মূল লেখায় যান
সোমবার, ১৭ আগস্ট ২০২৬, ১:৫৩ অপরাহ্ন
শিরোনাম
সৌরবিদ্যুৎ ছাড়া অটোরিকশায় চার্জ দিলে জরিমানা, করতে হবে নিবন্ধন এইমাত্রঅন্যান্য সৌরবিদ্যুৎ ছাড়া অটোরিকশায় চার্জ দিলে জরিমানা, করতে হবে নিবন্ধন ঢাকা-খুলনা মহাসড়ক অবরোধ করে নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের বিক্ষোভ এইমাত্রঅন্যান্য ঢাকা-খুলনা মহাসড়ক অবরোধ করে নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের বিক্ষোভ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দিল্লি সফর নিয়ে নতুন বার্তা ভারতের এইমাত্রঅন্যান্য প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দিল্লি সফর নিয়ে নতুন বার্তা ভারতের পিতার স্বপ্ন পূরণে অ্যাডভোকেট তাপস চন্দ্র সরকার এইমাত্রঅন্যান্য পিতার স্বপ্ন পূরণে অ্যাডভোকেট তাপস চন্দ্র সরকার আকস্মিক পরিদর্শনে নেত্রকোণার জেলা প্রশাসক এইমাত্রঅন্যান্য আকস্মিক পরিদর্শনে নেত্রকোণার জেলা প্রশাসক ভারতে শেখ হাসিনার অবস্থান সম্পর্কে বাংলাদেশ এখনো নিশ্চিত নয়: চিফ প্রসিকিউটর এইমাত্রঅন্যান্য ভারতে শেখ হাসিনার অবস্থান সম্পর্কে বাংলাদেশ এখনো নিশ্চিত নয়: চিফ প্রসিকিউটর ঢাকায় মঙ্গলবার চালু হচ্ছে বিআরটিসির বিশেষ ‘মহিলা বাস’ সার্ভিস এইমাত্রঅন্যান্য ঢাকায় মঙ্গলবার চালু হচ্ছে বিআরটিসির বিশেষ ‘মহিলা বাস’ সার্ভিস এমপির গাড়িতে হামলা: পৌর স্বেচ্ছাসেবক দলের সদস্য সচিবসহ গ্রেপ্তার ২ এইমাত্রঅন্যান্য এমপির গাড়িতে হামলা: পৌর স্বেচ্ছাসেবক দলের সদস্য সচিবসহ গ্রেপ্তার ২
অন্যান্য

পিতার স্বপ্ন পূরণে অ্যাডভোকেট তাপস চন্দ্র সরকার

প্রতিবেদক:
পিতার স্বপ্ন পূরণে অ্যাডভোকেট তাপস চন্দ্র সরকার

মানুষের জীবনে কিছু গল্প থাকে, যা শুধু সাফল্যের গল্প নয়; সেগুলো হয়ে ওঠে হারানোর বেদনা, ভালোবাসা, সংগ্রাম, স্বপ্ন এবং স্বপ্নপূরণের গল্প। কিছু মানুষ জীবনের শুরুতেই এমন প্রতিকূলতার মুখোমুখি হন, যা অন্য কাউকে হয়তো থামিয়ে দিতে পারে। কিন্তু কেউ কেউ সেই প্রতিকূলতাকেই শক্তিতে পরিণত করে সামনে এগিয়ে যান।

অ্যাডভোকেট তাপস চন্দ্র সরকারের জীবন তেমনই এক সংগ্রামী পথচলার গল্প। শৈশবেই মাকে হারিয়েছেন। মাতৃস্নেহের সেই অপূরণীয় শূন্যতা নিয়ে বেড়ে উঠেছেন একমাত্র মামা ও দিদিমার স্নেহ-ছায়ায়। মামার বাড়িতে থেকে পড়াশোনা করেছেন, এসএসসি পাস করেছেন। এরপর কুমিল্লায় বাবার কাছে এসে শুরু হয়েছে জীবনের নতুন অধ্যায়। বাবা নিখিল চন্দ্র সরকার ছিলেন কুমিল্লা জেলা আইনজীবী সহকারী সমিতির একজন সিনিয়র সদস্য।

