্ড
টেকসই আয়োজনের ক্ষেত্রেও গ্লাসগো ২০২৬ তৈরি করেছে নতুন উদাহরণ। প্রতিযোগিতার সব ভেন্যু ছিল মাত্র আট মাইলের মধ্যে, যা যাতায়াত ব্যবস্থাকে আরও সহজ ও পরিবেশবান্ধব করেছে।
সব ভেন্যুতে ব্যবহার করা হয়েছে স্কটিশ গ্রিডের শতভাগ নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ। গেমসের মোট পরিবহনের ৭১ শতাংশ ছিল হাইব্রিড বা বৈদ্যুতিক যাননির্ভর, যার মধ্যে ৬৩ শতাংশ ছিল সম্পূর্ণ বৈদ্যুতিক।
খাবারের ক্ষেত্রেও পরিবেশের বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। গেমসের মোট খাদ্য তালিকার ৫৯ শতাংশ ছিল নিরামিষ বা উদ্ভিদভিত্তিক। এছাড়া অস্থায়ী অবকাঠামোর ৯০ শতাংশের বেশি পুনর্ব্যবহার করা হয়েছে।
পুনর্ব্যবহৃত ৯৯ হাজার ৪০১টি প্লাস্টিক বোতল দিয়ে তৈরি করা হয়েছে বিভিন্ন ভেন্যুর ব্যানার। কিংস ব্যাটন রিলের অংশ হিসেবে পরিচালিত পরিচ্ছন্নতা অভিযানে ১৪ হাজার ৩০৪ জন স্বেচ্ছাসেবক অংশ নিয়ে সমুদ্রে পৌঁছানোর আগেই ১০ লাখ ১৯ হাজার ৫৫৪টি প্লাস্টিক বর্জ্য সংগ্রহ করেন।
ব্যয়ের ক্ষেত্রে নতুন দৃষ্টান্ত
গ্লাসগো ২০২৬-এর সবচেয়ে আলোচিত বিষয়গুলোর একটি ছিল সীমিত বাজেটে সফল আয়োজন। আয়োজকদের তথ্য অনুযায়ী, এই গেমসের সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে ১৬২ দশমিক ৬ মিলিয়ন পাউন্ড।
তুলনামূলকভাবে ২০১৪ সালের গ্লাসগো কমনওয়েলথ গেমসে ব্যয় হয়েছিল ৫৪৩ মিলিয়ন পাউন্ড এবং ২০২২ সালের বার্মিংহাম কমনওয়েলথ গেমসে খরচ হয়েছিল প্রায় ৬৮০ মিলিয়ন পাউন্ড।
ভবিষ্যতের ক্রীড়া আয়োজনের পথপ্রদর্শক
গ্লাসগো ২০২৬-এর প্রধান নির্বাহী ফিল ব্যাটি বলেন, নতুনভাবে চিন্তা করলে বড় আন্তর্জাতিক ক্রীড়া আসরও কম খরচে সফলভাবে আয়োজন করা সম্ভব। তার মতে, এই গেমস শুধু একটি প্রতিযোগিতা নয়, ভবিষ্যতের আয়োজকদের জন্য একটি নতুন দিকনির্দেশনা।
কমনওয়েলথ স্পোর্টের প্রধান নির্বাহী কেটি স্যাডলিয়ার বলেন, গ্লাসগো ২০২৬ ভবিষ্যতের কমনওয়েলথ গেমসের জন্য আরও নমনীয়, যৌথ ও টেকসই আয়োজনের ভিত্তি তৈরি করেছে।
ইতোমধ্যে সাতটি দেশ ভবিষ্যতে কমনওয়েলথ গেমস আয়োজনের আগ্রহ প্রকাশ করেছে। ২০৩০ সালের শতবর্ষী কমনওয়েলথ গেমস আয়োজন করবে ভারতের আহমেদাবাদ। আয়োজকদের বিশ্বাস, গ্লাসগোর এই নতুন মডেলই আগামী দিনের আন্তর্জাতিক ক্রীড়া আয়োজনের জন্য সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে।
