ছয় মাসের চেয়ারে ২ বছর, প্রভাষক তুলছেন সহকারী অধ্যাপকের বেতন!
কক্সবাজার শহরের বাস টার্মিনাল এলাকায় অবস্থিত কক্সবাজার আদর্শ মহিলা কামিল মাদরাসায় দীর্ঘদিন ধরে চলছে প্রশাসনিক অস্থিরতা। মাদরাসা শিক্ষা অধিদপ্তর ও ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের নীতিমালাকে পাশ কাটিয়ে একজন প্রভাষককে টানা দুই বছরেরও বেশি সময় ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্বে রাখার অভিযোগ উঠেছে। একই সঙ্গে তার বিরুদ্ধে পদোন্নতি না পেয়েও উচ্চ গ্রেডে বেতন-ভাতা গ্রহণ, আর্থিক অনিয়ম এবং প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগও তুলেছেন প্রতিষ্ঠানের একাধিক শিক্ষক।
প্রতিষ্ঠানটির কয়েকজন শিক্ষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, নিয়মিত অধ্যক্ষ নিয়োগ না দিয়ে একটি প্রভাবশালী মহল নিজেদের স্বার্থে বর্তমান পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত করছে। এতে শিক্ষক-কর্মচারীদের মধ্যে অসন্তোষ বাড়ছে, যার নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে শিক্ষা কার্যক্রমেও।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ১৯৮৯ সালে প্রতিষ্ঠিত কক্সবাজার আদর্শ মহিলা কামিল মাদরাসাটি জেলার অন্যতম বৃহৎ নারী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। বর্তমানে এখানে প্রায় ১ হাজার ৯০০ শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করছে। এবতেদায়ি, দাখিল, আলিম, ফাজিল ও কামিল (মাস্টার্স) পর্যায়ের পাশাপাশি কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীনেও পাঠদানের ব্যবস্থা রয়েছে। প্রতিষ্ঠানে বর্তমানে ৩৮ জন শিক্ষক কর্মরত।
প্রতিষ্ঠানটির প্রতিষ্ঠাকালীন অধ্যক্ষ ছিলেন মৌলানা ফরিদ আহমদ চৌধুরী। চাকরির মেয়াদ পূর্ণ হওয়ায় তিনি ২০২৩ সালের ২ জুন অবসরে যান। তার অবসরের পর ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের দায়িত্ব দেওয়া হয় আরবি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক নুরুল আবছারকে। তবে পরবর্তী সময়ে কী কারণে তাকে দায়িত্ব থেকে সরানো হয়, সে বিষয়ে কোনো লিখিত ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি। এরপর প্রভাষক আমান উল্লাহকে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ করা হয়। সেই থেকে দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে তিনি একই দায়িত্ব পালন করে আসছেন।
তথ্য বলছে, মাদরাসা শিক্ষা অধিদপ্তর এবং ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের (ফাজিল ও কামিল মাদরাসা) প্রবিধানমালা-২০২৩ (সংশোধিত) অনুযায়ী, কোনো শিক্ষক একটানা সর্বোচ্চ ছয় মাস ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে পারবেন। এই সময়ের মধ্যেই গভর্নিং বডিকে নিয়মিত অধ্যক্ষ নিয়োগের কার্যক্রম সম্পন্ন করতে হবে। যদি আইনি জটিলতা বা অন্য কোনো যৌক্তিক কারণে ছয় মাসের মধ্যে নিয়োগ সম্ভব না হয়, তাহলে একই ব্যক্তি স্বয়ংক্রিয়ভাবে দায়িত্বে বহাল থাকতে পারবেন না। সে ক্ষেত্রে জ্যেষ্ঠতম তিনজন শিক্ষকের মধ্য থেকে অন্য একজনকে পরবর্তী ছয় মাসের জন্য দায়িত্ব দিতে হবে।
এছাড়া সর্বশেষ ২০২৬ সালের সংশোধিত বিধিমালায় বলা হয়েছে, অধ্যক্ষের পদ শূন্য হলে উপাধ্যক্ষ ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হবেন। উপাধ্যক্ষ না থাকলে জ্যেষ্ঠতম আরবি বিষয়ের শিক্ষক দায়িত্ব পালন করবেন। কোনো বিরোধ সৃষ্টি হলে বিষয়টি নিষ্পত্তি করবে মাদরাসা শিক্ষা অধিদপ্তর। কিন্তু কক্সবাজার আদর্শ মহিলা কামিল মাদরাসায় এসব বিধান কার্যকর হয়নি বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের।