তাঁর স্বপ্ন ছিল—ছেলে একদিন আইনজীবী হবে। বাবার সেই স্বপ্নই একসময় তাপস চন্দ্র সরকারের নিজের জীবনের লক্ষ্য হয়ে ওঠে। কিন্তু স্বপ্ন পূরণের আগেই ২০১৫ সালের ২৮ জানুয়ারি পৃথিবীর মায়া ছেড়ে চলে যান বাবা। বাবা চলে গেলেও থেমে যাননি তাপস। বরং বাবার অসমাপ্ত স্বপ্নকে নিজের দায়িত্ব হিসেবে বুকে ধারণ করে এগিয়ে যান। অবশেষে ২০১৬ সালের ১৪ মে বাংলাদেশ বার কাউন্সিল থেকে সনদ লাভ করেন। একই বছরের ৯ জুন কুমিল্লা জেলা আইনজীবী সমিতিতে যোগদানের মাধ্যমে শুরু হয় তাঁর আইনজীবী জীবনের আনুষ্ঠানিক যাত্রা। বাবার স্বপ্ন পূরণ হলো, কিন্তু সেই স্বপ্নের সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত সাক্ষী—বাবা—তখন আর পৃথিবীতে নেই। শৈশবের বেদনা, মামা-দিদিমার ভালোবাসা, বাবার স্বপ্ন, সাংবাদিকতা, আইন পেশা, পরিবার, সামাজিক কর্মকাণ্ড এবং জীবনের নানা চড়াই-উতরাই নিয়ে কথা বলেছেন অ্যাডভোকেট তাপস চন্দ্র সরকার।

হাবিবুর রহমান খাঁন: তাপস ভাই, শুরুতেই আপনার শৈশবের কথা জানতে চাই। আপনার জন্ম ও পারিবারিক পরিচয় সম্পর্কে বলুন।

অ্যাডভোকেট তাপস চন্দ্র সরকার: আমার জন্ম ১৯৮০ সালের ৫ এপ্রিল। আমার বাবা নিখিল চন্দ্র সরকার এবং মা যোগমায়া সরকার। জন্মের পর খুব বেশিদিন মায়ের স্নেহ পাওয়ার সৌভাগ্য আমার হয়নি। খুব ছোটবেলাতেই আমি মাকে হারাই। একটি শিশুর জীবনে মা কী—সেটা হয়তো তখন পুরোপুরি বুঝিনি। কিন্তু বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মাকে হারানোর শূন্যতাটা গভীরভাবে উপলব্ধি করেছি। জীবনের অনেক আনন্দের মুহূর্তে মনে হয়েছে, মা যদি আজ থাকতেন, তাহলে হয়তো এই আনন্দটা আরও পূর্ণ হতো। মায়ের মুখের স্মৃতি যতটা না, তার চেয়েও বেশি মনে আছে তাঁকে না পাওয়ার শূন্যতা।

হাবিবুর রহমান খাঁন: মাকে হারানোর পর আপনার শৈশব কীভাবে কেটেছে?

অ্যাডভোকেট তাপস চন্দ্র সরকার: আমার একমাত্র মামা ও দিদিমা আমাকে অনেক স্নেহ-মমতা দিয়ে বড় করেছেন। তাঁদের কাছে আমি শুধু আশ্রয় পাইনি, পেয়েছি ভালোবাসা, শাসন ও জীবনের প্রথম দিকের শিক্ষা। মায়ের জায়গা কেউ নিতে পারে না। কিন্তু তাঁরা আমাকে কখনো ভালোবাসার অভাব অনুভব করতে দেননি। আজ আমি যখন পেছনে ফিরে তাকাই, তখন মনে হয়—আমার জীবনের কঠিন সময়ে মামা ও দিদিমা আমার জন্য সৃষ্টিকর্তার দেওয়া আশীর্বাদ ছিলেন। তাঁদের অবদান আমি কোনোদিন ভুলতে পারব না।

হাবিবুর রহমান খাঁন: মাতৃহারা শৈশব আপনার ব্যক্তিত্বে কী ধরনের প্রভাব ফেলেছে বলে মনে করেন?

অ্যাডভোকেট তাপস চন্দ্র সরকার: আমার মনে হয়, জীবনের শুরুতেই কিছু হারানোর অভিজ্ঞতা মানুষকে অনেক কিছু শিখিয়ে দেয়। আমি খুব ছোট বয়সেই বুঝেছি, জীবনে সবকিছু নিজের ইচ্ছামতো পাওয়া যায় না। কিছু শূন্যতা নিয়েই মানুষকে পথ চলতে হয়। মায়ের অনুপস্থিতি আমাকে কষ্ট দিয়েছে, কিন্তু সেই কষ্ট আমাকে দুর্বল করে দেয়নি। বরং ধৈর্য ধরতে শিখিয়েছে, মানুষের কষ্ট বুঝতে শিখিয়েছে এবং জীবনের ছোট ছোট ভালোবাসার মূল্য বুঝিয়েছে।

হাবিবুর রহমান খাঁন: আপনার শিক্ষাজীবনের গুরুত্বপূর্ণ সময় কোথায় কেটেছে?

অ্যাডভোকেট তাপস চন্দ্র সরকার: মায়ের মৃত্যুর পর মামা ও দিদিমার কাছে থেকেই আমার শিক্ষাজীবনের গুরুত্বপূর্ণ সময় কেটেছে। চাঁদপুর জেলার মতলব উত্তর উপজেলার ইন্দুরিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছি। ১৯৯৫ সালে সেখান থেকে এসএসসি পাস করি। আমার শিক্ষাজীবনে মামা ও দিদিমার অবদান অনেক বেশি। তাঁদের ভালোবাসা, উৎসাহ ও সহযোগিতা আমাকে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে সাহস দিয়েছে।

হাবিবুর রহমান খাঁন: এসএসসির পর আপনার জীবনে কী পরিবর্তন আসে?

অ্যাডভোকেট তাপস চন্দ্র সরকার: এসএসসি পাস করার পর আমি কুমিল্লায় বাবার কাছে চলে আসি। এটা আমার জীবনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। ছোটবেলায় মাকে হারানোর পর মামা ও দিদিমার কাছে বড় হয়েছিলাম। এরপর বাবার কাছে এসে তাঁর স্নেহ-ছায়ায় বেড়ে ওঠার সুযোগ পাই। বাবার সঙ্গে থাকা, তাঁর কাছ থেকে জীবনের নানা বিষয়ে শেখা—এসব আমার জীবনে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

হাবিবুর রহমান খাঁন: আপনার বাবা আপনাকে নিয়ে কী ধরনের স্বপ্ন দেখতেন?

অ্যাডভোকেট তাপস চন্দ্র সরকার: আমার বাবা নিখিল চন্দ্র সরকার কুমিল্লা জেলা আইনজীবী সহকারী সমিতির একজন সিনিয়র সদস্য ছিলেন। আইন অঙ্গনের সঙ্গে তাঁর দীর্ঘদিনের সম্পর্ক ছিল। তিনি চাইতেন আমি একদিন আইনজীবী হই। বাবার সেই ইচ্ছাটা ধীরে ধীরে আমার নিজের স্বপ্ন হয়ে যায়। আমি মনে করতে শুরু করি, আইন পেশায় নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারলে বাবার স্বপ্ন পূরণ হবে।

হাবিবুর রহমান খাঁন: বাবার ইচ্ছাকে আপনি নিজের জীবনের লক্ষ্য হিসেবে কীভাবে গ্রহণ করলেন?

অ্যাডভোকেট তাপস চন্দ্র সরকার: বাবার সঙ্গে থাকতে থাকতে তাঁর স্বপ্নটা আমার মধ্যে গভীরভাবে জায়গা করে নেয়। তিনি চাইতেন আমি আইন পড়ি, আইনজীবী হই এবং মানুষের পাশে দাঁড়াই। আমি তখন বুঝতে শুরু করি, বাবা শুধু আমার একটি পেশা চাননি; তিনি চেয়েছিলেন আমি এমন একটি জায়গায় দাঁড়াই, যেখান থেকে মানুষের উপকার করা যায়। সেই জায়গা থেকেই আইন পড়ার প্রতি আমার আগ্রহ আরও বেড়ে যায়।

হাবিবুর রহমান খাঁন: আইন পেশায় আসার আগে আপনি সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। সেই অভিজ্ঞতা সম্পর্কে বলুন।

অ্যাডভোকেট তাপস চন্দ্র সরকার: সাংবাদিকতা আমার জীবনের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। স্থানীয় ও জাতীয় বিভিন্ন পত্রিকায় সংবাদকর্মী হিসেবে কাজ করার সুযোগ পেয়েছি। সাংবাদিকতার কারণে সমাজের নানা শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে মিশেছি। মানুষের সুখ-দুঃখ, বঞ্চনা, অধিকার, সামাজিক অসঙ্গতি এবং ন্যায়বিচারের আকাঙ্ক্ষা খুব কাছ থেকে দেখেছি। সাংবাদিকতা আমাকে মানুষের কথা শুনতে শিখিয়েছে। মানুষের সমস্যা শুধু সংবাদ হিসেবে নয়, একজন মানুষ হিসেবে অনুভব করতে শিখিয়েছে।

হাবিবুর রহমান খাঁন: সাংবাদিকতা থেকে আইন পেশায় আসার পেছনে কি কোনো বিশেষ কারণ ছিল?