প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষক ও সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের দাবি, আমান উল্লাহ এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে সহকারী অধ্যাপক হিসেবে পদোন্নতি পাননি। কার্যত তিনি এখনও প্রভাষক পদেই রয়েছেন। অথচ মাদরাসাটিতে সাতজন সহকারী অধ্যাপক কর্মরত রয়েছেন।
বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে, সহকারী অধ্যাপক পদে পদোন্নতির জন্য তিনি তিনবার প্রয়োজনীয় কাগজপত্র মাদরাসা শিক্ষা অধিদপ্তরে পাঠালেও শিক্ষাগত যোগ্যতার নির্ধারিত শর্ত পূরণ না হওয়ায় আবেদন অনুমোদন পায়নি। নীতিমালা অনুযায়ী, প্রভাষক থেকে সহকারী অধ্যাপক পদে পদোন্নতির জন্য সংশ্লিষ্ট শিক্ষককে ইনডেক্সধারী হতে হবে এবং নির্ধারিত বিষয়ে স্নাতক (সম্মান) ও স্নাতকোত্তর অথবা কামিল ডিগ্রি থাকতে হবে।
অন্যদিকে, মাদরাসার এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতার তালিকায় আমান উল্লাহর নামের পাশে ‘প্রভাষক’ উল্লেখ থাকলেও তিনি ষষ্ঠ গ্রেড অনুযায়ী বেতন-ভাতা গ্রহণ করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। প্রভাষক হিসেবে তার নবম গ্রেডে বেতন পাওয়ার কথা বলে দাবি করেছেন অভিযোগকারীরা।
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ আমান উল্লাহ।
তিনি বলেন, ‘২০০৭ সাল থেকেই আমি সহকারী অধ্যাপক হিসেবে বেতন-ভাতা পাচ্ছি। পদোন্নতির ফাইল অনেক আগে পাঠানো হয়েছিল। ফাইলটি এনালগ হওয়ায় মাদরাসা শিক্ষা অধিদপ্তর থেকে পরিপত্র আসতে বিলম্ব হচ্ছে।’
দুই বছরের বেশি সময় ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন প্রসঙ্গে তিনি আরও বলেন, ‘ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ পরিবর্তনের এজেন্ডা নিয়ে জেলা প্রশাসকের কাছে লিখিত আবেদন করা হয়েছিল। জেলা প্রশাসক নির্বাচনসহ বিভিন্ন কারণে আপাতত আগের মতো পরিচালনা করতে বলেছেন।’
আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ সম্পর্কে দৃষ্টআকর্ষণ করা হলে তার দাবি, এসব সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপপ্রচার।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে মাদরাসার অ্যাডহক কমিটির সভাপতি ও কক্সবাজার জেলা প্রশাসক আব্দুল মান্নান বলেন, ‘মাদরাসা শিক্ষা অধিদপ্তরের নিয়মের বাইরে আমি কোনো সিদ্ধান্ত দিইনি।’
তিনি আরও বলেন, ‘প্রভাষক হয়ে যদি ষষ্ঠ গ্রেডে বেতন-ভাতা গ্রহণের বিষয়টি সত্য হয়, তাহলে সেটি অবশ্যই খতিয়ে দেখা হবে। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
প্রতিষ্ঠানটির একাধিক শিক্ষক জানান, দীর্ঘদিন ধরে নিয়মিত অধ্যক্ষ নিয়োগ না হওয়ায় প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে স্বচ্ছতা নেই। পদোন্নতি, আর্থিক ব্যবস্থাপনা ও প্রশাসনিক কার্যক্রম নিয়ে অসন্তোষ দিন দিন বাড়ছে।
তাদের অভিযোগ, যোগ্য ও জ্যেষ্ঠ শিক্ষকদের উপেক্ষা করে একজন প্রভাষককে দীর্ঘদিন ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের দায়িত্বে রাখার ফলে প্রতিষ্ঠানের স্বাভাবিক পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তারা দ্রুত মাদরাসা শিক্ষা অধিদপ্তরের হস্তক্ষেপে নিয়মিত অধ্যক্ষ নিয়োগ এবং অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।