অ্যাডভোকেট তাপস চন্দ্র সরকার: সাংবাদিকতা করতে গিয়ে উপলব্ধি করি, মানুষের অধিকার ও ন্যায়বিচারের বিষয়টি কতটা গুরুত্বপূর্ণ। একজন সাংবাদিক হিসেবে অন্যায় তুলে ধরা যায়, মানুষের কথা বলা যায়। কিন্তু একজন আইনজীবী হিসেবে মানুষের অধিকার রক্ষায় আরও সরাসরি ভূমিকা রাখার সুযোগ রয়েছে। তার সঙ্গে বাবার স্বপ্ন তো ছিলই। এই দুই বিষয়—নিজের আগ্রহ এবং বাবার স্বপ্ন—আমাকে আইন পেশায় আসতে সবচেয়ে বেশি অনুপ্রাণিত করেছে।

হাবিবুর রহমান খাঁন: আপনার শিক্ষাজীবনের পরবর্তী ধাপগুলো সম্পর্কে জানতে চাই।

অ্যাডভোকেট তাপস চন্দ্র সরকার: ১৯৯৭ সালে কুমিল্লা অজিত গুহ মহাবিদ্যালয় থেকে এইচএসসি পাস করি। এরপর ২০০০ সালে নিমসার জুনাব আলী ডিগ্রি কলেজ থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করি। পরবর্তীতে কুমিল্লা আইন কলেজ থেকে এলএলবি ডিগ্রি অর্জন করি। আইন পড়ার ক্ষেত্রে বাবার স্বপ্ন ও অনুপ্রেরণা আমার জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

হাবিবুর রহমান খাঁন: আপনার বাবা কখন মৃত্যুবরণ করেন?

অ্যাডভোকেট তাপস চন্দ্র সরকার: আমার বাবা নিখিল চন্দ্র সরকার ২০১৫ সালের ২৮ জানুয়ারি মৃত্যুবরণ করেন। বাবাকে হারানোর কষ্ট আমার জীবনের সবচেয়ে বড় কষ্টগুলোর একটি। তবে বাবাকে হারানোর সময় আমার আইনজীবী হওয়ার স্বপ্ন তখনো পূর্ণ হয়নি। তাই বাবাকে হারানোর বেদনার সঙ্গে আরও একটি আক্ষেপ যুক্ত হয়েছিল—যে মানুষটি আমাকে আইনজীবী হিসেবে দেখতে চেয়েছিলেন, তিনি নিজ চোখে সেই দিনটি দেখে যেতে পারলেন না।

হাবিবুর রহমান খাঁন: বাবার মৃত্যুর পরের সময়টা আপনার জন্য কেমন ছিল?

অ্যাডভোকেট তাপস চন্দ্র সরকার: খুব কঠিন ছিল। বাবাকে হারানোর শোক তো ছিলই। তার সঙ্গে মনে হচ্ছিল, জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ মানুষকে হারালাম, যাঁর সঙ্গে আমার ভবিষ্যৎ নিয়ে অনেক স্বপ্ন ও পরিকল্পনা ছিল। অনেক সময় মনে হয়েছে—বাবা যদি আর কয়েকটি বছর বেঁচে থাকতেন! যদি তিনি আমাকে আইনজীবীর পোশাকে দেখতে পারতেন! এই আফসোস হয়তো কোনোদিন পুরোপুরি দূর হবে না।

হাবিবুর রহমান খাঁন: বাবার মৃত্যুর পর তাঁর স্বপ্ন পূরণের তাগিদ কি আরও বেড়ে যায়?

অ্যাডভোকেট তাপস চন্দ্র সরকার: অনেক বেড়ে যায়। বাবা চলে যাওয়ার পর আমি মনে মনে একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম—বাবা নেই, কিন্তু তাঁর স্বপ্নটা তো আছে। সেই স্বপ্ন আমাকে পূরণ করতেই হবে। আমি মনে করতাম, বাবার জন্য আমার সবচেয়ে বড় কিছু করার থাকলে সেটা হবে তাঁর স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেওয়া। তখন থেকে আইনজীবী হওয়ার লক্ষ্যটা আমার কাছে শুধু নিজের ক্যারিয়ারের বিষয় ছিল না; এটা বাবার প্রতি আমার দায়িত্বও হয়ে যায়।

হাবিবুর রহমান খাঁন: শেষ পর্যন্ত কবে আপনি বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের সনদ পান?

অ্যাডভোকেট তাপস চন্দ্র সরকার: ২০১৬ সালের ১৪ মে বাংলাদেশ বার কাউন্সিল থেকে সনদপ্রাপ্ত হই। এরপর একই বছরের ৯ জুন কুমিল্লা জেলা আইনজীবী সমিতিতে যোগ দিই। আমার জীবনের জন্য দিন দুটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আনন্দ ছিল, গর্ব ছিল, স্বপ্ন পূরণের অনুভূতি ছিল। কিন্তু একই সঙ্গে একটা গভীর শূন্যতাও ছিল। কারণ, যার স্বপ্ন পূরণ হলো, সেই মানুষটি তখন আর পাশে নেই।

হাবিবুর রহমান খাঁন: সনদ হাতে পাওয়ার মুহূর্তে বাবার কথা কি মনে পড়েছিল?

অ্যাডভোকেট তাপস চন্দ্র সরকার: খুব বেশি মনে পড়েছিল। সেদিন মনে হচ্ছিল—বাবা যদি আজ থাকতেন! হয়তো সবার আগে তাঁকেই সনদটা দেখাতাম। হয়তো তিনি আমাকে জড়িয়ে ধরতেন। হয়তো বলতেন, ‘তুই পেরেছিস।’ কিন্তু বাস্তবতা হলো, বাবা তখন আর পৃথিবীতে নেই। তাই সেদিনের আনন্দের সঙ্গে বাবাকে হারানোর কষ্টও মিশে ছিল।

হাবিবুর রহমান খাঁন: আজ আদালতে দাঁড়িয়ে যখন কাজ করেন, তখন বাবাকে কীভাবে অনুভব করেন?

অ্যাডভোকেট তাপস চন্দ্র সরকার: বাবার কথা মনে পড়ে। বিশেষ করে যখন আইনজীবীর পোশাক পরে আদালতে দাঁড়াই, তখন মনে হয়—এই জায়গায় দাঁড়ানোর পেছনে বাবার স্বপ্ন ছিল। আমি জানি না, পৃথিবী থেকে চলে যাওয়ার পর মানুষ তার প্রিয়জনদের দেখতে পান কি না। কিন্তু আমি বিশ্বাস করতে ভালোবাসি—বাবা কোথাও থেকে আমাকে দেখছেন। আর হয়তো মনে মনে বলছেন—‘তুই আমার স্বপ্নটা পূরণ করেছিস।’ এই বিশ্বাসটাই আমাকে অনেক শান্তি দেয়।

হাবিবুর রহমান খাঁন: সাংবাদিকতা ও আইন পেশার মধ্যে আপনি কী ধরনের সম্পর্ক খুঁজে পান?

অ্যাডভোকেট তাপস চন্দ্র সরকার: দুটো পেশার কাজ আলাদা হলেও মানুষের সঙ্গে সম্পর্কের জায়গায় অনেক মিল রয়েছে। সাংবাদিক হিসেবে মানুষের কথা শুনেছি, তাঁদের সমস্যা তুলে ধরেছি। আইনজীবী হিসেবে মানুষের অধিকার ও ন্যায়বিচারের জন্য কাজ করার সুযোগ পাচ্ছি। সাংবাদিকতা আমাকে মানুষের কাছে নিয়ে গেছে। আইন পেশা আমাকে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর সুযোগ দিয়েছে। তাই আমার কাছে এই দুই পেশা জীবনের দুটি আলাদা অধ্যায় হলেও পরস্পরের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত।

হাবিবুর রহমান খাঁন: আপনার পৈত্রিক বাড়ি কোথায় এবং বর্তমানে কোথায় বসবাস করছেন?

অ্যাডভোকেট তাপস চন্দ্র সরকার: আমাদের পৈত্রিক বসতবাড়ি চাঁদপুর জেলার মতলব দক্ষিণ উপজেলার লামচরী উকিল বাড়ী এলাকায়। আমার পারিবারিক শেকড়ের সঙ্গে এই জায়গার সম্পর্ক গভীর। অনেক স্মৃতি এই এলাকার সঙ্গে জড়িয়ে আছে। অন্যদিকে কর্মজীবনের কারণে দীর্ঘদিন ধরে কুমিল্লার কালিয়াজুরী এলাকায় পরিবার নিয়ে বসবাস করছি। কুমিল্লা এখন আমার কর্মজীবন, পরিবার এবং সামাজিক জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

হাবিবুর রহমান খাঁন: আপনার পারিবারিক জীবন সম্পর্কে জানতে চাই।

অ্যাডভোকেট তাপস চন্দ্র সরকার: আমার এক পুত্র ও এক কন্যা সন্তান রয়েছে। আমার জীবনসঙ্গিনী রিতা রাণী মজুমদার পরিবারের ক্ষেত্রে সবসময় আমার পাশে রয়েছেন। পরিবার আমার কাছে খুব গুরুত্বপূর্ণ। আমি ছোটবেলায় মাকে হারিয়েছি। তাই পরিবারের ভালোবাসা ও নিরাপত্তার মূল্য আমি খুব ভালোভাবে বুঝি। আমি চাই আমার সন্তানরা যেন কখনো ভালোবাসার অভাব অনুভব না করে। তাদের জন্য একটি সুন্দর ও নিরাপদ ভবিষ্যৎ গড়ে তোলাই আমার অন্যতম দায়িত্ব।

হাবিবুর রহমান খাঁন: আপনার শৈশবের অভিজ্ঞতা কি সন্তানদের প্রতি আপনার দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রভাবিত করেছে?

অ্যাডভোকেট তাপস চন্দ্র সরকার: অবশ্যই। আমি জানি, একটি শিশুর জীবনে মা-বাবার উপস্থিতি কতটা গুরুত্বপূর্ণ। তাই আমি চাই আমার সন্তানরা যেন ভালোবাসার মধ্যে বড় হয়। আমি তাদের জীবনে মায়ের শূন্যতা বুঝতে দিতে চাই না, বাবার অনুপস্থিতির কষ্টও দিতে চাই না। আমার নিজের জীবনের না-পাওয়াগুলো আমাকে সন্তানদের পাওয়ার মূল্য বুঝিয়েছে।

হাবিবুর রহমান খাঁন: সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডেও আপনাকে সম্পৃক্ত থাকতে দেখা যায়। এ বিষয়ে আপনার ভাবনা কী?

অ্যাডভোকেট তাপস চন্দ্র সরকার: আমি মনে করি, একজন মানুষের পরিচয় শুধু তাঁর পেশার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। আইনজীবী হিসেবে দায়িত্ব পালন করার পাশাপাশি সমাজের প্রতিও আমাদের দায়িত্ব আছে। মানুষের সঙ্গে থাকা, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত থাকা, মানুষের প্রয়োজনে পাশে দাঁড়ানো—এসবের মধ্যেই আমি এক ধরনের আত্মতৃপ্তি পাই। মানুষের ভালোবাসা ও বিশ্বাস আমার কাছে অনেক বড় অর্জন।

হাবিবুর রহমান খাঁন: আপনার জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন কী বলে মনে করেন?

অ্যাডভোকেট তাপস চন্দ্র সরকার: আমার কাছে সবচেয়ে বড় অর্জন হলো—আমি বাবার স্বপ্ন পূরণ করতে পেরেছি। আমি আইনজীবী হয়েছি। বাবা যেটা চেয়েছিলেন, সেটা করতে পেরেছি। বাবা নেই—এটা আমার সবচেয়ে বড় কষ্ট। কিন্তু তাঁর স্বপ্নটা আমি পূরণ করতে পেরেছি—এটাই আমার সবচেয়ে বড় শান্তি।

হাবিবুর রহমান খাঁন: জীবনের সবচেয়ে বড় না-পাওয়া কী?

অ্যাডভোকেট তাপস চন্দ্র সরকার: মা-বাবাকে জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সময়গুলোতে পাশে না পাওয়া। মাকে খুব ছোটবেলায় হারিয়েছি। আর বাবাকে হারিয়েছি এমন একটি সময়ে, যখন তাঁর স্বপ্ন পূরণের একেবারে কাছাকাছি ছিলাম। বাবা যদি আর কয়েক বছর বেঁচে থাকতেন, হয়তো আমার জীবনের অনেক আনন্দ তাঁর সঙ্গে ভাগ করে নিতে পারতাম। এটাই আমার সবচেয়ে বড় আফসোস।

হাবিবুর রহমান খাঁন: এত প্রতিকূলতার পরও কীভাবে নিজেকে সামলে রেখেছেন?

অ্যাডভোকেট তাপস চন্দ্র সরকার: জীবনের কষ্ট আমাকে একটা জিনিস শিখিয়েছে—থেমে গেলে চলবে না। মানুষ জীবনে অনেক কিছু হারায়। কিন্তু হারানো জিনিসের জন্য সারাজীবন থেমে থাকলে সামনে এগোনো সম্ভব নয়। আমি চেষ্টা করেছি কষ্টকে শক্তিতে পরিণত করতে। মাকে হারানোর কষ্ট, বাবাকে হারানোর বেদনা—এসব আমার সঙ্গে আছে। কিন্তু এগুলো আমাকে দুর্বল না করে বরং আরও দায়িত্বশীল করেছে।

হাবিবুর রহমান খাঁন: আপনার জীবন থেকে নতুন প্রজন্মের জন্য কী বার্তা দিতে চান?

অ্যাডভোকেট তাপস চন্দ্র সরকার: আমি শুধু এটুকু বলতে চাই—জীবনে যত প্রতিকূলতাই আসুক, কখনো হাল ছেড়ে দেওয়া যাবে না। নিজের প্রতি বিশ্বাস রাখতে হবে। পরিশ্রম করতে হবে। সততা ধরে রাখতে হবে। আর মা-বাবা যদি কোনো স্বপ্ন দেখেন, সেই স্বপ্নের মূল্য দিতে হবে। জীবনের পথ সবসময় মসৃণ হবে না। কিন্তু কঠিন পথ পেরিয়েই অনেক সময় মানুষ তার সবচেয়ে সুন্দর গন্তব্যে পৌঁছায়।

হাবিবুর রহমান খাঁন: শেষ প্রশ্ন। আপনার বাবা যদি আজ আপনার সামনে বসে থাকতেন, তাঁকে কী বলতেন?

অ্যাডভোকেট তাপস চন্দ্র সরকার: বলতাম—বাবা, তুমি যে স্বপ্ন দেখেছিলে, আমি সেটা পূরণ করার চেষ্টা করেছি। তুমি চেয়েছিলে তোমার ছেলে আইনজীবী হবে। আজ আমি আইনজীবী। তুমি নেই—এটাই আমার সবচেয়ে বড় কষ্ট। তুমি যদি আজ থাকতে, তাহলে হয়তো আমার সবচেয়ে বড় আনন্দটা তোমার সঙ্গে ভাগ করে নিতে পারতাম। আমি তোমাকে বলতে চাইতাম—বাবা, তুমি যে স্বপ্নটা আমার চোখে এঁকেছিলে, আমি সেটা ভুলিনি। তুমি চলে গেছ, কিন্তু তোমার স্বপ্নটা আমার সঙ্গে রয়ে গেছে। আজ আমি যখন আদালতে দাঁড়াই, তখন মনে হয়—তুমি হয়তো কোথাও থেকে আমাকে দেখছ। আর আমি শুধু মনে মনে বলি—‘বাবা, তোমার স্বপ্নটা আমি পূরণ করেছি।’

প্রতিবেদকের শেষকথা

অ্যাডভোকেট তাপস চন্দ্র সরকারের জীবন কেবল একজন আইনজীবীর পেশাগত সাফল্যের গল্প নয়; এটি এক মাতৃহারা শিশুর বেড়ে ওঠার গল্প, মামা ও দিদিমার অকৃত্রিম ভালোবাসার গল্প, একজন বাবার স্বপ্ন এবং একজন সন্তানের সেই স্বপ্ন পূরণের অঙ্গীকারের গল্প।

১৯৮০ সালের ৫ এপ্রিল জন্ম নেওয়া তাপস চন্দ্র সরকার জীবনের শুরুতেই মাকে হারিয়েছেন। মাতৃস্নেহের সেই শূন্যতার মধ্যে মামা ও দিদিমার ভালোবাসায় বেড়ে উঠেছেন। তাঁদের কাছে থেকেই পড়াশোনা করে ১৯৯৫ সালে ইন্দুরিয়া উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাস করেছেন। এরপর কুমিল্লায় বাবার কাছে এসে উচ্চশিক্ষার পথে এগিয়ে গেছেন। ১৯৯৭ সালে এইচএসসি, ২০০০ সালে স্নাতক এবং পরবর্তীতে এলএলবি ডিগ্রি অর্জন করেছেন।

সাংবাদিকতা দিয়ে কর্মজীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় অতিক্রম করেছেন। মানুষের কথা শুনেছেন, মানুষের কষ্ট দেখেছেন, অন্যায়ের কথা তুলে ধরেছেন। সেই অভিজ্ঞতাই পরবর্তীতে আইন পেশায় তাঁর পথচলাকে আরও সমৃদ্ধ করেছে।

কিন্তু তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় অধ্যায়টি লেখা হয়েছে বাবার স্বপ্নকে ঘিরে।

বাবা নিখিল চন্দ্র সরকার চেয়েছিলেন তাঁর সন্তান আইনজীবী হবে। তাপস সেই স্বপ্নকে নিজের স্বপ্নে পরিণত করেছিলেন। কিন্তু ২০১৫ সালের ২৮ জানুয়ারি বাবা চলে গেলেন না-ফেরার দেশে। সন্তানের সাফল্য দেখার আগেই।

একজন সন্তানের জন্য এর চেয়ে বড় বেদনা আর কী হতে পারে—যে মানুষটির স্বপ্ন পূরণ করার জন্য এত পথ হাঁটা, সেই মানুষটিই নেই স্বপ্নপূরণের দিনটিতে।

তবুও তাপস থেমে যাননি। বাবার স্মৃতিকে হৃদয়ে ধারণ করে এগিয়ে গেছেন। ২০১৬ সালের ১৪ মে বাংলাদেশ বার কাউন্সিল থেকে সনদ পেয়েছেন। ৯ জুন যোগ দিয়েছেন কুমিল্লা জেলা আইনজীবী সমিতিতে।

বাবার স্বপ্ন পূরণ হয়েছে। কিন্তু স্বপ্নদ্রষ্টা বাবা নেই।

এই একটি বাক্যের মধ্যেই যেন লুকিয়ে আছে তাপস চন্দ্র সরকারের জীবনের সবচেয়ে বড় আনন্দ এবং সবচেয়ে বড় বেদনা।

আজ তিনি যখন কুমিল্লা আদালতের ব্যস্ত প্রাঙ্গণে আইনজীবীর পোশাক পরে দাঁড়ান, তখন তাঁর সঙ্গে যেন দাঁড়িয়ে থাকে তাঁর পুরো জীবন—মায়ের স্মৃতি, মামা-দিদিমার ভালোবাসা, বাবার স্বপ্ন, সাংবাদিকতার দিনগুলো এবং প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে তাঁর দীর্ঘ সংগ্রাম।

মানুষ চলে যায়, কিন্তু ভালোবাসা থেকে যায়। মানুষ হারিয়ে যায়, কিন্তু স্বপ্ন থেকে যায়। আর কখনো কখনো সেই স্বপ্ন সন্তানের সাফল্যের মধ্য দিয়ে নতুন জীবন পায়।

নিখিল চন্দ্র সরকারের স্বপ্ন আজ তাঁর সন্তান অ্যাডভোকেট তাপস চন্দ্র সরকারের পেশাগত পরিচয়ের মধ্য দিয়ে বেঁচে আছে।

তাই তাপস চন্দ্র সরকারের পরিচয় শুধু একজন আইনজীবী হিসেবে নয়; তিনি এক মাতৃহারা শৈশবের প্রতিচ্ছবি, মামা-দিদিমার ভালোবাসার স্মারক, এক পিতার স্বপ্নের সফল বাস্তবায়ন এবং প্রতিকূলতার কাছে হার না মানা এক মানুষের নাম।

বাবা নেই, কিন্তু বাবার স্বপ্ন আছে। মা নেই, কিন্তু মায়ের স্মৃতি আছে। আর সেই স্মৃতি ও স্বপ্নকে হৃদয়ে ধারণ করেই এগিয়ে চলেছেন অ্যাডভোকেট তাপস চন্দ্র সরকার।